বৃহস্পতিবার ১৮ জুন, ২০২৬


কলকাতায় বৃষ্টি

ছবি : প্রতীকী। সংগৃহীত।

মহর্ষি নারদ নবীন রাজা যুধিষ্ঠিরকে প্রশ্নচ্ছলে, রাজ্যশাসন বিষয়ে রাজার ব্যক্তিগত ত্রুটিবিচ্যুতি সম্বন্ধে সচেতন করেছেন। রাজার দৈনন্দিন কার্যাবলির মধ্যে এ যেন রাজার যে কাজগুলি পরিহার করা উচিত কর্তব্য সে বিষয়ে সতর্কবার্তা। দিনের পূর্বভাগ অর্থাৎ দিবাভাগে রাজার প্রতি সাবধানবাণী—মদ্যপান, দ্যূতক্রীড়া, নারীসঙ্গ এবং আসক্তিজনিত ব্যয় সম্বন্ধে প্রজারা জানেন না তো? এই প্রশ্নের অন্তরালে প্রচ্ছন্ন রইল এই উপদেশ যে এইগুলি দিবাভাগে বর্জনীয়। আয়ের অর্দ্ধ ভাগে, কিংবা তিন ভাগের এক ভাগে,বা চার ভাগের এক ভাগে ব্যয় নির্বাহ হয় তো? অর্থাৎ নারদ ঋষি, রাজার ব্যয়বাহুল্যের পরিপন্থী। মহর্ষি নারদের পরবর্তী জিজ্ঞাসা—রাজা ধনধান্য প্রভৃতি দানের মাধ্যমে, নিজের আশ্রিত জ্ঞাতি, গুরু, বৃদ্ধ, বণিক, শিল্পী এবং দুর্গত মানুষদের অনুগৃহীত করেন কী? আশ্রিত ও দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়ানো যে রাজার কর্তব্য।

