রবিবার ৭ জুন, ২০২৬


কলকাতায় বৃষ্টি

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও রজনীকান্ত সেন।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে রজনীকান্ত সেনের পরিচয়, আলাপ, পত্র-বিনিময়, সাহিত্যকেন্দ্রিক ও সাঙ্গীতিক আলোচনা বহু চর্চিত। কিন্তু চর্চার আড়ালে রয়ে গিয়েছে তাঁদের গানে একে-অপরের সুরের আনুগত্যর কথা, যে আনুগত্যের ছায়া পড়েছে তাঁদের সঙ্গীত ভাবনাতে, এমনকি তাঁদের গানে কথার মালা গাঁথাতেও!

যেমন, ৪ঠা জুন ১৯০৪ সালে শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রনাথ রচনা করেন, “দাঁড়াও আমার আঁখির আগে।/ তোমার দৃষ্টি হৃদয়ে লাগে।।” গানটির সুর অবলম্বন করে ১৯১০ সালের জুন মাসে কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে রজনীকান্ত গান বাঁধেন “শুনাও তোমার অমৃতবাণী,/ অধমে ডাকি চরণে আনি।”

আবার, ১৩১২ বঙ্গাব্দের ভাদ্র মাসে প্রকাশিত রজনীকান্ত সেনের দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘কল্যাণী’র অর্ন্তগত “তুমি, অন্তহীন, বিরাট্, এ নিখিল-ব্যাপী-অচ্যুত অক্ষর!/ আমি, ধূলি-কণিকা, ক্ষুদ্র, দীন, নগণ্য, তুচ্ছ, বিনশ্বর।” গানটির ছায়া কি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ৫ই আশ্বিন ১৩১৭ বঙ্গাব্দের রচনা “প্রভু আমার, প্রিয় আমার পরম ধন হে।/ চিরপথের সঙ্গী আমার চিরজীবন হে।।” এর মধ্যে পড়েনি? নিশ্চিতভাবে পড়েছে।

রবীন্দ্রনাথের কোনও গান শুনলেই যেমন আমরা রবীন্দ্রসঙ্গীত বলে চিনতে পারি, শুনলেই যেমন আলাদা করে চিনতে পারি কোনটা দ্বিজেন্দ্রলালের গান, কোনটা অতুলপ্রসাদের গান, কোনটাই বা নজরুলের গান, তেমনই রজনীকান্তের গানের কথা আর সুরের চলনই বলে দেয় এটি রজনীকান্তের গান।

বাণীর সঙ্গে সুরের একাত্মতাই রবীন্দ্রনাথের গানের নিজস্বতা। আবার, রজনীকান্তের গানে, সুরের পেলবতা এমন অবিচ্ছেদ্যভাবে বাণীর সঙ্গে মিশে গিয়েছে যে সে গান শুনতে শুনতে বার বার মনে হয় কোনও বিকল্প সুরেই যেন তাঁর বাণীর প্রকৃত রূপ প্রকাশ পাওয়া সম্ভব নয়।

রজনীকান্ত সেন তাঁর প্রতিভার প্রতি সন্দিহান হয়ে লিখেছিলেন, “দেশের এই শত শত প্রতিভা-মার্ত্তণ্ডের মধ্যে আমি জোনাকি।” কিন্তু সঙ্গীতরসিক বাঙালি জানেন, কান্তকবি শুকতারার মতন পথ দেখাবেন, বাংলার মন আলো করে সর্বদা বিরাজ করবেন।

রজনীকান্ত সেনের দৌহিত্র দিলীপকুমার রায় কান্তকবি সম্পর্কে লিখেছিলেন, “…গান গাওয়ার মধ্য দিয়েই তিনি ঈশ্বরসান্নিধ্য পেতেন। গান লেখা শুধু নয়, গান গাওয়াটাও ছিল তাঁর ঈশ্বর সাধনার পথ।” (‘কান্তকবির গান’) রবীন্দ্রনাথের বেলাতেও উক্তিটির প্রতিধ্বনি করা যায়। রবীন্দ্রনাথের ১৮৮৭ খৃষ্টাব্দের রচনা “তোমার জ্ঞানে তোমার ধ্যানে তব নামে কত মাধুরী/ যেই ভকত সেই জানে,/ তুমি জানাও যারে সেই জানে।/ ওহে, তুমি জানাও যারে সেই জানে॥” যখন শুনি, অবধারিতভাবে মনে বেজে ওঠে ১৯০২ খৃষ্টাব্দে প্রকাশিত রজনীকান্তের “বাণী”-র ‘তোমারি’ গানটি—“আমিও তোমারি গো, তোমারি সকলি ত,/ জানিয়ে জানে না, এ মোহ-হত চিত/ আমারি ব’লে কেন, ভ্রান্তি হ’ল হেন,/ ভাঙ্গ এ অহমিকা, মিথ্যা, গৌরব।” দু’টি গানই তেওরায় বাঁধা। আশ্চর্যজনকভাবে, দু’টি গানের সুরও অভিন্ন।

