
(বাঁদিকে) আবর্জনার স্তূপে খাবারের সন্ধানে দাঁড়কাক যুগল। ছবি: লেখক। (ডানদিকে) সুন্দরবনের দাঁড়কাক। ছবি: সংগৃহীত।
“খুঁজে তারে মরো মিছে — পাড়াগাঁর পথে তারে পাবে নাকো আর;
রয়েছে অনেক কাক এ উঠানে — তবু সেই ক্লান্ত দাঁড়কাক
নাই আর; — অনেক বছর আগে আমে জামে হৃষ্ট এক ঝাঁক
দাঁড়কাক দেখা যেত দিন — রাত, — সে আমার ছেলেবেলাকার
কবেকার কথা সব; আসিবে না পৃথিবীতে সেদিন আবার:
রাত না ফুরাতে সে যে কদমের ডাল থেকে দিয়ে যেত ডাক, —
এখনো কাকের শব্দে অন্ধকার ভোরে আমি বিমনা, অবাক…”
কবি জীবনানন্দ দাশ সেই কবে লিখেছিলেন কবিতা “খুঁজে তারে মরো মিছে”। কবির ছেলেবেলায় আম জাম গাছে দেখা দাঁড়কাকদের ঝাঁক কোথায় হারিয়ে গিয়েছে। আর তাই কবি ছেলেবেলাকার সেই স্মৃতি রোমন্থন করতে করতে হতাশা ব্যক্ত করেছেন। এ হতাশা শুধু একা কবির নয়, পাখিপ্রেমী বাঙালির, সুন্দরবনবাসীর। সত্যিই আমাদের শৈশবে, মানে আজ থেকে পাঁচ-ছয় দশক আগে সুন্দরবন এলাকায় যে পরিমাণ দাঁড়কাক দেখেছি, এখন তার তুলনায় অনেক কম দেখতে পাই। যে পরিমাণ পাতিকাক এখন দেখতে পাই তার ছিটেফোঁটাও দাঁড়কাকদের ক্ষেত্রে দেখতে পাই না। পাতিকাকদের সংখ্যা না কমলেও কেন কমে গেল দাঁড়কাকের বংশ তা নিশ্চিতভাবেই গবেষণার বিষয়।
রয়েছে অনেক কাক এ উঠানে — তবু সেই ক্লান্ত দাঁড়কাক
নাই আর; — অনেক বছর আগে আমে জামে হৃষ্ট এক ঝাঁক
দাঁড়কাক দেখা যেত দিন — রাত, — সে আমার ছেলেবেলাকার
কবেকার কথা সব; আসিবে না পৃথিবীতে সেদিন আবার:
রাত না ফুরাতে সে যে কদমের ডাল থেকে দিয়ে যেত ডাক, —
এখনো কাকের শব্দে অন্ধকার ভোরে আমি বিমনা, অবাক…”
কবি জীবনানন্দ দাশ সেই কবে লিখেছিলেন কবিতা “খুঁজে তারে মরো মিছে”। কবির ছেলেবেলায় আম জাম গাছে দেখা দাঁড়কাকদের ঝাঁক কোথায় হারিয়ে গিয়েছে। আর তাই কবি ছেলেবেলাকার সেই স্মৃতি রোমন্থন করতে করতে হতাশা ব্যক্ত করেছেন। এ হতাশা শুধু একা কবির নয়, পাখিপ্রেমী বাঙালির, সুন্দরবনবাসীর। সত্যিই আমাদের শৈশবে, মানে আজ থেকে পাঁচ-ছয় দশক আগে সুন্দরবন এলাকায় যে পরিমাণ দাঁড়কাক দেখেছি, এখন তার তুলনায় অনেক কম দেখতে পাই। যে পরিমাণ পাতিকাক এখন দেখতে পাই তার ছিটেফোঁটাও দাঁড়কাকদের ক্ষেত্রে দেখতে পাই না। পাতিকাকদের সংখ্যা না কমলেও কেন কমে গেল দাঁড়কাকের বংশ তা নিশ্চিতভাবেই গবেষণার বিষয়।
দাঁড়কাকের সঙ্গে পাতিকাকের পার্থক্য রয়েছে বিস্তর। পাতিকাক যতটা মানুষের কাছাকাছি থাকতে পছন্দ করে দাঁড়কাকেরা ততটা নয়। এরা একটু জঙ্গল ঘেঁসা এলাকায় থাকতে পছন্দ করে। তাই হিন্দিতে এদের বলে জংলি কৌয়া আর ইংরেজিতে বলে জাঙ্গল ক্রো (Jungle Crow)। এদের বিজ্ঞানসম্মত নাম হল ‘Corvus culminatus’। যেহেতু সুন্দরবন মানেই হচ্ছে ঝোপঝাড় জঙ্গলে ঘেরা এলাকা, তাই সুন্দরবন অঞ্চলে দাঁড়কাকেদের উপস্থিতি আশৈশব দেখেছি। তবে জনবসতি যত বেড়েছে ততই জঙ্গল সাফ হয়েছে। আর তাই আমার শৈশবে বা কৈশোরে যে পরিমাণ দাঁড়কাক দেখতাম এখন আর তত দেখতে পাই না। দাঁড়কাককে আমাদের এলাকায় স্থানীয় মানুষ বলে ‘ড্যামরা কাক’।
আরও পড়ুন:

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১১১: পাতিকাক

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১২৭: রবীন্দ্রনাথের নামে ভিত্তিহীন অভিযোগ, ‘চোখের বালি’ নাকি চুরি করে লেখা

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১২৭: আঁধারে ছিল আগন্তুক?
সে যাই হোক, পাতিকাকদের মতো ধূসর রঙের কোনও আভা নেই ওদের শরীরে। পুরো শরীর কুচকুচে কালো। এতটাই কালো যে মনে হয় যেন কালোর ওপরে গাঢ় নীল রঙের একটা আভা রয়েছে। চোখের রং গাঢ় নীল, পা এবং চঞ্চুর রঙও অত্যন্ত কালো। এরা লম্বায় হয় প্রায় ১৮ ইঞ্চি। ওজন ৪৫০-৫০০ গ্রাম। যদিও হিমালয়ের ১৩ হাজার ফুট উঁচু এলাকা থেকে শুরু করে প্রায় পুরো ভারত এবং শ্রীলঙ্কা, মায়ানমার, থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া, বাংলাদেশ, ফিলিপিনস ইত্যাদি দেশে সব মিলিয়ে চারটি প্রজাতির দাঁড়কাক দেখা যায়, তবে উপকূলীয় তথা সুন্দরবন অঞ্চলে কেবল একটি প্রজাতি দেখা যায়।
আরও পড়ুন:

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৮৭: শুধু মুখে ধর্মের বুলি আওড়ালেই কেউ ধার্মিক হয়ে যায় না

ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৭০: ত্রিপুরায় বারবার দেশের ইংরেজ শাসন বিরোধী মানসিকতার প্রতিফলন ঘটেছে
এরা পাতিকাকদের মতো এত দুঃসাহসী পাখি নয়। তবে পাতিকাকরা যখন দল বেঁধে খাদ্য সংগ্রহ করে তখন তাদের মধ্যে দু’চারটে দাঁড়কাককেও কখনও কখনও উপস্থিত থাকতে দেখা যায়। আর দাঁড়কাকরা পাতিকাকদের মতো দল বেঁধে থাকে না। দুটি বা একটি বেশিরভাগ সময় দেখা যায়। কদাচিৎ দলবল দেখা যায়। শোনা যায় এরা নাকি জঙ্গলে কোথায় বাঘ আছে তা শিকারীকে বিশেষ শব্দ করে খবর দেয়। যদিও এই কথার সত্যতা আদৌ আছে কিনা জানা যায় না। তবে এদের ডাক পাতিকাকদের থেকে আরও কর্কশ। এরা ‘ক্যাঅ্যাঅ্যাও’ ‘ক্যাঅ্যাঅ্যাও’ করে ডাকে। স্ত্রী আর পুরুষ দাঁড়কাক বাইরে থেকে দেখে চেনা না গেলেও জোড়া দেখে বোঝা যায় এদের একটি পুরুষ ও একটি স্ত্রী। ওদের মধ্যে ভাব ভালোবাসা খুব বেশি। শোনা যায় এদের জোড়ের যদি কোনও একটি মারা যায় তাহলে অন্যটি আমৃত্যু নাকি মনের কষ্টে একা থাকে, অন্য কোনও সঙ্গী বা সঙ্গিনীর সাথে জোড় বাঁধে না।