আয়-ব্যয়ের হিসাব রক্ষা করেন যাঁরা, তাঁরা যথাসময়ে নিজেদের কাজ করেন কি না সেই বিষয়টি সম্বন্ধে রাজা সর্বদা অবহিত থাকবেন। আয়ব্যয়ের বিষয়ে যুক্ত গণক এবং নথীভুক্তকরণে নিযুক্ত (লেখনকারীগণ) সকলে (রাজকর্মচারীগণ) দিনের পূর্বার্দ্ধে তাঁদের কাজ সুসম্পন্ন করেন তো? রাজার সহনশীল হওয়াই বাঞ্ছনীয় তাই নারদের প্রশ্ন, পূর্বে কোনও অপরাধ করেননি, কর্তব্য বিষয়ে কোনও গাফিলতি নেই যাঁদের, শুভাকাঙ্ক্ষী ও প্রীতিভাজন ব্যক্তিদের রাজা কর্মচ্যুত করেন না তো? নারদমুনির এই প্রশ্নে বোধ হয় এই বিশ্বাস নিহিত রয়েছে যে কদাচিৎ বিশ্বাসভঙ্গ করলেও তাঁরা হয়তো রাজার ক্ষমার যোগ্য।
মহর্ষির পরবর্তী প্রশ্ন, রাজা সম্পূর্ণ জ্ঞাত হয়ে যোগ্যতানুসারে উত্তম, মধ্যম ও অধম ব্যক্তিদের স্ব স্ব কাজে নিযুক্ত করেন তো? ঋষির প্রশ্নের যথেষ্ট যৌক্তিকতা রয়েছে, কারণ তা না হলে, উত্তমের স্থলাভিষিক্ত অধম অনর্থ সৃষ্টি করতে পারে যে। রাজা কখনও লোভী, চোর, বিদ্বেষপরায়ণ শত্রু বা অপ্রাপ্তবয়স্কদের কাজে নিযুক্ত করেন না তো? রাজকর্মচারীদের নিয়োগপ্রক্রিয়া যাতে পরিচ্ছন্ন ও বিবেচনাপ্রসূত হয় সে বিষয়টিতে রাজার দৃষ্টি আকর্ষন করেছেন ঋষি নারদ। কখনও লোভী শঠ, চোর, বালক বা স্ত্রীলোকের প্রতি কামাসক্তিবশত কোনও ব্যক্তি বা রাজা নিজে রাজ্যে কোন উৎপীড়নের কারণ হন না তো?কৃষকরা সেখানে কৃষিবল অর্থাৎ শস্যলাভহেতু সমৃদ্ধ আছেন? হয়তো ঋষি মনে করেন, রাষ্ট্রের সার্বিক সমৃদ্ধি রাজার লক্ষ্য হওয়া উচিত।তাই তাঁর এই প্রশ্ন।কৃষি দেশের প্রাণ। এ বিষয়টি মাথায় রেখেই হয়তো যুধিষ্ঠিরের প্রতি মহর্ষির পরবর্তী প্রশ্ন, রাজ্যে ভাগে ভাগে জলপূর্ণ বৃহৎ জলাশয় আছে? দেশের কৃষি, শুধু দৈবানুকূল্যহেতু বৃষ্টিপাতনির্ভর নয় তো? কৃষকের ধান্যাদির বীজ ও অন্ন যেন বিনষ্ট না হয়। রাজা অনুগ্রহসহকারে নামমাত্র সুদে ঋণ দান করেন করেন তো? অর্থাৎ রাজার পক্ষে উদারতা সর্বদাই কাম্য। রাজার বার্তা অর্থাৎ কৃষি, পশুপালন ও বাণিজ্য ও সুদগ্রহণাদি কাজ, সৎ ব্যক্তিরা সম্পন্ন করেন তো? বার্তাশ্রিত বা কৃষি প্রভৃতি কাজে নিযুক্ত ব্যক্তিরা যত সুখে থাকেন ততই রাজ্য সমৃদ্ধি লাভ হয়। মহর্ষি নারদ তাঁর প্রশ্নে, কৃষির গুরুত্বসম্বন্ধে আভাস দিয়েছেন।
আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৩৬: এক অনন্য অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ রামচন্দ্রের অরণ্যবাস

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৩৯: শেফালিকার বিপদ

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১৩৮: পার্ক স্ট্রিট থেকে মহর্ষি ফিরে এসেছিলেন জোড়াসাঁকোয়