আরও পড়ুন:

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১৩১: মহর্ষি চেয়েছিলেন শান্তিনিকেতনে মৃত্যু

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৩২: প্রেম নামে বন

উপন্যাস: আকাশ এখনও মেঘলা, পর্ব-৩৩: আকাশ এখনও মেঘলা

ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৭৫: পূর্বোত্তরে আন্তরাজ্য সীমা বিবাদ

জীবনে বহু দুঃখ-বেদনা, ঝড়-ঝঞ্ঝার মধ্যে দিয়ে পথ চলতে-চলতেও রজনীকান্ত কখনওই ঈশ্বরের প্রতি বিশ্বাস হারাননি। রবীন্দ্রনাথের ক্ষেত্রেও এই একই কথা প্রযোজ্য। সঙ্গীত তাঁদের শোক থেকে উত্তরণের পথের সঙ্গী হয়েছে।

‘ক্যাপিলারি ব্রংকাইটিসে’ রজনীকান্তের তৃতীয় পুত্র ভূপেন্দ্রনাথের মৃত্যু হয়। পরদিন তিনি রচনা করেন, ‘তোমারি দেওয়া প্রাণে, তোমারি দেওয়া দুখ,/ তোমারি দেওয়া বুকে, তোমরি অনুভব।’ “কান্তকবি রজনীকান্ত”-তে নলিনীরঞ্জন পন্ডিত লিখেছেন, “.. কবি হৃদয়ে কঠিন আঘাত পাইলেন। বুক দমিল, তবু মুখ ফুটিল না। ভগবদ্‌বিশ্বাসী কবি নীরবে এই নিদারুণ শোক কেবল যে জয় করলেন তাহা নহে, পুত্রশোক-দগ্ধ হৃদয়ে তিনি অপূর্ব সান্ত্বনা লাভ করিলেন।” সবই তো ঈশ্বরের দেওয়া। সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না, দেওয়া-কেড়ে নেওয়া—সবই তো তাঁর। ১৯০২ সালে গানটি সংকলিত হয় তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘বাণী’তে।

১৯০৭ সালে রবীন্দ্রনাথের কনিষ্ঠ পুত্র শমীন্দ্রনাথের মৃত্যু হয় কলেরায়। রবীন্দ্রনাথ মীরা দেবীকে লিখেছেন, “…যে রাত্রে শমী গিয়েছিল সে রাত্রে সমস্ত মন দিয়ে বলেছিলুম বিরাট বিশ্বসত্তার মধ্যে তার অবাধ গতি হোক। আমার শোক তাকে একটুকুও যেন পিছনে না টানে। … রেলে আসতে আসতে দেখলুম জ্যোৎস্নায় আকাশ ভেসে যাচ্চে, কোথাও কিছু কম পড়েচে তার লক্ষণ নেই। মন বল্লে কম পড়েনি – সমস্তর মধ্যে সবই রয়ে গেছে, আমিও তারি মধ্যে। …” আবার কাদম্বিনী দত্ত-র সহানুভূতির উত্তরে লিখেছেন, “ঈশ্বর আমাকে বেদনা দিয়েছেন কিন্তু তিনি ত আমাকে পরিত্যাগ করেন নাই—তিনি হরণও করিয়াছেন পূরণও করিবেন। ..” শোক কিছুদিনের মধ্যেই প্রার্থনায় রূপান্তরিত হয়েছে, রবীন্দ্রনাথ রচনা করেছেন, “অন্তর মম বিকশিত করো অন্তরতর হে –/ নির্মল করো, উজ্জ্বল করো, সুন্দর করো হে।।”