(বাঁদিকে) দাঁড়কাকের ডিম। (ডানদিকে) শিকার মুখে দাঁড়কাক। ছবি: সংগৃহীত।
সাধারণত মার্চ থেকে মে মাসের মধ্যে হলেও সুন্দরবন এলাকায় বছরের যে কোনও সময়ে প্রজনন হতে দেখা যায়। পাতিকাকদের থেকে বাসার আকার হয় বেশ বড় তবে উপকরণ ওদের মতোই। শুকনো সরু কাঠি, শুকনো ঘাস, নারকেল ছোবড়া, তুলো, সুতো, সরু তার ইত্যাদি দিয়ে বাসা বানায়। এদের বাসা পাতিকাকদের তুলনায় ছিমছাম। স্ত্রী দাঁড়কাক তিন থেকে পাঁচটি ডিম পাড়ে। এদের বাসাতেও কিন্তু কোকিলরা লুকিয়ে ডিম পেড়ে যায়, আর বুঝতে না পেরে দাঁড়কাক সেই ডিমে তা দিয়ে বাচ্চা ফোটায় ও কোকিলের ছানাকেও নিজের ছানার সঙ্গে বড় করে তোলে। এদের ডিমের আকার পাতিকাকদের মতোই প্রায় দেড় ইঞ্চি। ডিমের রঙ লালচে বা হালকা সবুজাভ নীল। তার ওপর কালচে বা বাদামি বা ধূসর রঙের ছোপ থাকে। স্ত্রী কাক ডিমে তা দেয়। ১৭-১৯ দিন পর ডিম ফুটে বাচ্চারা বেরোয়। ২২-৩০ দিনের মধ্যে বাচ্চারা উড়তে শিখে যায়। এদের গড় আয়ু ১০-১৫ বছর।
আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১২৫: আজও আধুনিক সমাজ রাজা দুষ্মন্তের তঞ্চকতা এবং দ্বিচারিতার দূষণমুক্ত নয়

রহস্য রোমাঞ্চের আলাস্কা, পর্ব-৬৩: অগত্যা আমার গাড়িতে বন্ধুদের নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম আলাস্কা ভ্রমণে
দাঁড়কাকরা পাতিকাকদের মতো মরা পচা মাছ, ব্যাঙ ও জীবজন্তু, মাছের নাড়িভুঁড়ি, কসাইখানার বর্জ্য, পাখির ডিম, ভাত, তরকারি, পাকা ফল ইত্যাদি প্রায় সব খাবারই খায়। এরা শিকার করতেও দারুণ দক্ষ। পাখির বাচ্চার সাথে সাথে ইঁদুর, কাঠবিড়ালি ইত্যাদি শিকার করতে ভালোবাসে। তবে মুরগি বা হাঁসের বাচ্চা এদের খুব প্রিয়। খুব মনে পড়ে আমাদের গ্রামের বাড়িতে ছোটবেলায় দেশি মুরগি পোষা হত। দেশি মুরগি ডিমে তা দিয়ে বাচ্চা ফোটাত আর সেই বাচ্চাদের নিয়ে মা মুরগি যখন বিকেলের দিকে খামারে ঘুরত তখন অধিকাংশ দিন আমার উপর পাহারাদারের ভার ন্যস্ত হত। তবুও তার মধ্যে চিল বা বাজ ছাড়াও ওই দাঁড়কাক ছোঁ মেরে বাচ্চাদের নিয়ে পালাত। আমার দৃষ্টি যখন খুঁজে বেড়াত বাজ বা চিল তখন সেই সুযোগের সদ্ব্যবহার করত দাঁড়কাক কারণ ওর দিকে আমাদের নজরই যেত না। না, মা মুরগিরও নজর যেত না। মুরগি ছানা চুরি করার জন্য দাঁড়কাকদের অনেকবার দুর্দান্ত এক কৌশল অবলম্বন করতে দেখেছি। দাঁড়কাক জোড়ের একটি কাক মা মুরগিকে অন্যমনস্ক করতে যখন সামনে বাচ্চাদের শিকার করার ‘অভিনয়’ করত তখন পিছন থেকে আরেকটা দাঁড়কাক এসে ছোঁ মেরে একটা বাচ্চা তুলে নিয়ে পালাত। তাই বুদ্ধির ব্যাপারে দাঁড়কাক পাতিকাকদের সমকক্ষ বললে একটুও অত্যুক্তি হয় না।
আরও পড়ুন:

সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-৯ : মণিহারা: করিডর, সেজবাতি আর…