আকাশ এখনও মেঘলা/৪১

বীর, যথাসম্ভব শিক্ষিত,কার্যদক্ষ পাঁচ পাঁচ জন ব্যক্তি মিলিত হয়ে রাজ্যে বিবাদ প্রভৃতি নিষ্পত্তি করেন তো? রাজ্যের গ্রাম ও গ্রামের প্রান্তসীমায় রক্ষণাবেক্ষণের বিষয়গুলিতেও রাজার যত্ন আবশ্যক। গ্রামগুলিতে নগরশ্রীরক্ষার নিমিত্ত, গ্রামগুলি নগরতুল্য এবং গ্রামের প্রান্তসীমাগুলি (নীচবর্ণগুলি অধ্যুষিত স্থান) গ্রামের মতো হয়েছে তো? সেখানে প্রান্তিক গ্রামবাসীরা রাজার ওপরে সমস্ত দায়িত্বভার অর্পণ করেছেন কি না? মহর্ষির বিবেচনায়, রাজ্যের সুরক্ষার বিষয়টিও উপেক্ষণীয় নয়। তাই তাঁর প্রশ্ন, সৈন্যদের সঙ্গে অনুগত পুরুষগণ চোরদের নির্মূল করতে রাজ্যের সম (সহজ গমনযোগ্য) ও বিষম (দুর্গম) স্থানগুলিতে টহল দেয় তো? রাজার স্ত্রীলোকের সঙ্গে ব্যবহারে সামঞ্জস্য আছে কি না, সেই বিষয়েও মহর্ষি নারদের কৌতূহল। তাই তাঁর জিজ্ঞাসা, রাজা কি স্ত্রীলোকদের সঙ্গে মধুরালাপ করেন? তাঁরা রাজার কাছে সুরক্ষা পেয়ে থাকেন কী? ঋষির প্রশ্নের মধ্যে যেন দৃঢ় প্রত্যয়ের সুর, নারীরা রাজার বিশ্বাসপাত্রী নন নিশ্চয়ই,কখনও তাঁদের কাছে রাজা গুপ্ত বিষয় প্রকাশ করেন না তো? রাজার দৈনন্দিন জীবনচর্চাও নারদমুনির প্রশ্নের বিষয়। কোন আসন্ন মহাবিপদের বৃত্তান্ত শুনে, সেই বিষয়ে চিন্তা করে, প্রিয় বিষয়গুলি (ফুল, মালা, নারীসঙ্গ প্রভৃতি) উপভোগ করতে, রাজা, অন্তঃপুরে শয়ন বর্জন করেন তো? অর্থাৎ রাজা যেন বিপদের প্রতীকারার্থে পিছুপা না হন। রাজা, রাত্রির মধ্যম দুই প্রহর যাবৎ নিদ্রাভিভূত হয়ে, পশ্চিম প্রহরে (শেষ প্রহরে) জেগে উঠে, ধর্ম ও অর্থবিষয়ে চিন্তা করেন তো?রাজা যথাসময়ে ঘুম থেকে উঠে, সময়সম্বন্ধে অবহিত মন্ত্রীগণের সঙ্গে প্রত্যহ সুসজ্জিত হয়ে, মানুষদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন কী? রক্তিমবসনপরিহিত, খড়্গহস্তে, সশস্ত্র পুরুষরা, শত্রুনাশক রাজার সুরক্ষানিমিত্ত চতুর্দিকে অবস্থান করে পরিষেবা দিয়ে থাকেন? সম্যক বিবেচনা করে,রাজা অপ্রিয় দণ্ডযোগ্যদের প্রতি এবং প্রিয় পূজ্যদের প্রতি যথাক্রমে যমতুল্য নিষ্ঠুর ও কোমল ভাবমূর্তি ধারণ করেন তো? রাজার মানসিক স্বাস্থ্যসম্বন্ধেও মহর্ষি সম্পূর্ণভাবে অবহিত, তাই সেই সম্বন্ধে পরবর্তী প্রশ্ন করলেন। রাজা, ওষুধ বা বিশেষ নিয়ম আশ্রয় নিয়ে এবং অভিজ্ঞ বৃদ্ধদের উপদেশ গ্রহণ করে, দৈহিক কষ্ট ও মানসিক যন্ত্রণার নিরসন করেন তো? অষ্টাঙ্গ চিকিৎসায় বিশারদ বৈদ্যগণ, শুভাকাঙ্ক্ষী এবং অনুরক্ত ব্যক্তিরা সর্বদা রাজার শারীরিক হিতসাধনে নিরত রয়েছেন কী?
আরও পড়ুন:

সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১২৪: সুন্দরবনের পাখি: গোত্রা

ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৭৯: ‘বেতারে দু-খানা গান গাইলাম, পারিশ্রমিক পেলাম দশ টাকা’

