কলকাতায় বৃষ্টি

রিভিউ

● ছবি : রামায়ণ (পার্ট ওয়ান)
● অভিনয় : অরুণ গোভিল, রণবীর কাপুর, সাই পল্লবী, যশ, রবি দুবে, শোভনা
● সঙ্গীত : এআর রহমান
● পরিচালনা : নীতেশ তিওয়ারি
● রেটিং : ৮.৫/১০

চরিতং রঘুনাথস্য শতকোটিসুবিস্তরম্।
যেষাং বৈ যাদৃশী বুদ্ধিস্তে বদন্ত্যেব তাদৃশম্।।

প্রাচীন গ্রিক মহাকাব্য ওডিসিতে সমুদ্রের যে ভূমিকা, সেই একই ভূমিকা ভারতীয় মহাকাব্যগুলিতে বনাঞ্চলের। গ্রিক মহাকাব্যগুলির মৌলিক সংস্কৃত মহাকাব্যগুলির উপর প্রভাব শূন্য কিন্তু রূপক সমান, শূন্যতার বোধ সমান, ঘরে ফিরতে না পারার আকুলতাও সমান। জনস্থানের বনাঞ্চলেই ভাই-বোনের দুর্বুদ্ধি ও দুষ্কর্মের শিকার সেই আর্যা নারী, মিথিলার রাজা জনকের কন্যা সীতা। মূল সুর চিরদিনই (খ্রি. পূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দী থেকে) এক, আর্য রামচন্দ্রের (বিষ্ণুর অবতার) সঙ্গে অনার্য প্রভাবশালী রাজা রাবণের যুদ্ধ। যুদ্ধের কারণ সেই আর্য রাজার স্ত্রীকে ওই অনার্য, লঙ্কেশ্বর, সুশিক্ষিত, শৈব রাজার অন্যায় অধিগ্রহণের চিন্তা এবং ক্রমে সেই স্ত্রীর ইচ্ছার বিরুদ্ধে তাঁকে অপহরণ এবং বন্দিকরণ। এক প্রত্যাখ্যাতা নারীর (সূর্পনখা) কাতর অনুনয়ে অন্য এক নারীকে রাবণের সাধুর বেশে অপহরণ।
নারীর অধিকার খর্ব হওয়ায় ও উদ্ধারের আশা ক্ষীণ থাকায় সামরিক যুদ্ধ এখানে অবশ্যম্ভাবী ছিল। শৌর্যে ও ছলনায় লঙ্কেশ্বরের মৃত্যু অনিবার্য ছিল, হয়েছিলও তাই। কাহিনীর গতিপথ নির্ধারিত করেছিল দক্ষিণ ভারত ও সিংহলে কৃষিভিত্তিক আর্য সভ্যতা ও সংস্কৃতির প্রসারকে। আদিম, অনার্য, পশুপালনকারী জাতিগুলির মধ্যে উন্নত সমাজ, সংস্কৃতি ও কৃষির প্রচলনকে ক্রমশ স্থিরীকৃত করেছিল আদিকবি বাল্মীকির এই রামচরিত। যদিও এই জটিল সংহিতা, আখ্যান, পুরাবৃত্ত, ইতিহাস ও ক্ষাত্র কাব্যের যুগ যুগ ধরে সরলীকরণ হয়েছিল ধর্মকর্ম, দেবতাবাদ, অবতারতত্ত্ব ও দেশজ সাহিত্যের নিরিখে।

ছবির ঘটনা শুরু হয়েছে দেবাসুরের সংগ্রাম, দেবতাদের জয়লাভ, কুবেরের লঙ্কায় অধিষ্ঠান এবং অসুর-রাক্ষসকুলের রসাতলে অবস্থানের মধ্য দিয়ে। এরই মধ্যে মাতা কৈকেসীর কঠোর উচ্চার আর উচ্চাশা পূরণের লক্ষ্যে রাবণের ভীষণ তপস্যা, ব্রহ্মার বরপ্রাপ্তি, কুবেরকে উচ্ছেদ করে লঙ্কায় নিজের ও কুলের পুনঃপ্রতিষ্ঠা, ত্রিলোকের অধীশ্বর হওয়ার ঘোষণা, প্রবর্তনা, ইন্দ্রকে পরাজয় এবং লঙ্কাকে ‘কাঞ্চনেনাবৃতং রম্যাং প্রাকারেণ মহাপুরীম্’ এ পরিণত করা।
আরও পড়ুন:

রিভিউ: মধ্যমানের ভিএফএক্স আর সবাইকে সন্তুষ্ট করতে যাওয়াই কাল হল আদিপুরুষের

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৯১: কেন পান্থ, চঞ্চলতা!

