
ত্রিপুরা সুন্দরী মন্দির। ছবি: সংগৃহীত।
উদয়পুর ত্রিপুরার প্রাচীন রাজধানী। প্রায় বারশো বছর এখানে ত্রিপুরার রাজধানী ছিল। এত দীর্ঘকাল ব্যাপী কোনও এলাকা রাজধানীর গৌরব বহন করছে এমনটা গোটা ভারতেই এক বিরল দৃষ্টান্ত। উল্লেখ করা যায় যে, মাণিক্য রাজবংশ প্রতিষ্ঠার আগে থেকেই সেখানে ছিল ত্রিপুরার রাজধানী। অবশ্য উদয়পুর নয়, তখন এই জনপদের নাম ছিল রাঙ্গামাটি। ষষ্ঠ শতাব্দীতে রাজা যুঝার ফা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী লিকা রাজাকে পরাস্ত করে এখানে তাঁর রাজধানী প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ত্রিপুরায় মাণিক্য রাজবংশের প্রতিষ্ঠা হয় পঞ্চদশ শতকে। ষোড়শ শতকে রাজা উদয় মাণিক্য নিজের নাম অনুসারে রাজধানীর নাম রাখেন উদয়পুর।
ত্রিপুরা সুন্দরী বিগ্রহ ঘিরে আছে অন্য জনশ্রুতিও। চট্টগ্রামে নাকি এক আশ্চর্য শিবলিঙ্গের দেখা পাওয়া গিয়েছিল। ত্রিপুরার রাজা তা নিয়ে আসতে লোকলস্কর পাঠান চট্টগ্রামে। কিন্তু বহু চেষ্টা করেও সেই শিবলিঙ্গ মাটি থেকে উত্তোলন সম্ভব হয়নি। রাজা তখন স্বপ্নাদিষ্ট হলেন। শিবলিঙ্গ নেয়া যাবে না। তবে পাশেই রয়েছেন দেবী। দেবীকে নেয়া যাবে। তবে শর্ত হলো এক রাতের মধ্যে যতটা পথ নেয়া যায় দেবী ততটা পথই যাবেন। দেবীর বিগ্রহ ত্রিপুরায় নিয়ে আসার সময় ভোরের আলো ফুটে উঠে রাজধানী উদয়পুর সংলগ্ন কুর্মাকৃতির এক টিলা ভূমির কাছে। তারপর রাজা সেখানেই মন্দির গড়ে দেবীকে প্রতিষ্ঠা করেন।

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১৩৫: সুস্থ থাকলে কেউ কি কবিতা লেখে?

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৩৭: জীবনখাতার প্রতি পাতায়

ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৭৯: ‘বেতারে দু-খানা গান গাইলাম, পারিশ্রমিক পেলাম দশ টাকা’

