
ছবি : প্রতীকী। সংগৃহীত।
সালের মে মাসে করিমগঞ্জের চরগোলা ও লঙ্গাই উপত্যকার বিভিন্ন চা বাগান থেকে হাজার হাজার নির্যাতিত চা শ্রমিক বাগান ছেড়ে বেরিয়ে পড়েছিল তাদের মুলুকে অর্থাৎ ঘরে ফেরার জন্য। চা বাগানগুলোতে শ্রমিকদের উপর ব্রিটিশ বাগান মালিকদের সীমাহীন অত্যাচারের ফলশ্রুতিতে সেদিন চা শ্রমিকদের এই অভিনিষ্ক্রমণ ঘটেছিল। শ্রমিকদের এভাবে বাগান ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়ায় চা শিল্পের উপর বড় ধরনের আঘাত আসতে পারে এই আশঙ্কায় বাগান মালিকরা তাদের ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেছিল। প্রথমে বুঝিয়ে সুঝিয়ে, তারপর বল প্রয়োগ করে। সেদিন এই চা শ্রমিকরা যখন চাঁদপুর রেল স্টেশনে আশ্রয় নিয়েছিল তখন তাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে গোর্খা বাহিনী।
এই ঘটনার তীব্র প্রতিক্রিয়া হয়েছিল আসাম ও বাংলায়। হয়েছিল রেল ও স্টিমার শ্রমিক ধর্মঘট। পার্শ্ববর্তী ত্রিপুরাতেও সেদিন চাঁদপুরের ঘটনার বিরাট প্রভাব পড়েছিল। ধর্মঘট, বাজার বয়কট ইত্যাদি হয়েছিল। রাজতন্ত্রের শাসন হলেও ত্রিপুরায় তখন ধীরে ধীরে গণচেতনার উন্মেষ ঘটছে। পার্শ্ববর্তী ব্রিটিশ বাংলার ঘটনাপ্রবাহেরও প্রভাবমুক্ত ছিল না ত্রিপুরা। ব্যতিক্রম নয় চরগোলা-চাঁদপুরের ঘটনা প্রবাহ। ১৯২১ সালে দেশের খিলাফত ও অসহযোগ আন্দোলনের প্রভাব পড়েছিল ত্রিপুরাতে। চাঁদপুরে চা শ্রমিকদের উপর গোর্খা বাহিনীর হামলার প্রতিবাদে রেল ধর্মঘটের প্রভাব পড়ে আখাউড়ায়। দু’দিন ব্যাপী বাজারে হরতাল পালিত হয়। ইংরেজ কর্মচারীদের জন্য আগরতলা বাজার থেকে পণ্যাদি সরবরাহের প্রতিবাদে আগরতলা বাজার বয়কটের সিদ্ধান্ত হয় আখাউড়ার একটি সভায়। সন্নিহিত মোগরা অঞ্চলের ব্যবসায়ীরা আগরতলা বাজার বয়কট করে।
আরও পড়ুন:

রহস্য উপন্যাস: হ্যালো বাবু!, পর্ব-১২৫: অমিতাভ হত্যারহস্য / ৬

এই দেশ এই মাটি, ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৯৬: ব্রিটিশ বাংলার বিপ্লবীরা অনেক সময় পালিয়ে এসে আশ্রয় নিতেন ত্রিপুরায়

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৮৬ : অগ্নি সংস্কার

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৫২: রামের জীবনে জটিলতা ও অনিশ্চয়তার মূলে রয়েছে—নারী
রাজ প্রশাসনের নায়েব মন্ত্রীরা সেখানে নানা প্রতিবন্ধকতারও সম্মুখীন হন। শুধু রাজধানী আগরতলা নয়, দূরবর্তী উত্তরাঞ্চলের কৈলাসহর, ধর্মনগর এবং দক্ষিণের বিলোনীয়া অঞ্চলেও অসহযোগ আন্দোলন তীব্র আকার ধারণ করেছিল। ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকার চা বাগান গুলোর সাত মাইলের মধ্যে ত্রিপুরার সীমানায় যাতে এধরণের সভা সমাবেশ না ঘটতে পারে সেজন্য ত্রিপুরার রাজ প্রশাসনকে উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্ৰহণের কথা বলে ব্রিটিশ প্রশাসন। সরকারি বিচার ব্যবস্থা বয়কটের উদ্দেশ্যে কৈলাসহরে ধর্মসভা স্হাপিত হয়। উদ্দেশ্য ছিল সংশ্লিষ্ট এলাকার গ্ৰামবাসীরা যাতে বিচার ব্যবস্থার দ্বারস্থ না হয়েও এর মাধ্যমে নিজেদের বিবাদ নিষ্পত্তি করতে পারেন। ত্রিপুরার রাজ প্রশাসন অবশ্য ধর্মসভার কার্যকলাপ শেষপর্যন্ত বন্ধ করে দেয়।
আরও পড়ুন:

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৪২: সুন্দরবনের বন্যপ্রাণী — গঙ্গার শুশুক

সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-২৪ : দেবী — ব্যথার পূজা হয়নি সমাপন
এদিকে ত্রিপুরায় বিপ্লবীদের তৎপরতা সম্পর্কে আরও একটি ঘটনা হচ্ছে রাজপ্রাসাদের অস্ত্রাগার থেকে গুলি সংগ্ৰহ। ১৯২২ সালে আগরতলার রাজপ্রাসাদের অস্ত্রাগার থেকে চট্টগ্রামের বিপ্লবী মাস্টারদা সূর্যসেনের সহযোগী অনন্ত সিংহ বহু সংখ্যক পিস্তলের গুলি সংগ্ৰহ করেন বলে উল্লেখ পাওয়া যায়। এক্ষেত্রে তাকে সহযোগিতা করেন আগরতলার উমেশলাল সিংহ সহ কয়েকজন স্হানীয় যুবক। আগরতলায় অনুশীলন সমিতির যে শাখা স্হাপিত হয়েছিল তার দায়িত্বে ছিলেন উপেন্দ্র চন্দ্র লস্কর, কুঞ্জেশ্বর দেববর্মা প্রমুখ। শচীন্দ্র লাল সিংহ, প্রফুল্ল কুমার বসু, কুমার শচীন দেববর্মণের বড় ভাই প্রশান্ত কুমার দেববর্মণ, বীরেন দত্ত, ধীরেন্দ্র দত্ত, দেবপ্রসাদ সেনগুপ্ত প্রমুখ সমিতির সদস্য ছিলেন। ব্রিটিশ বাংলা থেকে পুলিশের তাড়া খেয়ে আসা বিপ্লবীদের ত্রিপুরায় আশ্রয় দান সহ গোপন যোগাযোগের সহায়তা করাই ছিল ত্রিপুরায় এই সমিতির প্রধান কাজ। অনুশীলন সমিতির তৎপরতা বৃদ্ধি পেলে সদস্যদের কয়েকজনকে বন্দি করা হয়। অনন্ত দেববর্মা, অনন্ত দে, প্রভাত দেববর্মা, সুশীল কুমার দেববর্মা প্রমুখ কারাগারে আটক থাকেন।
আরও পড়ুন:

উপন্যাস: দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-২৫ : যে জন রহে মাঝখানে

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৯৯ : দুই সাপের বিবাদ ও রাজকন্যার গুপ্তধন লাভ! প্রাকারকর্ণের চাণক্য-নীতিতে মুগ্ধ উলূকরাজ
ভ্রাতৃসংঘের কথা আগেই উল্লিখিত হয়েছে। ১৯২৮ সালে ত্রিপুরায় জন্ম নেয় ভ্রাতৃসংঘ। শরীর চর্চা ও সংস্কৃতি চর্চার নামে এটি গঠিত হলেও মূলত ভ্রাতৃসংঘ ছিল ত্রিপুরায় বিপ্লবীদের প্রধান আখড়া। যুগান্তর পার্টির ভাবাদর্শে গঠিত ভ্রাতৃসংঘের শাখা ছড়িয়ে পড়েছিল রাজ্যের সর্বত্র। প্রকাশ্যে সমাজসেবা মূলক কাজ করলেও গোপনে ছিল তাদের বিপ্লবী তৎপরতা। দূরবর্তী এলাকায় তাদের আগ্নেয়াস্ত্রের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা ছিল। এমনকি, রাজপ্রাসাদের অস্ত্রাগার থেকে সংঘের সদস্যরা সেদিন অস্ত্র ও গোলাবারুদ সংগ্ৰহ করেছিল। ভ্রাতৃসংঘের তৎপরতা রোধে রাজ সরকার থেকে নানা আদেশ জারি সহ সদস্যদের বিরুদ্ধে ব্যবস্হা গ্ৰহণ করা হয়েছিল। দেবপ্রসাদ সেনগুপ্ত তাঁর ‘স্মৃতির আলো’-তে লিখেছেন, ছাত্র সংঘ ভেঙ্গে যাবার পর জন্ম নিয়েছিল ভ্রাতৃসংঘ। পুরাতন কর্ণেল বাড়িতে মুখ্যত শচীন্দ্রলাল সিংহ ও উমেশলাল সিংহের উদ্যোগে ভ্রাতৃসংঘ গড়ে উঠেছিল।
আরও পড়ুন:

গল্পবৃক্ষ, পর্ব-৫১: সুহনু-জাতক—সেয়ানে সেয়ানে

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১৪৮: ঘরে চুরি, বাইরে চুরি
আগরতলার অনেক ছাত্র দলে দলে এখানে এসে লাঠি খেলা, ছুরি খেলা ও শরীর চর্চা করত। এখানেই আসেন সুখময় সেনগুপ্ত, তড়িৎ মোহন দাশগুপ্ত সহ আরও অনেক। আগরতলার সমাজ জীবনে ভ্রাতৃসংঘ প্রভাব ফেলতে সক্ষম হয়েছিল বলে দেবপ্রসাদ সেনগুপ্ত উল্লেখ করেছেন। রাজপ্রাসাদের অস্ত্রাগার থেকে অস্ত্র লুট সম্পর্কে সেনগুপ্ত তাঁর গ্রন্থে লিখেছেন—”অনন্ত সিং ও শচীন সিং এবং উমেশ সিং-এর সহযোগে রাজবাড়ি অস্ত্রাগার থেকে কিছু অস্ত্র সংগ্রহ করেছিল বলে বিশ্বাস করার কারণ আছে। এ জন্যই অনন্ত সিং এবং তার বোনের আগরতলায় যাতায়াত ছিল বলে আমরা শুনেছি। সুযোগ এবং সুবিধার দিক থেকে শচীন সিং ও উমেশ সিং-এর পক্ষে এ কাজে সুবিধা ছিল প্রচুর। অন্যদিকে বীরেনও (বীরেন দত্ত) তৎপর ছিল মহারাজার ছোট সৈন্যদলের জন্য যে অস্ত্র আমদানি হত তা আখাউড়া স্টেশন থেকে অপসারণের ষড়যন্ত্রে।শেষ পর্যন্ত অবশ্য এই ষড়যন্ত্র কার্যকরী হয়নি।…”(আন্দোলিত সময়, দেবপ্রসাদ সেনগুপ্ত, ত্রিপুরা দর্পণ)—চলবে।
* ত্রিপুরা তথা উত্তর পূর্বাঞ্চলের বাংলা ভাষার পাঠকদের কাছে পান্নালাল রায় এক সুপরিচিত নাম। ১৯৫৪ সালে ত্রিপুরার কৈলাসহরে জন্ম। প্রায় চার দশক যাবত তিনি নিয়মিত লেখালেখি করছেন। আগরতলা ও কলকাতার বিভিন্ন প্রকাশনা থেকে ইতিমধ্যে তার ৪০টিরও বেশি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। ত্রিপুরা-সহ উত্তর পূর্বাঞ্চলের ইতিহাস ভিত্তিক তার বিভিন্ন গ্রন্থ মননশীল পাঠকদের সপ্রশংস দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। দেশের বিভিন্ন পত্রপত্রিকায়ও সে-সব উচ্চ প্রশংসিত হয়েছে। রাজন্য ত্রিপুরার ইতিহাস, রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে ত্রিপুরার রাজ পরিবারের সম্পর্ক, লোকসংস্কৃতি বিষয়ক রচনা, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ভ্রমণের অভিজ্ঞতা সঞ্জাত ব্যতিক্রমী রচনা আবার কখনও স্থানীয় রাজনৈতিক ইতিহাস ইত্যাদি তাঁর গ্রন্থ সমূহের বিষয়বস্তু। সহজ সরল গদ্যে জটিল বিষয়ের উপস্থাপনই তাঁর কলমের বৈশিষ্ট্য।


















