সোমবার ৯ মার্চ, ২০২৬


সারদা দেবী।

সরলাবালা যখন বোসপাড়া লেনে সিস্টার নিবেদিতার স্কুলে পড়তেন, তখন একদিন স্কুল ছুটির পর সুধীরাদিদি তাঁদের চার-পাঁচজনকে নিয়ে শ্রীমার বাড়িতে গেলেন। প্রসঙ্গত, সুধীরাদি নিবেদিতার সহকারিণী ছিলেন। তাঁর পাশে সবসময় থাকতেন। সুধীরাদি সরলাদের নিয়ে এলেন যখন, তখন সারদা মা ঠাকুরঘরে আসনে বসেছিলেন। আর কুসুমদি তাঁকে একটি বই পড়ে শোনাচ্ছেন। মেয়েরা তাঁকে প্রণাম করলে শ্রীমা তাদের বসতে বললেন। সুধীরাদিদিকে বললেন, ‘ভাল আছ মা, স্কুলের এই ছুটি হল? এই মেয়েরা তোমার কাছে পড়ে?’ সুধীরাদি বললেন, ‘হ্যাঁ মা, এরা আমার কাছে পড়ে’। সারদা মা বলেন যে, মেয়েগুলি বেশ। তারপর সরলাকে দেখে বলেন, ‘এটি কাদের মেয়ে? বেশ মেয়েটি’। সুধীরাদি জানালেন যে, এ বামুনের মেয়ে, কাছেই বাড়ি। এই কথাবার্তার পর শ্রীমা কুসুমকে আবার পড়তে বললেন, সকলে শুনবে বলে। পড়া শুরু হল।
সরলাদেবী জানান যে, বইখানি সম্ভবত ‘কৃষ্ণচরিত’ ছিল। কৃষ্ণের বাল্যকালে দই, দুধ কেড়ে খাওয়ার বর্ণনা শুনে শ্রীমা ও বাকি সকলেই হাসতে লাগল আর বলতে লাগল, ‘কি দুষ্ট ছেলে’। এর খানিক পরে সরলাদের নিতে গাড়ি এসে গেল। শ্রীমা বললেন, ‘ তোমরা এখনই যাবে? একটু বসলে হত না?’ সুধীরাদির উত্তর শুনে তিনি বললেন, ‘তবে সকলে এস মা’। প্রসাদ নিয়ে সারদা মাকে প্রণাম করে সকলে বিদায় নিল। শ্রীমা সকলকে আবার আসতে বললেন। এরপর আর একদিন বিকেলে সুধীরাদি মেয়েদের সকলকে নিয়ে শ্রীমার বাড়ি গেলেন। মা সারদা তক্তপোশের উপর একটি মাদুর পেতে শুয়েছিলেন। তাদের দেখে বললেন, ‘এস মা’। সকলে তাঁকে প্রণাম করে বসলেন।
আরও পড়ুন:

আলোকের ঝর্ণাধারায়, পর্ব-৯৪: ‘মহেশ্বরের অনন্ত ধৈর্য’

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১১০: বনবাসী রামের নিরাসক্ত ভাবমূর্তির অন্তরালে, ভাবি রামরাজ্যের স্রষ্টা দক্ষ প্রশাসক রাম

শ্রীমা জানতে চাইলেন যে, স্কুলের ছুটি হল? কটা বেজেছে?। সুধীরাদি বললেন, ‘আজ আমাদের সকাল সকাল ছুটি হয়ে গেছে। এখন সাড়ে তিনটে বেজেছে। তাই এদের নিয়ে এলুম’। শুনে শ্রীমা বলেন, ‘তা বেশ করেছ’। কথাপ্রসঙ্গে একটি মেয়ের কথা উঠল। সারদা মা বললেন, ‘দেখ না, মা, শ্বশুরঘর করবে না, আমার কাছে এসেছে। জামাই কালো বলে তার মনে ধরেনি। কালো বলে কি তুই তাকে নিবি নে? সে তোর স্বামী। এ সব কিরকম মেয়ে মা, তা জানি নে। আবার শুনি তার স্বভাব খারাপ, সেইজন্যেও যেতে চায় না। তাহলেই বা কি, তোকে তো অযত্ন করেনি। স্বামী তো বটে। কি জানি মা, এসব মেয়ে কিরকম! লোকে শুনলে ভাববে কি? যা মন চায় করুকগে’। একথা বলে তিনি কাপড় কাচতে গেলেন আর সকলে তাঁকে প্রণাম করে বলল, ‘যাই মা’। সারদা মা বললেন, ‘যাই বলতে নেই, আসি বলতে হয়। সময় পেলেই আবার এস মা’।
আরও পড়ুন:

সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-৯৭: পাতি সরালি

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১১২: অপারেশন অপহরণ

শ্রীমার নিজের পড়াশোনায় আগ্রহ ছিল, তাই নিবেদিতার স্কুলে পাঠরত এই মেয়েদের তিনি খুব স্নেহ করতেন। এইরকম এক শনিবারে সুধীরাদি সরলাদের কজনকে নিয়ে দক্ষিণেশ্বর থেকে ফেরার পথে শ্রীমার বাড়িতে এলেন। শ্রীমা তখন তক্তপোশের উপর শুয়ে আছেন। তাদের দেখে যোগেনমা বলেন যে, এতো রাতে তারা কোথা থেকে আসছে? শ্রীমা জানতে চান যে, কারা এসেছে। যোগেনমা বলেন যে, সুধীরা এসেছে। একথা শুনে শ্রীমা উঠে বসলেন। সকলে তাঁকে প্রণাম করে বসল। শ্রীমা জানতে চাইলেন, ‘এত রাতে কোথা থেকে এলে?’ সুধীরাদি বললেন, ‘আজ দক্ষিণেশ্বর গিয়েছিলুম, সেখানে আরতি দেখে ফিরতে রাত হয়ে গেল। মনে ভাবলুম, এত কাছে এসে চলে যাব? তাই এখানে একবার এলুম’। শুনে শ্রীমা ‘তা বেশ করেছ’ বলে আবার শুয়ে পড়লেন। সুধীরাদি তাঁর পায়ে হাত বুলিয়ে দিতে লাগলেন আর সরলাদেবী কাছে দাঁড়িয়ে বাতাস করতে লাগলেন। সুধীরাদি শ্রীমার কাছে দক্ষিণেশ্বরের গল্প করতে লাগলেন। শ্রীমা জানতে চাইলেন, ‘তোমরা নবত দেখেছ তো? আমি ওই নবতের নিচের ঘরে থাকতুম। সিঁড়ির নিচে রান্না করতুম’।
আরও পড়ুন:

অসমের আলো অন্ধকার, পর্ব-৪৯: পান-সুপারি ছাড়া অসম্পূর্ণ অসমীয়া খাবারের থালি

পর্ব-১৪: আকাশ এখনও মেঘলা

সুধীরাদি বলেন যে, তারা দেখে এসেছে। এখনো সামনের দিকে দরমা দিয়ে ঘেরা সিঁড়ির নিচে উনুন রয়েছে। আর মেছুনীদের ঝুড়িগুলো শ্রীমার সেই বারান্দায় বসানো রয়েছে। সুধীরাদি বলেন যে, তিনি মেয়েদের মা সারদার কথা বলছিলেন। কিভাবে শ্রীমা ওই ঘরে ছিলেন। তারপর জানতে চান, ‘আচ্ছা মা, আপনি কি করে ওই ঘরে থাকতেন? কোন কষ্ট হত না?’ শ্রীমা বলেন যে, শৌচ আর নাওয়ার জন্যই যা কষ্ট হত। আর ওই মেছুনীরা ছিল তাঁর সঙ্গী। তিনি বলেন, ‘তারা গঙ্গা নাইতে এসে ওই বারান্দায় চুবড়ি রেখে সব নাইতে নাবত। আমার সঙ্গে কত গল্প করত। আবার যাবার সময় চুবড়িগুলো নিয়ে যেত। রাতে জেলেরা সব মাছ ধরত আর গান গাইত, শুনতুম। ঠাকুরের কাছে কত ভক্ত আসত, কীর্তন হত, তাই শুনতুম আর ভাবতুম, আমি যদি ওই ভক্তদের একজন হতুম তো বেশ ঠাকুরের কাছে থাকতুম, কত কথা শুনতুম। ওই যোগেন, গোলাপ সব জানে। ওরা আমার কাছে যেত আর কখনো থাকত। যোগেনমার দিকে তাকিয়ে বললেন, কি আনন্দই তখন ছিল, যোগেন’। একথা বলে সারদা মা আনমনা হয়ে গেলেন।
আরও পড়ুন:

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৬৯: সে এক স্বপ্নের ‘চাওয়া পাওয়া’

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৭৭: পৃথিবীতে এমন কেউ নেই, যাঁর জীবনের আকাশে কখনও শত্রুতার মেঘ জমেনি

যোগেনমা বললেন, ‘সে যে কি আনন্দ, তা কি মুখে বলা যায় গো? মনে করলে আজও প্রাণ কিরকম করে ওঠে’। এবার শ্রীমা রাত হয়ে যাচ্ছে দেখে মেয়েদের দিকে চেয়ে বলেন, ‘রাত হল, বাড়িতে বকুনি খাবে না?’ সুধীরাদি বলেন যে, আজ নাহ্য় একটু বকুনি খাবে। ওদের বাড়ির লোকেরা এখানকার উপর ভারি চটা। যদি শোনে যে এখানে এসেছে, তাহলে মাথা আর রাখবে না’। শুনে শ্রীমা বলেন, ‘তাই তো, মা, বাছারা কত বকুনি খাবে। কতরকমের লোক আছে তার কি ঠিক আছে? যারা সমাজ নিয়ে চলে, তাদের কেবলই ভয়। তোমরা এস, মা। আহা, কত বকবে’। সুধীরাদি বলেন যে, এইটুকু যদি ওরা সহ্য করতে না পারে, তাহলে ওরা করবে কি? শ্রীমার আশীর্বাদে ওদের ভয় থাকবে না। তখন সারদা মা বললেন, ‘ঠাকুরের কৃপায় সব সোজা হয়ে যাবে। যদি বকে কোন কথাটি বলো না। সংসারে কতরকম লোক থাকে। সব সহ্য করে থাকতে হয়। ঠাকুর বলতেন যে, শ, ষ, স, তিনটে স। ‘যে সয় সেই রয়’।
* আলোকের ঝর্ণাধারায় (sarada-devi): ড. মৌসুমী চট্টোপাধ্যায় (Dr. Mousumi Chattopadhyay), অধ্যাপিকা, সংস্কৃত বিভাগ, বেথুন কলেজ।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content