আকাশ এখনও মেঘলা/৪০
বাস্তু পূজা সঙ্কল্প বিষ্ণুপ্রীতে কৈল।
ভগবতী রাজাকে স্বপ্ন দেখায় রাত্রিতে,
এই মঠে রাজা আমা স্হাপ মহাসত্ত্বে।
চাটিগ্রামে চট্টেশ্বরী তাহার নিকট,
প্রস্তরেতে আমি আছি আমার প্রকট।
তথা হতে আনি আমা এই মঠে পূজ,
পাইবা বহুল বর যেই মতে ভজ।…”
মন্দিরে প্রথমে শুধু পশ্চিমমুখী দরজা ছিল। পরবর্তী সময়ে উত্তর দিকেও একটি দরজা নির্মিত হয়। সামনে রয়েছে একটি নাট মন্দির। ১৫০১ খ্রিষ্টাব্দে ধন্য মানিক্য কর্তৃক মন্দিরটি নির্মিত হওয়ার পর পরবর্তী রাজাদের আমলে বেশ কয়েকবার মন্দিরটির সংস্কার কাজ হয়েছে। মন্দির গাত্রে যেসব শিলালিপি পাওয়া গেছে তাতে অন্যূন পাঁচ বার মন্দিরটি সংস্কারের কথা জানা যায়। বর্হিশত্রু কর্তৃক ত্রিপুরা আক্রান্ত হওয়ার সময় এই মন্দিরও আক্রমণের শিকার হয়েছে। ষোড়শ শতকে অমর মানিক্যের সময়ে যখন আরাকানের মগ বাহিনী ত্রিপুরা আক্রমণ করে তখন মন্দিরের চূড়াটি বিনষ্ট করে দেয় তারা। কল্যাণ মাণিক্য (১৬২৬-৬০ খ্রিস্টাব্দ) এই চূড়াটির সংস্কার কাজ করেছিলেন। এখানে উল্লেখ করা যায় যে, অতীতে মন্দিরে ধনরত্নের লোভেও বর্হিশত্রুর আক্রমণ নেমে আসতো। এটা শুধু ত্রিপুরা নয়, দেশের বিভিন্ন জায়গাতেই এ রকম ঘটনা ঘটত। মন্দির গুলোর গঠন প্রকৃতিও অনেকটা দুর্গের মতো ছিল। কোথাও আবার দুর্গের মধ্যেই সুরক্ষিত অবস্থায় মন্দির থাকতো। মন্দিরের ভেতরে সযত্নে রাখা হতো ধনরত্ন।

সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১২২: সুন্দরবনের পাখি: ডোরা-লেজ জৌরালি

সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-১২ : স্বপ্নের নায়ক, নায়কের স্বপ্ন
কালিকা দেবীয়ে স্বপ্ন দেখায় বিশেষ।
আমা সেবা কষ্ট হয় জলের কারণে,
জলাশয় দেও রাজা আমা সন্নিধানে।
রাত্রিকালে মহারাজা দেখয়ে স্বপন,
প্রভাতে কহিল রাজা স্বপ্নের কথন।…”
কল্যাণ সাগরের বিরল দর্শন কচ্ছপ ও গজার মাছ পুণ্যার্থীদের এক বড় আকর্ষণ। এইসব কচ্ছপ ও মাছ মানুষের কাছে নির্ভয়ে চলে আসে। দীঘির জলে পুণ্যার্থীরা তাদের জন্য খাবার ছিটিয়ে দেন।
ত্রিপুরা সুন্দরী মন্দিরে মায়ের বড় বিগ্ৰহের পাশে রয়েছে ছোট অপর একটি বিগ্ৰহ। ছোট মা হিসেবে পরিচিত এই বিগ্ৰহ।লোকশ্রুতি, মন্দিরের পাশে সুদূর অতীতে একটি জলাশয়ে পাওয়া গেছে এই বিগ্ৰহটি। কেউ কেউ বলেছেন একদা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী লিকা সম্প্রদায়ের আরাধ্য দেবী ছিলেন এই ছোট মা।ষষ্ঠ শতাব্দীতে ত্রিপুরার ফা রাজার কাছে পরাস্ত হয়ে পালিয়ে যাবার সময় লিকারা ছোট মাকে ফেলে যায়।