আলোকের ঝর্ণাধারায়, পর্ব-১১০: মা সারদার মানবীলীলার অবসান
এদের নিয়ে আমাদের সুন্দরবন এলাকার মানুষের মধ্যে একটা কুসংস্কার রয়েছে। মানুষ মনে করে কোনও প্রিয়জন প্রয়াত হলে সে দাঁড়কাকের বেশ ধরে হাজির হয়। ছোটবেলা থেকে ঠাকুমার মুখে শুনতাম পাড়ার সদ্য প্রয়াত অমুক দাদু, তমুক পিসি ‘ড্যামরা কাক’ হয়ে গাছের ডালে বসে ডাকছে! আর এদের ডাকও বেশ কর্কশ— ‘ক্যাঅ্যাঅ্যাও ক্যাঅ্যাঅ্যাও’। এর ফলে দাঁড়কাকদের দেখে বা ডাক শুনে মনের ভিতর একটা ভয় জন্মাত। ভয় মানে ‘ভূতের ভয়’। এ ভয় প্রায় সব বাচ্চার মনেই বাসা বাঁধত। মনে হয় এখনও বাচ্চারা এই অকারণ ভয় থেকে মুক্ত হতে পারেনি। আসলে ৫০/৬০ বছর আগে সুন্দরবন অঞ্চলে প্রচুর দাঁড়কাক দেখা যেত। সুতরাং ‘ভূত’-এর অভাবও ছিল না! এখন ওদের সংখ্যা কমার সাথে সাথে ‘ভূতের’ সংখ্যাও কমে গিয়েছে! কারও বাড়িতে কেউ প্রয়াত হলে শ্রাদ্ধশান্তি না হওয়া পর্যন্ত তাঁর ‘আত্মার’ উদ্দেশ্যে প্রতিদিন কোনও খোলা জায়গায় মাটির সরায় খাবার রেখে আসার রীতি রয়েছে। আর সেই খাবার খেতে অতীতে পাতিকাকদের সাথে সাথে দাঁড়কাকরাও হাজির হত। এখন দাঁড়কাক যে খাবার খেতে আসবেই তার কোনও নিশ্চয়তা নেই। তাই পাতিকাক সই!

(বাঁদিকে) ঝোপে দাঁড়কাক। (ডানদিকে) পুকুরপাড়ে একাকী দাঁড়কাক। ছবি: লেখক।
জঙ্গল সাফ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কমেছে এদের থাকার জায়গা। এখন আর গ্রামাঞ্চলে তা দিয়ে হাঁস-মুরগির ডিম ফুটিয়ে বাচ্চা তৈরি করা হয় না। মানুষের পরিবেশ পরিচ্ছন্নতা নিয়ে সচেতনতা বেড়েছে। মৃত জীবজন্তু আর আগের মতো খোলা জায়গায় ফেলা হয় না। শহরাঞ্চলে গৃহস্থের অতিরিক্ত খাবার ফেলা হয় ডাস্টবিনে। পাখিদের থেকে পাকা ফল রক্ষা করতে আজকাল ফল বাগানের মালিকরা জাল দিয়ে গাছ ঘিরে দেন। আর্সেনিকযুক্ত বিষ প্রয়োগে মৃত ইঁদুর খেয়েও মারা যাচ্ছে বা প্রজননক্ষমতা হারাচ্ছে দাঁড়কাকেরা। রাসায়নিক কীটনাশক প্রয়োগের ফলে ধানজমিতে মৃত মাছ খেয়েও মারা যাচ্ছে দাঁড়কাকসহ আরও বহু মৎসভূক পাখি। সব মিলিয়ে এদের সংখ্যা উত্তরোত্তর কমছে। আমার স্কুলের মিড-ডে মিলের উচ্ছিষ্ট যখন খোলা ডাস্টবিনে ফেলা হয় তখন প্রায় প্রতিদিন পাতিকাকদের সাথে কয়েকটি দাঁড়কাককেও সেখানে খাবার খাওয়ার জন্য হাজির হতে দেখি। সুন্দরবনের মানুষের কাছে ‘অলুক্ষুণে’ আর ‘ভূত’ হিসেবে বিবেচিত পরিবেশ-বন্ধু এই পাখিরা হয়তো এভাবেই ভবিষ্যতে টিকে থাকবে। —চলবে।
* সৌম্যকান্তি জানা। সুন্দরবনের ভূমিপুত্র। নিবাস কাকদ্বীপ, দক্ষিণ ২৪ পরগনা। পেশা শিক্ষকতা। নেশা লেখালেখি ও সংস্কৃতি চর্চা। জনবিজ্ঞান আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত। বিজ্ঞান জনপ্রিয়করণের জন্য ‘দ্য সায়েন্স অ্যাসোসিয়েশন অফ বেঙ্গল ২০১৬ সালে ‘আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু মেমোরিয়াল অ্যাওয়ার্ড’ এবং শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞান লেখক হিসেবে বঙ্গীয় বিজ্ঞান পরিষদ ২০১৭ সালে ‘অমলেশচন্দ্র তালুকদার স্মৃতি সম্মান’ প্রদান করে সম্মানিত করেছে।


