দুই দার্শনিক ব্যক্তিত্বের অনুরূপ সমাপতন।

আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৩০: অলৌকিকতার আবরণে লৌকিক-অনুভবের পরশ

সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-১০ : নায়ক ও মহাপুরুষ

১৩১২ বঙ্গাব্দের ভাদ্র মাসে প্রকাশ পায় রজনীকান্ত সেনের দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘কল্যাণী’। ‘কল্যাণী’র অর্ন্তগত “তুমি, অন্তহীন, বিরাট্, এ নিখিল-ব্যাপী-অচ্যুত অক্ষর!/ আমি, ধূলি-কণিকা, ক্ষুদ্র, দীন, নগণ্য, তুচ্ছ, বিনশ্বর।” গানটির ছায়া কি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ৫ আশ্বিন ১৩১৭ বঙ্গাব্দের রচনা “প্রভু আমার, প্রিয় আমার পরম ধন হে।/ চিরপথের সঙ্গী আমার চিরজীবন হে।।” গানটির মধ্যে পড়েনি? গান দু’টির বাণী পড়লেই উত্তর পাওয়া যাবে। দু’টি গানেরই কিছু অংশ ফিরে পড়া যাক্!

‘তুমি ও আমি’-তে রজনীকান্ত লিখেছেন—
আমি, গর্ব করি, তবু, পুত্র তব, প্রভু,
ভ্রমি সুমঙ্গল পদতলে;
তুমি, এক-গৌরব-গর্ব-বঞ্চিত না কর, প্রভু দুর্বলে!


কিছুকাল পরেই রবীন্দ্রনাথ যে গানটি রচনা করেছেন, পড়ে মনে হয় সেটি যেন পূর্বোক্ত গানটিরই পরিবর্ধিত রূপ—
ওগো সবার, ওগো আমার, বিশ্ব হতে চিত্তে বিহার—
অন্তবিহীন লীলা তোমার নূতন নূতন হে॥
কলকাতায় বৃষ্টি

রজনীকান্ত সেন।

দুই মহামানবের গানে সুরের আনুগত্যের বহু দৃষ্টান্ত রয়েছে। ‘রজনীকান্ত কাব্যগুচ্ছ’ থেকে জানা যায়, কান্তকবি তাঁর ‘নিস্ফলতা’ শীর্ষক গানটি (“আমি সকল কাজের পাই হে সময়, তোমারে ডাকিতে পাইনে;”) রবিঠাকুরের “তোমার কথা হেথা কেহ তো বলে না, করে শুধু মিছে কোলাহল।” গানটি অবলম্বনে বেঁধেছেন। কিন্ত, দু’জনের গানে বাণীর আনুগত্য? সেই নিদর্শনও নেহাত কম নয়।
১৩১২ বঙ্গাব্দে প্রকাশিত ‘কল্যাণী’-তে ‘তুমি মূল’ গানে রজনীকান্ত বলেছেন—

তুমি, প্রেমের চির-নিবাস হে,
তাই, প্রাণে প্রাণে প্রেম-পাশ হে,
তাই, মধুমমতায়, বিটপি-লতায়, মিলি প্রেম-কথা কয়;
জননীর স্নেহ, সতীর প্রণয়, গাহে তব প্রেমজয়।


১৩১৭ বঙ্গাব্দে রচিত রবীন্দ্রনাথের গানে সেই ভাবই যেন অনুরণিত হতে দেখা যাচ্ছে—
কবে আমি বাহির হলেম তোমারি গান গেয়ে—
সে তো আজকে নয় সে আজকে নয়।
ভুলে গেছি কবে থেকে আসছি তোমায় চেয়ে
সে তো আজকে নয় সে আজকে নয়।
আরও পড়ুন:

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৯০: শত্রুকে হারাতে সব সময় অস্ত্র নয়, ছলনারও আশ্রয় নিতে হয়