মহর্ষি রাজার বিচারবিষয়েও প্রশ্ন রেখেছেন। বাদী, প্রতিবাদীর উপস্থিতিতে রাজা লোভ, মোহ ও মানবশত তাঁদের বিবাদসম্বন্ধে আলোচনা করেন না, এমন হয় না তো? অন্তর্নিহিত অর্থ বোধ হয় এই যে, বিচার্য বিষয়টিতে রাজার ঔদাসীন্যের প্রকাশ যেন না ঘটে। রাজা কখনও লোভ, মোহবশত, অন্যের কথায় বিশ্বাস ও আস্থাহেতু আশ্রিত মানুষদের দেয় ভাতা বন্ধ করেন না তো?রাজা শত্রুদের মনোভাব অবগত আছেন কি না সেই সম্বন্ধে সতর্ক করলেন ঋষি। কখনও (শত্রুরা অর্থ গ্রহণ করে যাদের ক্রয় করেছে এমন) ক্রীত, নগরবাসী পৌরগণ এবং দেশবাসীরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে, রাজার বিরুদ্ধ আচরণ করেন কী? রাজা কখনও বলপ্রয়োগ করে দুর্বল শত্রুকে উৎপীড়ন করেন না তো? কখনও মন্ত্রের মাধ্যমে, কখনও বা মন্ত্র ও বল উভয়ের দ্বারা বলবান শত্রুকেও কিন্তু নির্যাতন নয়। মনে হয় মহর্ষি রাজার নির্মম ভাবমূর্তিধারণ বিষয়টি সমর্থন করেননি। নারদ ঋষির জিজ্ঞাস্য, প্রধান ভূপতিগণ রাজার প্রতি অনুরক্ত রয়েছেন তো? রাজার দ্বারা সমাদৃত ব্যক্তিরা রাজার জন্যে কখনও প্রাণ দান করতে পারেন? অর্থাৎ রাজার আস্থাভাজন ব্যক্তিত্বরা বিশ্বস্ত আছেন তো? রাজা গুণানুসারে সব বিদ্যাকেই সম্মান করেন? নিশ্চিত শ্রেয় ও মঙ্গল সাধন করেন যে ব্রাহ্মণ ও সাধুগণ, তাঁদের রাজা সমাদর করেন না এমন নিশ্চয়ই নয়?
আরও পড়ুন:

উপন্যাস: দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-৬: বিষণ্ণ সকাল, নিঃসঙ্গ আদিনাথ

সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-১৩ : জনঅরণ্য: সরস্বতী না লক্ষ্মী?

মহর্ষি নারদের প্রশ্নের যেন শেষ নেই। পূর্বপুরুষদের আচরিত ত্রয়ী অর্থাৎ ত্রিবেদমূলক ধর্মে রাজা প্রবৃত্ত হয়েছেন কী? বিদ্যাগুণসম্পন্ন ব্রাহ্মণগণ, যথাবিধি প্রভূত দক্ষিণাদান করা হয় যাঁদের, তাঁরা, রাজগৃহে সুস্বাদু অন্ন ভোজন করেন তো? রাজা সর্বদা একাগ্রচিত্তে ও যত্নবান হয়ে, সার্বিকভাবে বাজপেয় ও পুণ্ডরীক যাগ সম্পাদন করতে যত্নশীল তো?নারদ মুনির মতে, রাজার আচরণবিধির মাপকাঠি কেমন? রাজা হিতকারী জ্ঞাতি, গুরু, বৃদ্ধ, দেবতা, তাপস, চৈত্য অর্থাৎ দেবস্থানের দেবকল্প বৃক্ষ ও ব্রাহ্মণগণকে নমস্কার করেন তো? জিজ্ঞাসু মহর্ষির প্রশ্ন, হে নিষ্পাপ, আপনি কারও শোক, ক্রোধ সৃষ্টি করেন না তো?বরং কোন না কোন মানুষের কল্যাণহস্ত আপনার পাশে সর্বদা থাকে তো? কচ্চিচ্ছোকো ন মন্যুর্বা ত্বয়া প্রোৎপাদ্যতেঽনঘ!। অপি মঙ্গলহস্তশ্চ জনঃ পার্শ্বেঽনুতিষ্ঠতি।।

