
ছবি: প্রতীকী।
আজকালকার মতো দামি দামি কাচের কিংবা বোন-চায়নার ডিনার সেটের ব্যবহার কিন্তু ভারতে এসেছে বহুকাল পরে। তার আগে কাঁসার বাসনই ব্যবহৃত হত। আজও পুজো কিংবা অনুষ্ঠান বাড়িতে কাঁসার পাত্রেই খাবার রাখা হয়। কাঁসার বাসন একটু ভারী বলেই এর ব্যবহার নিত্যদিন আর হয়ে ওঠে না। তবে অনেক বাড়ির বয়ঃজ্যেষ্ঠরা আজও কাঁসার থালাতে খেতে পছন্দ করেন।
অসমের সর্থে বাড়িতে আসাধারণ কাঁসার বাসন তৈরি হয়। এক সময় সার্থেবাড়ি ছাড়াও রহা, তিতাবরে কাঁসার বাসন তৈরি করা হত। এখন সার্থেবাড়ির শিল্পীরা বিভিন্ন প্রতিকূলতার সম্মুখীন হয়েও প্রাচীন এই শিল্পকে বাঁচিয়ে রেখেছেন। কথিত আছে, সপ্তম শতাব্দীতে এই সার্থেবাড়ির শিল্পীদের হাতে তৈরি কাঁসার বাসন এবং অনেক মূল্যবান বস্তু কামরূপের রাজা কুমার বর্মা উত্তর ভারতের রাজা হর্ষবর্ধনকে উপহার হিসেবে পাঠিয়েছিলেন। রাজা স্বর্গদেও শিব সিংহ সার্থেবাড়ির এক শিল্পীকে ‘চৌধুরী’ উপাধি দিয়েছিলেন। সেই সঙ্গে বহু বিঘা জমি দানও করেছিলেন বলে শোনা যায়।
আরও পড়ুন:

অসমের আলো অন্ধকার, পর্ব-৫২: গায়ে মেখলা-চাদর, গলায় গয়না! বাহারি রূপে ধরা দেন অসমের নারী-পুরুষরা

আলোকের ঝর্ণাধারায়, পর্ব-১০৩: মা সারদা নিজের কষ্ট গোপন রাখতেন

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১২১: মহারাজ অফ শান্তিনিকেতন
সার্থেবাড়ির প্রায় সকলেই কাঁসার বাসন তৈরির সঙ্গে যুক্ত। গোটা গ্রামকে কাঁসার এক বৃহত্তর কারখানা বলা চলে। অসমের কাঁসার পানের বাটা দেখতে বেশ আকর্ষণীয়। এই কাঁসার তৈরি তাম্বুল পাত্রটি বিশেষ অতিথিকে উপহার হিসেবে দেওয়ার প্রচলন রয়েছে। শুধু দেশেই নয়, বিদেশেও অসমের সার্থেবাড়ির অসমের বাসনের চাহিদা আছে। ১৮৯৪ সালে সার্থেবাড়ির বাসন নির্মাতা পুষ্পরাম কাহার ইংরেজদের বিরোধিতা করে কারা বরণ করেন। কিন্তু কারারুদ্ধ অবস্থাতে জেলের ভিতরেই নিখুদ নয়নাভিরাম কাঁসার বাসন তৈরি করেছিলেন। তার শিল্পকলায় মুগ্ধ হয়ে ইংরেজ সরকার তাঁর হাজনকাল কমিয়ে দেয়।
আরও পড়ুন:

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১০৫: গাঙচিল

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১১৯: খাণ্ডবদহনের প্রেক্ষিতে জরিতা,লপিতা ও ঋষি মন্দপালের উপাখ্যানের আজ প্রাসঙ্গিকতা কোথায়?
অসমের আরেক গৌরবশালী শিল্প নিদর্শন হচ্ছে হাতির দাঁতের তৈরি সামগ্রী। এখন হাতেগোনা কয়েকজনই এই হস্তশিল্প করে থাকেন। অসমের বরপেটা এই শিল্পের জন্য বিখ্যাত। প্রাচীনকালে অসমে এই শিল্পকলার শিল্পীদের সংখ্যা বেশি ছিল। কিন্তু এখন মাত্র কয়েকজনই এই কাজ করে থাকেন। কথিত আছে, মহাভারতে যুধিষ্ঠিরকে প্রাচীন কামরূপের রাজা ভগদত্ত হাতির দাঁতের তৈরি তলোয়ার উপহার হিসেবের প্রেরণ করেছিলেন। এক সময় অসম হাতির জন্য বিখ্যাত
ছিল।
ছিল।
আরও পড়ুন:

পর্দার আড়ালে, সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-৪: রিলেটিভিটি ও বিরিঞ্চিবাবা

রহস্য রোমাঞ্চের আলাস্কা, পর্ব-৬০: পাহাড়ের চূড়ায় বসে দেখলাম হিমবাহের সেই অপরূপ শোভা
আহোম রাজত্বে অসমের জোরহাটে এবং শিবসাগরে আতির দাঁতের সামগ্রী নির্মাণ করার দক্ষ শিল্পী ছিলেন। আহোম রাজারা হাতির দাঁতের তৈরি জিনিসপত্রকে বিশেষ গুরুত্ব দিতেন। মিস্টার আই ডুয়াল্ড-এর ‘Monogragh of Ivory Carving in Assam’ নামক গ্রন্থে অসমের হাতির দাঁত দিয়ে তৈরি সুন্দর সুন্দর জিনিস তৈরি নিয়ে আলোকপাত করা হয়েছে। এই শিল্পীদের বলা হয় বক্তার খনিকড়।
অনেকের মতে, শিবসাগর এক সময় হাতির দাঁতের শিল্পের জন্য বিশেষ ভাবে বিখ্যাত ছিল। উল্লেখ্য, হাজোর হোয়গ্রিব মাধব মন্দিরে হাতির দাঁতের তৈরি দুটি হাতির মূর্তি রয়েছে। বরপেটাতেও হাতির দাঁতের তৈরি এই জিনিসপত্র বানানো হত। ১৯১০ সালে ইংরেজ সরকার ধুবরিতে অনুষ্ঠিত হওয়া একটি অনুষ্ঠানে হস্তদন্ত শিল্পী রাধানাথ দাসকে রুপোর পদক প্রদানকরে সম্মানিত করেন। রাধানাথের পুত্র জগন্নাথ দাস তাঁর যোগ্য উত্তরসুরী ছিলেন। জগন্নাথও একজন স্বনামধন্য হাতির দাঁতের শিল্পী ছিলেন। ইংরেজ সরকার ১৯৩০ সালে তাঁকেও রুপোর পদক দিয়ে সম্মানিত করে। পরবর্তী সময়ে তিনি জওহরলাল নেহরুর থেকেও মানপত্র গ্রহণ করেন।
অনেকের মতে, শিবসাগর এক সময় হাতির দাঁতের শিল্পের জন্য বিশেষ ভাবে বিখ্যাত ছিল। উল্লেখ্য, হাজোর হোয়গ্রিব মাধব মন্দিরে হাতির দাঁতের তৈরি দুটি হাতির মূর্তি রয়েছে। বরপেটাতেও হাতির দাঁতের তৈরি এই জিনিসপত্র বানানো হত। ১৯১০ সালে ইংরেজ সরকার ধুবরিতে অনুষ্ঠিত হওয়া একটি অনুষ্ঠানে হস্তদন্ত শিল্পী রাধানাথ দাসকে রুপোর পদক প্রদানকরে সম্মানিত করেন। রাধানাথের পুত্র জগন্নাথ দাস তাঁর যোগ্য উত্তরসুরী ছিলেন। জগন্নাথও একজন স্বনামধন্য হাতির দাঁতের শিল্পী ছিলেন। ইংরেজ সরকার ১৯৩০ সালে তাঁকেও রুপোর পদক দিয়ে সম্মানিত করে। পরবর্তী সময়ে তিনি জওহরলাল নেহরুর থেকেও মানপত্র গ্রহণ করেন।
আরও পড়ুন:

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৮২: যে রাজাকে দেখলে প্রজারা ভয় পান, সেই রাজা ভালো প্রশাসক হতে পারেন না

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১২০: একেজি কলিং
এখন এই হাতির দাঁতের শিল্প লুপ্তপ্রায়। হাতির সংখ্যাও আগের থেকে অনেক কমে গিয়েছে। তাই সরকার ১৯৭৭ সাল থেকে এই শিল্পের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। এই শিল্পীরা এখন কাঠের কাজ করে থাকেন। অসমের কুটির শিল্পের মধ্যে এই শিল্পটিও বিদেশে ব্যাপক ভাবে সমাদৃত। আজ এই শিল্প প্রায় নেই বললেই চলে। কিন্তু তার কিছু নিদর্শন এখনও কমবেশি দেখতে পাওয়া যায়। এমন শিল্পীদের কুর্নিশ জানাতে হয়।—চলবে।
* ড. শ্রাবণী দেবরায় গঙ্গোপাধ্যায় লেখক ও গবেষক, অসম।


