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১১৭: আবাবিল

২৮ জ্যৈষ্ঠ ১৩১৭ রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে রজনীকান্তের শেষ দেখা। রোগযন্ত্রণাকাতর রজনীকান্ত সেই দিন রবীন্দ্রনাথের সব কথার উত্তর লিখে লিখে দিচ্ছিলেন। সেই কথোপকথন ধরা রয়েছে কান্তকবির হাসপাতালের ডায়েরির পাতায় পাতায়। তার কয়েকদিন পর রবীন্দ্রনাথকে চিঠি লেখেন রজনীকান্ত। ১৫ আষাঢ়ের চিঠিতে রজনীকান্ত লেখেন, “যেদিন চরণধূলায় এই কুটীর পবিত্র করিয়াছিলেন, সেইদিন হইতে তিল তিল করিয়া যেন ব্যাধির উপশম হইতেছে। এই উন্নতি স্থায়ী হয় না; কতবার মরিলাম, কতবার বাঁচিলাম, —এইরূপেই দিন যাইতেছে। আমি ঠিক বুঝিয়াছি, ভগবৎকৃপা ভিন্ন এই দেহরক্ষায় কোন উপায় বা সম্ভাবনা নাই। …আর একবার দেখিতে ইচ্ছা করে, কিন্তু সাধুসন্দর্শন তো সর্বদা হয় না।” রবীন্দ্রনাথ পরদিনই চিঠির উত্তর দিয়েছিলেন। ১৬ই আষাঢ় তিনি লেখেন, “সেদিন আপনার রোগ-শয্যার পার্শ্বে বসিয়া মানবাত্মার একটি জ্যোতির্ম্ময় প্রকাশ দেখিয়া আসিয়াছে। শরীর তাহাকে আপনার সমস্ত অস্থিমাংস, স্নায়ু-পেশী দিয়া চারিদিকে বেষ্টন করিয়া ধরিয়াও কোনমতে বন্দী করিতে পারিতেছে না, ইহাই আমি প্রত্যক্ষ দেখিতে পাইলাম। …শরীর হার মানিয়াছে, কিন্তু চিত্তকে পরাভূত করিতে পারে নাই—কন্ঠ বিদীর্ণ হইয়াছে, কিন্তু সঙ্গীতকে নিবৃত্ত করিতে পারে নাই—পৃথিবীর সমস্ত আরাম ও আশা ধূলিসাৎ হইয়াছে, কিন্তু ভূমার প্রতি ভক্তি ও বিশ্বাসকে ম্লান করিতে পারে নাই। কাঠ যতই পুড়িতেছে, অগ্নি আরো তত বেশী করিয়াই জ্বলিতেছে। …সছিদ্র বাঁশির ভিতর হইতে পরিপূর্ণ সঙ্গীতের আবির্ভাব যেরূপ, আপনার রোগক্ষত, বেদনাপূর্ণ শরীরের অন্তরাল হইতে অপরাজিত আনন্দের প্রকাশও সেইরূপ আশ্চর্য্য!”

এই দুটি চিঠির প্রেক্ষাপটে, আমরা এবার যদি দু’টি গানকে দেখি, আমরা বুঝতে পারব রজনীকান্তের জীবনবোধের ছায়া রবীন্দ্রনাথের উপরেও পড়েছিল।

যদি মরমে লুকায়ে র’বে, হৃদয়ে শুকায়ে যাবে
কেন প্রাণভরা আশা দিলে গো?
তব, চরণ-শরণ-তরে, এত ব্যাকুলতা-ভরে
কেন ধাই, যদি নাহি মিলে গো?


‘কল্যাণী’ কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত ‘কেন?’ শীর্ষক রজনীকান্তের গানটি প্রকাশিত হয় ১৩১২ সালে; আর রবীন্দ্রনাথের গানটি রচিত হয় দু’জনের শেষ দেখা হওয়ার দিন, অর্থাৎ ২৮শে জ্যৈষ্ঠ ১৩১৭—
ধায় যেন মোর সকল ভালোবাসা
প্রভু, তোমার পানে, তোমার পানে, তোমার পানে।
যায় যেন মোর সকল গভীর আশা
প্রভু, তোমার কানে, তোমার কানে, তোমার কানে।
আরও পড়ুন:

এগুলো কিন্তু ঠিক নয়, পর্ব-১: স্নানের আগে রোজ সর্ষের তেল মাখেন?