পাপমুক্ত রাজার বুদ্ধি ও আচরণ আয়ুষ্কর, যশস্কর, ধর্ম অর্থ ও কাম অনুসরণ করে চলছে তো? এমন বুদ্ধি অনুসারে চললে রাজার রাজ্য করায়ত্তহীন হয় না। পৃথিবী জয় করে, রাজা অত্যন্ত সুখ লাভ করেন। রাজপরিমণ্ডলে অবস্থান করেন যে রাজকর্মচারীরা, তাঁদের কার্যাবলী বিবেচনাপ্রসূত কি না, সেই বিষয়েও মহর্ষি নারদের ঔৎসুক্য। তাই তাঁর প্রশ্ন, কখনও সৎকুলজাত, পূতহৃদয়, পবিত্র, কোন ব্যক্তি মিথ্যা চৌরাপবাদগ্রস্ত হলে, রাজার শাস্ত্রজ্ঞানহীন রাজকার্যে নিপুণ রাজকর্মচারীরা তাঁকে হত্যা করেন না তো? দুর্বৃত্ত চৌর্যবৃত্তিধারী ব্যক্তি কারণসহ অর্থাৎ অপহৃত দ্রব্যসহ ধরা পড়লে, রাজকর্মচারীরা সেই চোরের কাছে অর্থের বিনিময়ে (ঘুষ গ্রহণ করে) তাকে মুক্ত করে দেয় কী? ধনবান ও দরিদ্রের মধ্যে বিরোধ হলে, রাজার (বিচারক পদাধিকারী) অমাত্যরা (ধনাঢ্যের থেকে) অর্থ দ্বারা প্রভাবিত হয়ে মিথ্যা বিচার করেন না তো? মহর্ষির মতে, রাজার চোদ্দটি দোষ বর্জন করা কর্তব্য। সেগুলি হল যথাক্রমে—নাস্তিক্য, মিথ্যাচার, ক্রোধ, অমনোযোগ, দীর্ঘসূত্রতা (দৈনন্দিন যে কোন কাজে অযথা দীর্ঘ সময় নষ্ট করা),জ্ঞানী ব্যক্তির সঙ্গে সাক্ষাৎকার-বর্জন, আলস্য, চঞ্চলমতিত্ব, কেবলমাত্র একটি চিন্তায় মগ্ন থাকা, অর্থবিষয়ে অনভিজ্ঞদের সঙ্গে অর্থসম্বন্ধে আলোচনা, অবশ্যকর্তব্য নিশ্চিত বিষয় আরম্ভ না করা, গোপনীয় মন্ত্রণা যথাযথ রক্ষা না করা, অশুভ প্রয়োগ অর্থাৎ বিরাগভাজনদের প্রতি বিষপ্রয়োগ এবং কোন বিষয়ে অতিরিক্ত আসক্তি। মহর্ষি জানতে ইচ্ছুক রাজা যুধিষ্ঠির এগুলি পরিহার করেন তো? কারণ এই দোষগুলি সুপ্রতিষ্ঠিত রাজাদেরও প্রায়শই ধ্বংস করে থাকে।
আরও পড়ুন:

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৬৬: জীবন নিয়ে কৌতুক আর ‘যৌতুক’

রহস্য রোমাঞ্চের আলাস্কা, পর্ব-৬৫: একদিকে জল, অন্যদিকে পাহাড় সিউয়ার্ডের রাস্তা যেন স্বর্গদ্বার!

