
দেবী দুর্গা। ছবি: সংগৃহীত।
আমাদের অনেক কিছুতেই নানা সমস্যা। অতীত নিয়ে পড়ে থাকা সমস্যায় ‘নস্টালজিয়া সব নষ্ট করল’ এই আক্ষেপ, বর্তমানে থাকলে আত্মবিস্মৃতির সমস্যা, সাতে-পাঁচে থাকলে নাক গলানোর সমস্যা, না থাকলে অসামাজিকতার দায়, স্রোতে গা ভাসালেও গড্ডালিকার অপবাদ। মোট কথা, সমস্যা। নানা সমস্যার মাঝে নিত্যদিনের বিষয়-আশয় যায় আসে, বারো মাস, তেরো পার্বণ, চতুর্দশ পুরুষ আসেন যান। জীবন এমনটাই। যেমন এবছরেও মহালয়া এসে গেছে, শরত্কাল এসে গেছে, কিন্তু বর্ষা যায়নি, বৃষ্টি এলো বলে, ভ্যাপসা গরম যায়নি, কিন্তু দেখতে দেখতে পুজো চলে যাবে। তবুও পুজো আসে, পুজো আসছে, পুজো এসে যাবে, পুজো এসে গিয়েছে, পুজো চলেও যাবে।
যে সমস্যার কথাটা উঠল শুরুতে সেটা কিন্তু মিটল কই? কিছু সমস্যা শাশ্বত, চিরকাল ধরে রাখতে মন চায়, কিছু সমস্যা মিটেছে মনে হয়, কিন্তু থাকে। কিছু সমস্যা আসলে নেই, তবু মনে হয় ছায়ার মতো হাঁটছে সঙ্গে সঙ্গে। এই যেমন, ডিম না মুরগি কোনটা ঠিক আগে এজাতীয় বাইনারি-ঘটিত সমস্যা থাকেই। যেমন, বর্ষা না গ্রীষ্ম, জীবন না মৃত্যু, জানুয়ারি না বৈশাখ, ফুল না পাথরের মধ্যে কোনটা সত্যি, বেঁচে মরে থাকা নাকি মরে বেঁচে যাওয়ার মধ্যে কোনটা যথার্থ, অস্তি না নাস্তি, শূন্য নাকি পূর্ণ… এসব তো আছেই তাই না?
আরও পড়ুন:

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১১৭: আবাবিল

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৩৩: এ কে? এ কে গো?

উপন্যাস: আকাশ এখনও মেঘলা, পর্ব-৩৩: আকাশ এখনও মেঘলা

ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৭৫: পূর্বোত্তরে আন্তরাজ্য সীমা বিবাদ
এ সব ভাবতে ভাবতেই মহালয়া আসে, মহালয়ার দিনেই পিতৃপক্ষ আর দেবীপক্ষের সংঘাত, নাকি মিলন কিছু একটা নিয়ে বছর বছর সংশয়াকুল চর্চা চলে। কেউ ভুল ধরায়, কেউ ভুলটাকেই ভুলে থাকে। কেউ স্মৃতিকাতর, কেউ স্পর্শকাতর, কেউ তর্পণে, কেউ রেডিয়োতে। আর একটু পরেই বুঝি আকাশে দেখা দেবে সেই অপার্থিব আলো, তারপর আশ্বিনের শারদপ্রাতে প্রজন্মবাহিত একরাশ মুগ্ধতা কোনো নিকোনো উঠোন পার হয়ে, উত্তরের শহরের দক্ষিণের বারান্দা পার হয়ে হয়ে, দক্ষিণের শহরের উত্তরের ব্যালকনি ছুঁয়ে ছুঁয়ে উত্তীর্ণ হবে কোনও স্কাইস্ক্রাপারে, অবতীর্ণ হবে নবতর কোনও শারদীয় শিউলি-ভোরে।
আরও পড়ুন:

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১৩১: মহর্ষি চেয়েছিলেন শান্তিনিকেতনে মৃত্যু

সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-১০ : নায়ক ও মহাপুরুষ
তবু সমস্যা কাটে না যে। আজ কি আমার সকল দুঃখের প্রদীপ জ্বেলে বিধুর ব্যথায় সিক্ত হৃদয়ের সকৃতজ্ঞ সকাতর নিবেদনের শোকস্নিগ্ধ নিরানন্দ দিন? আমার সকল কাঁটা কি আজ দুঃখদিনের রক্তকমল হয়ে তোমাদের নীরব পদপাতের অস্ফুট মন্দ্ররবে ফুটবে বৈতরণীর পারে? সব কিছু যে জলে গেল বলে তাবত্ ক্লান্ত হাহাকার সেই জলেই সমাগত পিতৃগণের তর্পণ সেরে ঐশী ভোরে সকলে যখন ফিরবে, তখন হয়তো অসুর বধ হয়ে গেছে, বিজয়শঙ্খ বেজে উঠেছে, অশুভের নিশ্চিত পরাজয়টুকুর অনুভব বুকে নিয়ে কাশের গুচ্ছ দুলছে, শিউলি ঝরে পড়ছে টুপটাপ।
আরও পড়ুন:

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৯০: শত্রুকে হারাতে সব সময় অস্ত্র নয়, ছলনারও আশ্রয় নিতে হয়