আলোকের ঝর্ণাধারায়, পর্ব-১১০: মা সারদার মানবীলীলার অবসান

কোনও কোনও সঙ্গীত সমালোচক মনে করেন, কান্তকবির গানে সুরের থেকে বাণীর মর্যাদাই বেশি, কিন্তু গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে বোঝা যায় সেই ধারণা অনেকাংশেই অমূলক। বাল্যকাল থেকে রজনীকান্ত নানান ধারার সঙ্গীত শোনার সুযোগ পেয়েছিলেন। জানা যায়, ধ্রুপদ, ধামার, খেয়াল, টপ্পা, ঠুংরি ইত্যাদি হিন্দুস্থানী উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের নানান ধারার মধ্যে তিনি ধ্রুপদের প্রতি বিশেষভাবে আকৃষ্ট হয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথের যে কয়েকটি গানের সুর রজনীকান্ত তাঁর গানে ব্যবহার করেছিলেন, তার অধিকাংশই ধ্রুপদাঙ্গের।

৪ঠা জুন ১৯০৪ সালে শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রনাথ রচনা করেন—

দাঁড়াও আমার আঁখির আগে।
তোমার দৃষ্টি হৃদয়ে লাগে।।


গানটির সুর অবলম্বন করে ১৯১০ সালের জুন মাসে কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে রজনীকান্ত গান বাঁধেন—
শুনাও তোমার অমৃতবাণী,
অধমে ডাকি’ চরণে আনি’।
কলকাতায় বৃষ্টি

রবীন্দ্রনাথ।

রজনী-কন্যা শান্তিলতা রায় তাঁর ‘কান্তকবি রজনীকান্ত’ বইয়ে বেশ কয়েকটি অপূর্ব মুহূর্তের ছবি এঁকে রেখেছেন। তারই একটির বর্ণনা দিয়ে আজকের আলোচনার ইতি টানব। শান্তিলতা দেবীর সেই স্মৃতিচারণ থেকে আমরা সহজেই অনুমান করতে পারি রবীন্দ্রনাথ ও রজনীকান্তর আত্মিক যোগাযোগ কত নিবিড় ছিল!

রবীন্দ্রনাথের কন্ঠে পিতা রজনীকান্তের গান শুনে শান্তিলতা রায় আনন্দে বিহ্বল হয়েছিলেন। সেই বিরল অভিজ্ঞতা স্মরণ করে তিনি লিখেছেন, “মহিলা সমিতির সদস্য ছিলেন আমার বড় জা প্রিয়বালা দেবী। আমার বড় জা’র নামে মহিলা সমিতি থেকে একখানা চিঠি এলো। ‘শ্রীহট্ট মহিলা সমিতির পক্ষ থেকে রবীন্দ্রনাথ ও তাঁর পুত্রবধূ প্রতিমা দেবীকে মানপত্র দেওয়া হবে, আপনাদের উপস্থিতি প্রার্থনীয়।’ পরদিন ভ্রাতৃদ্বিতীয়া। আমরা গেলাম। মনটা ভারী খুশি। রবীন্দ্রনাথ এসেছেন, প্রতিমা দেবীও এসেছেন। ভ্রাতৃদ্বিতীয়া বলে সবাই রবীন্দ্রনাথের কপালে চন্দনের ফোঁটা দিচ্ছেন। ধূপ দীপ দিয়ে বরণ করছেন। আর্শীবাদ পাবার জন্য রবীন্দ্রনাথের হাতে ধান দুর্বা দিয়ে তাঁর পায়ের কাছে মাথা নত করে আছেন। তারপরে প্রণাম করে সরে যাচ্ছেন।

রবীন্দ্রনাথ অল্পক্ষণ কিছু বললেন। তারপর সম্পাদিকা নলিনীবালা চৌধুরী বললেন, “গুরুদেব আপনি এসেছেন সময় করে, আমরা কৃতার্থ। এমনভাবে আপনাকে আমরা এত কাছে পাব এ আশা আমাদের আর নেই। আপনার মুখে একটা গান শোনবার জন্য আমরা উন্মুখ হয়ে আছি। আজ একটা গান আপনি দয়া করে আমাদের শুনিয়ে যান।” রবীন্দ্রনাথ শুনে একটু চুপ করে থেকে প্রতিমা দেবীকে আস্তে করে কিছু বললেন। তারপর সকলের দিকে চেয়ে বললেন, “আচ্ছা শোনো।” গাইলেন, ‘তুমি নির্মল কর মঙ্গল করে মলিনমর্ম মুছায়ে, তব পুণ্য কিরণ দিয়ে যাক মোর মোহকালিমা ঘুচায়ে।’ মন্ত্রমুগ্ধের মতো সবাই গান শুনলেন। যখন গান থামল, তখন সম্বিত ফিরে পেলাম। আমার মনে তখন রজনীকান্তের রূপ ভেসে উঠেছিল।”