মহর্ষি নারদের এর পরে জিজ্ঞাস্য বিষয়ে, রাজার সাফল্য কোথায়? এই বার্তা নিহিত ছিল। প্রশ্নগুলি ছিল— রাজার বেদাধ্যয়ন সফল হয়েছে কি না, তাঁর ধনসম্পদ সফল হয়েছে কী? রাজার পত্নী (সঙ্গ) সফল তো? সেইসঙ্গে তাঁর শাস্ত্রজ্ঞান সাফল্যমণ্ডিত হয়েছে কি না। ইন্দ্রপ্রস্থে রাজা যুধিষ্ঠিরের রাজসভায় উপস্থিত মহর্ষি নারদের প্রশ্নমালায় কত না বিচিত্র কৌতূহল রাজার আয়ব্যয়ের হিসাব, হিসাবরক্ষকদের সততা, রাজার বদান্যতা, অর্থবিষয়ে নিযুক্ত রাজকর্মচারীদের সততা ও নিয়মানুবর্তিতা, কর্মচারীদের প্রতি রাজার ন্যায়পরায়ণতা, তাঁদের যোগ্যতানুযায়ী কর্মসামর্থ্যনির্দ্ধারণ, কর্মচারীদের নিয়োগপ্রক্রিয়া, রাজার উৎপীড়ক ভাবমূর্তি প্রভৃতিবিষয়ক প্রশ্নগুলিতে আছে নবীন রাজার রাজনৈতিক সচেতনতাবৃদ্ধির প্রয়াস।

কৃষিভিত্তিক দেশে শস্যোৎপাদনের মূল হল জলের সংরক্ষণব্যবস্থা যা এখনও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কৃষিতে বীজ ও শস্য যাতে সুরক্ষিত থাকে সেটি দেখাও রাজার তত্ত্বাবধানের বিষয়। কৃষি, পশুপালন ও বাণিজ্যে, স্বল্পসুদে ঋণদান এবং ঋণশোধে নমনীয়তা অবলম্বন, যে কোন উন্নত প্রশাসকের উদারনীতির পরিচায়ক। কৃষিভিত্তিক সমাজে প্রশাসকের সদর্থক ভূমিকা কেমন হবে সে বিষয়ে মহর্ষি নারদের প্রশ্নগুলি, আধুনিক ভারতীয় সমাজে প্রশাসনের উদারনৈতিক সদর্থক পদক্ষেপগ্রহণের সঙ্গে সমমনস্ক চিন্তার মেলবন্ধন বলা যেতে পারে।

শুধু কৃষি নয়,বিচারব্যবস্থায় শিক্ষিত ও কার্যদক্ষ বিচারক প্রয়োগের আবশ্যকতা রয়েছে,এই প্রশ্নটি বিচারব্যবস্থার স্বচ্ছতারক্ষার দিকদর্শন, যেটি এখনও বহু আলোচিত চর্চিত বিষয়। শুধু নগর নয়, গ্রামোন্নয়ন নগরোন্নয়নের সমতুল হওয়া প্রয়োজন। এ ছাড়াও প্রান্তিক মানুষদের স্বার্থরক্ষার দায়িত্বভার রাজার, এ বিষয়টিও রাজা যুধিষ্ঠিরের নজরে এনেছেন মহর্ষি নারদ।
কলকাতায় বৃষ্টি

ছবি : প্রতীকী। সংগৃহীত।

রাজার রাজ্যে সুরক্ষারক্ষার্থে প্রজাদের নিরাপত্তাবিষয়ে রাজাকে যত্নশীল হতে হবে,সেই কারণেই সৈন্যবলের সঙ্গে মিলিতভাবে রক্ষীবাহিনীর, চোরদের অপহরণ প্রভৃতি নাশকতামূলক কাজের, প্রতিরোধব্যবস্থা করা প্রয়োজন। রাজ্যে রাজার ব্যবহারে নারীরা অবহেলিত বা অসম্মানিত যেন না হন সেইসঙ্গে নারীদের প্রতি অনাস্থাপ্রকাশেও মহর্ষি অকপট। কোন গুপ্তবিষয় যেন স্ত্রীলোকের কাছে প্রকাশিত না হয় কারণ তাঁরা বিশ্বাসযোগ্য নন। এই মনোভাব যুগধর্ম অর্থাৎ তৎকালীন পুরুষতান্ত্রিকতার প্রভাব বলেই মনে হয়।মহাবিপদের সময়ে ভোগাসক্তি পরিত্যাগ করে,তার প্রতীকারের প্রচেষ্টা অন্যতম রাজধর্ম—এ কথা স্মরণে এনেছেন নারদ মুনি।