উপন্যাস: দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-৪: কথা বলা অতীত

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৩৪: রামের অমল মহিমা, অরণ্যবাসের সাধুসঙ্গ
ত্রিপুরা সুন্দরী মন্দির যেন এক সমন্বয়েরও প্রতীক। রাজা চেয়েছিলেন বিষ্ণু মন্দির প্রতিষ্ঠা করতে। কিন্তু স্বপ্নাদিষ্ট হয়ে প্রতিষ্ঠা করলেন ভগবতীকে। মূল বিগ্ৰহের পাশে মন্দিরে আছেন ছোট মা, যিনি নাকি একদা লিকাদের আরাধ্য দেবী ছিলেন। ত্রিপুরা সুন্দরী মন্দিরে দেবীর বিগ্ৰহের সামনে রয়েছে শালগ্ৰাম শিলাও। মন্দিরের পূজা সহ নানা কাজে রয়েছেন নানা সম্প্রদায়ের মানুষ। দেওয়ালী মেলা সহ অন্য সময়েও নানা সম্প্রদায়ের মানুষ মন্দির প্রাঙ্গণে আসেন। কেউ কেউ তাদের জমির উৎপাদিত ফসল প্রথম উৎসর্গ করেন দেবীর উদ্দেশ্যে। সমসের গাজী ত্রিপুরার ইতিহাসের এক বর্ণাঢ্য চরিত্র।এক সাধারণ প্রজা থেকে তিনি ত্রিপুরার সর্বময় কর্তা হয়ে উঠেছিলেন। উদয়পুর অধিকারের যুদ্ধে সমসের মায়ের পূজা করেছিলেন বলে উল্লেখ রয়েছে ‘গাজীনামা’ নামে তাঁর জীবন কাহিনি নির্ভর এক কাব্যগাঁথাতে।
অতীত ঐতিহ্যের আলোয় উদ্ভাসিত একান্ন পীঠের এক পীঠ এই ত্রিপুরা সুন্দরী মন্দির। প্রতিদিনই এই মন্দিরে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক পুণ্যার্থী মানুষ পুজো দেন। প্রসাদ হিসেবে মায়ের বাড়ির পেঁড়ার সুনাম আজ ছড়িয়ে পড়েছে দেশের নানা অঞ্চলে। মন্দিরের পাশে রয়েছে পেঁড়ার অনেক দোকান। বহু মানুষ এর উপর জীবিকা নির্বাহ করে। ত্রিপুরার বিভিন্ন অঞ্চলতো বটেই, দেশের নানা অঞ্চলেও আজ মাতাবাড়ির পেঁড়া নিয়ে যাওয়া হয়। অদূর ভবিষ্যতে দেশের বাইরেও এই পেঁড়া যাবে বলে আশা করা হচ্ছে। শ্যামাপূজা উপলক্ষ্যে এখন মাতাবাড়ির পেঁড়া উৎপাদকদের মধ্যেও চরম ব্যস্ততা চলছে। মন্দিরে বলির জন্য ত্রিপুরার ভারতভুক্তির চুক্তি অনুযায়ী পাঁঠা মহিষ সরবরাহ করা হয়। অমাবস্যায় মহিষ বলি হয়। দেশের কোনও মন্দিরে বলির জন্য সরকার থেকে পাঁঠা-মহিষ সরবরাহও এক বিরল দৃষ্টান্ত। দেবীর রয়েছে বহু মূল্যের স্বর্ণালঙ্কার। সেসব ট্রেজারিতে রাখা হয়। বিশেষ পূজায় দেবীকে অলঙ্কারে সাজানো হয়।

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৬৫: ইন্দ্রধনু আর ‘ইন্দ্রাণী’

রহস্য রোমাঞ্চের আলাস্কা, পর্ব-৬৪: অ্যাঙ্করেজের সঙ্গে সিউয়ার্ডকে জুড়েছে পৃথিবীখ্যাত সিউয়ার্ড হাইওয়ে
* গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি (Tagore Stories – Rabindranath Tagore) : পার্থজিৎ গঙ্গোপাধ্যায় (Parthajit Gangopadhyay) অবনীন্দ্রনাথের শিশুসাহিত্যে ডক্টরেট। বাংলা ছড়ার বিবর্তন নিয়ে গবেষণা, ডি-লিট অর্জন। শিশুসাহিত্য নিয়ে নিরবচ্ছিন্নভাবে গবেষণা করে চলেছেন। বাংলা সাহিত্যের বহু হারানো সম্পদ পুনরুদ্ধার করেছেন। ছোটদের জন্য পঞ্চাশটিরও বেশি বই লিখেছেন। সম্পাদিত বই একশোরও বেশি।


