শান্তিলতা আরও লিখেছেন, “তখন কলকাতার বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের সভাপতি রামেন্দ্র সুন্দর ত্রিবেদী। রজনীকান্ত মাঝে মাঝেই কলকাতা আসতেন ও বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদে যেতেন। সাহিত্য পরিষদে একবার রবীন্দ্রনাথকে সম্বর্ধনা জানানো হয়। সেই সময়ে রজনীকান্তও কলকাতায়। রবীন্দ্রনাথ এলেন, সে কি উল্লাস, সে কি উত্তেজনা রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে! রামেন্দ্রসুন্দর রবীন্দ্রনাথকে লিখিত অভ্যর্থনা জানালেন, আর রজনীকান্তকে সাদরে অর্ভ্যথনা সঙ্গীত গাইতে অনুরোধ করলেন। রজনীকান্ত গাইলেন, ‘কোন্ সুন্দর নব প্রভাতে,/ তুমি উদিলে ধরা জাগিল রে’। এরপর রবীন্দ্রনাথ নিজে রজনীকান্তকে আরও একটি গান গাইবার অনুরোধ করলেন, রজনীকান্ত গাইলেন, কালীপ্রসন্ন কাব্যবিশারদের স্বদেশী সঙ্গীত ‘শাসনসংযত কন্ঠে জননী গাহিতে পারিনা গান’। তখনকার দিনে তো মাইক ছিল না, তবুও অতবড় হলঘর গাম্ভীর্যপূর্ণ গানের সুরে গমগম করে ফিরতে লাগলো। জনগণ স্তব্ধ, মুগ্ধ। কোথাও আর কোনও শব্দ নেই। গান শেষ হলে রবীন্দ্রনাথ বললেন, আর একটা গান হোক। রজনীকান্ত গাইলেন, ‘সেথা আমি কি গাহিব গান’।”

রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে রজনীকান্তের বার পাঁচেক সাক্ষাৎ হয়েছিল। ১৪ পৌষ ১৩০৮ অ্যালবার্ট হলে সাহিত্য পরিষদ আয়োজিত কংগ্রেস প্রতিনিধিদের সংবর্ধনা সভায় তাঁদের প্রথম দেখা। ১৩১০ বঙ্গাব্দে শান্তিনিকেতনের পৌষ উৎসবে তাঁদের দ্বিতীয়বার দেখা হয়েছিল। ২১ অগ্রহায়ণ ১৩১৫ বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের নতুন গৃহপ্রবেশ অনুষ্ঠানে তৃতীয়বার তাঁদের দেখা হয়। তার পরের দিনই, অর্থাৎ ২২ অগ্রহায়ণ ১৩১৫ তাঁদের চতুর্থবার দেখা হয়। ২৮ জ্যৈষ্ঠ ১৩১৭ কলকাতা মেডিকাল কলেজে তাঁদের শেষ দেখা। তবে প্রত্যক্ষ সাক্ষাতের বাইরেও তাঁদের দেখা হয়েছে বহুবার। পরোক্ষ সাক্ষাতের সে ইঙ্গিত পরিলক্ষিত হয় তাঁদের সৃষ্টির ছত্রে ছত্রে। রবীন্দ্রনাথ ও রজনীকান্ত — এই দুই মহামানবের একে-অপরের আঙিনায় আনাগোনার নিদর্শন রয়েছে তাঁদের গানের কথায়, তাঁদের গানের সুরে।

সৌম্য দে-র পেশা শিক্ষকতা। নেশা বাংলা গান ও সাহিত্য সম্পর্কিত গবেষণা। আকাশবাণী কলকাতা-য় উপস্থাপক রূপে কর্মরত। বর্তমানে ‘দি অর্ঘ্য সেন আর্কাইভ’ গড়ে তোলার কাজেও নিযুক্ত। প্রথাগত পড়াশোনা ইংরাজি সাহিত্য নিয়ে। মৌলানা আজাদ কলেজ থেকে স্নাতক ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর। প্রকাশিত বই ‘English Capsule – Learning from Mistakes’।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content