রাজার দৈনন্দিন জীবনযাপন যেন শৃঙ্খলাবদ্ধ হয়। রাজার রাত্রির শেষ প্রহরে চিন্তা করবেন, ধর্ম ও অর্থবিষয়ে। সদ্য নিদ্রাবসানে স্থির মস্তিষ্কে ধর্ম ও অর্থচিন্তা রাজার মনে অনেক সদর্থক ফলপ্রসূ চিন্তার উদ্ভব হতে পারে, ঋষি, সেই বিষয়টি হয়তো বিবেচনা করেছেন। মন্ত্রী-সহ রাজার জনসমক্ষে আত্মপ্রকাশ,তথাকথিত আধুনিক প্রশাসক, জনপ্রতিনিধিদের আমজনতার সঙ্গে সাক্ষাতের দৃশ্য মনে করিয়ে দেয়। বিচারব্যবস্থায় রাজার সিদ্ধান্ত, সকলের প্রতি সমদৃষ্টিসম্পন্ন হওয়া চাই, সেটি পক্ষপাতদুষ্ট যেন না হয়। নিরপেক্ষ বিচার সর্বযুগে,সর্বকালেই প্রশংসনীয় যে। রাজার মানসিক সুস্থতা সর্বদাই কাম্য। তাই সেই বিষয়টি যেন অবহেলিত না হয়। মানসিক সুস্থতা ও তার প্রতিবিধানের উপায়গুলি আধুনিক যুগেও ভীষণভাবে প্রাসঙ্গিক। শত্রুদের গতিবিধি ও মনোভাব বিষয় যেন রাজা অবগত থাকেন কারণ, শত্রুদের প্ররোচনায়, রাজার প্রতি প্রজাদের ঐক্যবদ্ধ বিরুদ্ধাচরণ কখনই কাম্য নয়। মহর্ষির অভিমত,প্রশাসনে বিশ্বস্ততা আবশ্যিক তেমনই বিশ্বস্ত ব্যক্তিদের সমাদর ও সম্মান প্রদর্শন রাজার অন্যতম কর্তব্য। তাঁর প্রশ্নে প্রকারান্তরে সেই মতটিই প্রকাশিত হয়েছে। কারও বিদ্বেষ নিয়ে নয়, বিনয় ও নম্রতা সহযোগে,সম্মানীয়দের যথাযোগ্য সম্মান প্রদর্শন সকলের আশীর্বাদধন্য রাজার সাফল্যের কারণ।

মহর্ষির প্রশ্নে রাজকীয়পরিমণ্ডলে রাজকর্মচারীদের সততাবিষয়টির গুরুত্ব যে অপরিসীম,সেটি পরিস্ফুট হয়েছে। তাঁদের পরিচ্ছন্ন নির্লোভ ভাবমূর্তি আবশ্যক। অর্থ দিয়ে যেন রাজকর্মচারীদের কোনভাবেই প্রভাবিত করা না যায়।

রাজার চোদ্দটি দোষ পরিহার করেন কি না, সেই দোষগুলি বোধ হয় সব যুগেই প্রশাসকদের বর্জনীয় দোষ বলে চিহ্নিত। আধুনিক যুগে প্রশাসকগণ সেগুলি বর্জনে, উদ্যোগী হবেন কবে? এই প্রশ্নে হয়তো সকল সুধী পাঠকবৃন্দ, নৈরাশ্যজনক দীর্ঘশ্বাস বুকে চেপে নীরব হবেন।—চলবে।

* মহাকাব্যের কথকতা (Epics monologues of a layman): পাঞ্চালী মুখোপাধ্যায় (Panchali Mukhopadhyay) অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপিকা, সংস্কৃত বিভাগ, যোগমায়া দেবী কলেজে।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content