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৩০: অলৌকিকতার আবরণে লৌকিক-অনুভবের পরশ
আজ কেউ যদি ভুল করেও মহালয়ার শুভেচ্ছা জানিয়ে ফেলে তাহলে কি রৌরব নরক-ই তার একমাত্র গতি? কেউ বলবে, আরে বাবা! এতে মহাভারত অশুদ্ধ হয় না, জগত্ আনন্দময়, এই শোকের পথ আনন্দেই মিশেছে। দেখছো না চারপাশে যেন আনন্দযজ্ঞের সমারোহ। কেউ বলবে, না হে, একটা রেডিয়ো প্রোগ্রাম এই দিনে চালিয়ে দিলেই স্বর্গে সুরাসুরের যুদ্ধ এগিয়ে পিছিয়ে দেওয়া যায় না। অসুর তার সময়েই মরবে। দেবীও জাগ্রত হবেন মহানিদ্রা থেকে যথাকালে। রেডিওর সাধ্য কী এমন শোকের দিনে আলোর বেণু বাজিয়ে দেওয়ার। কেউ আবার বলবে, রেডিও কোথায় ভাই? কোথায় দল বেঁধে চোখ কচলে মহালয়া শোনার আগ্রহ, আকাঙ্ক্ষা, বাধ্যতা? কোথায় এই একদিন উষালগ্নের মুখোমুখি বসে বিরাটের অনুধ্যান, তুমি তো ঘুমের ঘোরেই কাটিয়ে দাও! ফ্লপি, সিডি, পেনড্রাইভ, ক্লাউডের ক্রমপরিবর্তমান জগতের সুর কিংবা অ-সুরটাকে ধরতে পেরেছো? ঢাউস রেডিও পার হয়ে বাম দিকে বুকপকেটে এফ এমের পথ ধরে ধরে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ হাঁটেন, উত্তমকুমার হেঁটে যান, আকাশবাণী বেজে ওঠে, দূরদর্শন সক্রিয় হয়। নানা বছরের নানা রেকর্ডের তারতম্য, দুষ্টু অসুর, মিষ্টি অসুর, বোকা অসুর, পাকা অসুর, হিরো অসুর, ভিলেন অসুরের দল নানা দৃশ্যশ্রব্য-মাধ্যমে মহালয়ার মহাদুঃখের কিংবা মহানন্দময় ভোরে একে একে পৌঁছন, পিতৃপুরুষদের ভিড়ে মিশে। আজ আরেকটা আরশিনগরে যাওয়ার দিন, অথবা ফেরার দিন দিকশূন্যপুর থেকে। আজ মহালয়া, আজ থেকেই দুর্গাপুজোর কাউন্টডাউন, অতীতের অনুধ্যানের পথ ধরেই সংস্কৃতি, শুদ্ধ চেতনা, শুভবোধের শিকড়ে ফেরার মহোৎসব।
আরও পড়ুন:

রজনীর রবি

আলোকের ঝর্ণাধারায়, পর্ব-১১০: মা সারদার মানবীলীলার অবসান
আমাদের সমস্যাগুলোকে ঠেলেঠুলে দুর্গতিহারিণী শরণ্যা ত্র্যম্বকজায়া গৌরীর আগমনী সুর, তাঁর নুপূরনিক্বণ বাজে তাঁর পিত্রালয়ে। আনন্দময়ী চিন্ময়ী মহামায়ার মৃন্ময়ীরূপে আবাহন এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা। মহালয়ার “আরব্ধ আগমনী”র ভোরে প্রজন্মবাহিত সংশয় আর শারদ অশ্রুজলটুকু পাশে রেখেই কুমোরটুলি থেকে সার সার লরিগুলোতে একে একে উঠে আসেন সবাহন দুর্গা, মহিষাসুর, লক্ষ্মী, সরস্বতী, গণেশ, কার্ত্তিক। রেডি, স্টেডি, অন ইওর মার্ক! গো… গাড়ি ছেড়ে দেয়।
* ড. অভিষেক ঘোষ (Abhishek Ghosh) সহকারী অধ্যাপক, বাগনান কলেজ। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগ থেকে স্নাতকস্তরে স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত। স্নাতকোত্তরের পর ইউজিসি নেট জুনিয়র এবং সিনিয়র রিসার্চ ফেলোশিপ পেয়ে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগে সাড়ে তিন বছর পূর্ণসময়ের গবেষক হিসাবে যুক্ত ছিলেন। সাম্বপুরাণের সূর্য-সৌরধর্ম নিয়ে গবেষণা করে পিএইচ. ডি ডিগ্রি লাভ করেন। আগ্রহের বিষয় ভারতবিদ্যা, পুরাণসাহিত্য, সৌরধর্ম, অভিলেখ, লিপিবিদ্যা, প্রাচ্যদর্শন, সাহিত্যতত্ত্ব, চিত্রকলা, বাংলার ধ্রুপদী ও আধুনিক সাহিত্যসম্ভার। মৌলিক রসসিক্ত লেখালেখি মূলত: ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে। গবেষণামূলক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়ে চলেছে বিভিন্ন জার্নাল ও সম্পাদিত গ্রন্থে। সাম্প্রতিক অতীতে ডিজিটাল আর্ট প্রদর্শিত হয়েছে আর্ট গ্যালারিতে, বিদেশেও নির্বাচিত হয়েছেন অনলাইন চিত্রপ্রদর্শনীতে। ফেসবুক পেজ, ইন্সটাগ্রামের মাধ্যমে নিয়মিত দর্শকের কাছে পৌঁছে দেন নিজের চিত্রকলা। এখানে একসঙ্গে হাতে তুলে নিয়েছেন কলম ও তুলি। লিখছেন রম্যরচনা, অলংকরণ করছেন একইসঙ্গে।

















