
ছবি: প্রতীকী।
অসম চায়ের দেশ হিসেবে সারা বিশ্বে পরিচিত হলেও এই রাজ্যের বন্ধুর মাটিতে আরও অনেক কিছুই উৎপাদন হয়। সবুজে ঘেরা অসমের মাটি যথেষ্ট উর্বর। এই মাটিতে বিভিন্ন ধরনের শাক সব্জি যেমন হয়, তেমনি এখানে এক এক সময় এক ধরনের ধানও চাষ করা হয়। আমরা ভারতীয় মূলত ভাত এবং রুটি এই দুই-ই খেয়ে থাকি। ভাত কিংবা রুটির সঙ্গেই রকমারি ব্যঞ্জন খাই।
আমাদের দেশে ধান চাষ প্রায় সব রাজ্যেই কম বেশি হয়। অসমের জলবায়ু উষ্ণ এবং একই সঙ্গে আর্দ্র। এখানকার পলিমাটি কৃষি কাজের জন্য যথেষ্ট ভালো, তাই ধান চাষের উপযোগী বলা যায়। এক সময় কৃষিকাজ এখানকার মানুষের প্রধান জীবিকা ছিল। আহোমদের এই ধান চাষে বিশেষ অবদান রয়েছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বিশেষ করে দক্ষিণ চিনের টাই সম্প্রদায়ের লোকেরা এক ধরনের ভেজা ধান চাষ করত।
আরও পড়ুন:

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১৩১: মহর্ষি চেয়েছিলেন শান্তিনিকেতনে মৃত্যু

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৩১: যে পালিয়ে বেড়ায়

উপন্যাস: আকাশ এখনও মেঘলা, পর্ব-৩৩: আকাশ এখনও মেঘলা

অসমের আলো অন্ধকার, পর্ব-৫৭: কাছাড়ে মণিপুরী রাজত্ব
ভেজা ধান চাষ প্রথমে শুরু হয় শুকনো মাটিতেই। শুকনো মাটিতে রোপণ করা হয়। তার পর প্লাবিত উপযুক্ত ধানক্ষেতে চারা আবার রোপণ হয়। তার পর ফসল কাটার আগে জমিটি জলাবদ্ধ করে দেওয়া হয়। ১২২৮ সালের দিকে ইউনান প্রদেশের মং মাওয়ের মাও-শান উপজাতির তসু বংশের একজন রাজপুত্র চুকাফা ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় পৌঁছন। আর তাঁর হাত ধরেই আহোম রাজ বংশ প্রতিষ্ঠিত হয়। সেই সঙ্গে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন রীতি নীতি, খাদ্যাভাস আমাদের দেশে আসে।
আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৩০: অলৌকিকতার আবরণে লৌকিক-অনুভবের পরশ

সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-১০ : নায়ক ও মহাপুরুষ
আহোমরা এই ভেজা ক্ষেত এবং জলাভূমি চাষ করতে যথেষ্ট সক্ষম ছিল। আহোম রাজারা চাষের প্রতি যথেষ্ট সচেতন থাকা সত্ত্বেও বিভিন্ন সময় তাদেরকেও বিভিন্ন প্রতিকূলতার সম্মুখীন হতে হয়েছে। কৃষিকাজ মূলত নির্ভর করে প্রকৃতির উপর। তাই প্রকৃতি বিরূপ হলে চাষেরও ক্ষতি হয়ই। তাছাড়া অনেক সময় কেউ কেউ হিংসা প্রবণত হয়ে বা বন্যপ্রাণীরাও ফসলর ক্ষতি করে থাকে। কিন্তু এত সব প্রতিবন্ধকতা পেড়িয়েও আহোম রাজারা রাজত্বে একেবারে শুরুর দিকেই যথেষ্ট উন্নত মানের চাষ করতে সক্ষম হয়েছিলেন। আহোম শাসনকালে জলসেচ এবং বন্যা নিয়ন্ত্রণ রাজকার্য সমূহের মধ্যে প্রাধান্য পেয়েছিল।
আরও পড়ুন:

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৯০: শত্রুকে হারাতে সব সময় অস্ত্র নয়, ছলনারও আশ্রয় নিতে হয়

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১১৭: আবাবিল
অসমে মূলত চার ধরনের ধান চাষ করা হতো। আহু বা আউশ ধান, বাও ধান, লহি এবং সালি। এছাড়াও আরও কয়েক ধরনের ধান চাষ করা হত, সেগুলি এখন খুব একটা চাষ হয় না। চাকুয়া, বোরা এবং জোহা এই বিশেষ ধরনের ধান অল্প-সল্প চাষ হয়ে থাকে। চাকুয়া এবং বোরা এই দুই ধরনের ধানকে ম্যাজিক ধানও বলা যেতে পারে। এই ধান থেকে চাল উৎপাদন করার তা আর আগুনে দিয়ে জলে সেদ্ধ করতে হয় না। এ এক ম্যাজিক চাল। জলে কিছুক্ষণ ভিজিয়ে রাখলেই ভাত হয়ে যায়। একে কোমল চাল বা বোকা চালও বলা হয়ে থাকে। অসমের মধ্যযুগীয় গ্রন্থেও ধানের গুরুত্বের কথা বলা হয়েছে। উল্লেখ্য, ষোড়শ শতাব্দীর গোড়ার দিকে রচিত অসমের সংস্কৃত গ্রন্থ যোগিনী তন্ত্রে অসমে উৎপাদিত প্রায় কুড়ি রকমের ধানের কথা উল্লেখ রয়েছে।
আরও পড়ুন:

রজনীর রবি

আলোকের ঝর্ণাধারায়, পর্ব-১১০: মা সারদার মানবীলীলার অবসান
এই ধান চাষ শুধুই মূল খাদ্য তালিকার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ছিল না। এর সঙ্গে জড়িয়ে ছিল সামাজিক অর্থনৈতিক এবং অনেক ধর্মীয় বিশ্বাস, লোকাচার, যা অনেক ক্ষেত্রে আজও বিভিন্ন সময় পালিত হয়। এই ধান চাষকে কেন্দ্র করেই অসমে পালিত হয় বিহু। পৌষ সংক্রান্তিতে পালন করা ভোগালি বিহুতে তৈরি বিভিন্ন রকমের পিঠা পুলি তৈরি হয় এই চাল থেকেই। কাটি বিহু বা কোঙ্গালি বিহু হয় কার্তিক সংক্রান্তিতে।
এই সময় মাঠের ধান ধীরে ধীরে পাকতে শুরু করে। এ দিকে কৃষকের শস্য ভাণ্ডার তখন শেষের দিকে। তাই এই বিহুতে তুলসী গাছের নিচে, শস্য ভাণ্ডারে, ধানক্ষেতে মাটির প্রদীপ জ্বালিয়ে প্রার্থনা করা হয়। চাষিরা রোয়া-খোয়া মন্ত্র উচ্চারণ করে অশুভ দৃষ্টি থেকে পাকা ধানকে রক্ষা করতে।— চলবে
এই সময় মাঠের ধান ধীরে ধীরে পাকতে শুরু করে। এ দিকে কৃষকের শস্য ভাণ্ডার তখন শেষের দিকে। তাই এই বিহুতে তুলসী গাছের নিচে, শস্য ভাণ্ডারে, ধানক্ষেতে মাটির প্রদীপ জ্বালিয়ে প্রার্থনা করা হয়। চাষিরা রোয়া-খোয়া মন্ত্র উচ্চারণ করে অশুভ দৃষ্টি থেকে পাকা ধানকে রক্ষা করতে।— চলবে
* ড. শ্রাবণী দেবরায় গঙ্গোপাধ্যায় লেখক ও গবেষক, অসম।


