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৭১ : লাউডগা

বিশেষ নিবন্ধ : মুকুন্দ দাস: স্বদেশ জাগরণের চারণকবি

ইন্দ্রদেব নিজের অপমান সহ্য করতে না পেরে ভগবান বিষ্ণুর কাছে প্রার্থনা আর তারপরেই আমাদের পরিচিত সেই সব দৃশ্য মাধ্যম, অযোধ্যার রাজা দশরথের পুত্র রামরূপে বিষ্ণুর সপ্তম অবতারের জন্মগ্রহণ, অযোধ্যার সতত সুখকর, সমৃদ্ধির পাশাপাশি বালক রাজপুত্রদের বাল্যাবস্থার সমৃদ্ধি, সুরক্ষার আবহ পেরিয়ে ঋষি বিশ্বামিত্রের সঙ্গে বনগমন এবং তাড়কা, সুবাহু বধের পর মিথিলায় সীতাসয়ম্বরে হরধনু ভঙ্গ করে বিবাহের উৎসব শেষে অযোধ্যায় প্রত্যাবর্তনের পর সুখ শান্তির আবেশ কাটতে না কাটতেই রামের রাজ্যাভিষেকের পূর্ব রাত্রে দশরথের কৈকেয়ীকে দেওয়া প্রতিশ্রুতির প্রতিফলনে ভরতের রাজ্যাভিষেক ও রামের চোদ্দ বছরের বনবাস এবং জনস্থান অরণ্যে (গোদাবরী থেকে কৃষ্ণা পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল) রাম, সীতা, লক্ষণের অবস্থানকালে বারংবার রাক্ষস খোক্ষসদের প্রভাব, প্রতিরোধ, আক্রমণের মধ্যে সূর্পনখার চরম পরিণতি ও ফলশ্রুতিতে সীতার ভয়ঙ্কর অপহরণ এবং উদ্ধার কাজ যে সহজ হবে না জানিয়ে জটায়ুর মৃত্যুর মধ্যে দিয়ে এই প্রথম পর্বের সমাপ্তি।
আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৮১: শিশুপালের মৃত্যু, এক সাধারণের নির্মম পরিণতি

শারদীয়া স্পেশাল, রাজীব হত্যা : অমীমাংসিত প্রশ্নচিহ্ন অনিন্দ্য ভুক্ত

এর মধ্যে বিশেষ উল্লেখের দাবি রাখে দেবাসুরের সংগ্রাম, বিদ্যুজ্জিহ্বের সঙ্গে রাবণের দ্বন্দ্ব যুদ্ধ, রাবণের দশ আননের দশ রকমের মনস্তাত্ত্বিক প্রকাশ, জটায়ু বনাম রাবণের সংঘাত, জটায়ুর মৃত্যুদৃশ্যের অভূতপূর্ব দৃশ্য গ্রহণ ও ভিসুয়াল এফেক্টের (ডিএনইজি) কাজ। ছবির সংলাপ মনোগ্রাহী ও আকর্ষক।

শ্রীধর রাঘবন ও নীতেশ তিওয়ারির চিত্রনাট্যের কাজ সুসংবদ্ধ। পরিচালক নীতেশ তিওয়ারি! আপনার অন্য কাজগুলির মতো এই মহাকাব্যিক কাজও অসাধারণ। আপনার কাছে এমন ই আশা ছিল। আপনি আমাদের সেইসব শৈশব (ছবিতে রামায়ণ) যাপনের দিনগুলিকে, যা শুধু আমাদের ই ছিল, কেউ কখনও উন্মোচন করতে পারেনি, আপনি ২০২৬- এ সেগুলিকে একেবারে সর্বসমক্ষে এনে দিলেন। অবলীলায় দৃশ্যায়নের পর দৃশ্যায়ন (বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মূলানুগ) করেছেন আপনি এবং আপনার সহযোগীরা।
কলকাতায় বৃষ্টি
ক্রেডিট রোলে বহু মানুষের নামের সমাবেশ সময়োপযোগী। অথচ শুধু ভিএফএক্স দিয়ে তো প্রাচীন হোক বা আধুনিক মানব মনের সন্ধান পাওয়া যায় না, কিন্তু আপনি ও প্রযোজক নমিত মালহোত্রা এবং তাঁর টিম দুই এর সম্মেলন করেছেন এমনভাবে যা দর্শকদের অভিভূত করেছে। ছবিতে ভক্তির স্রোত না বইয়েও নীতেশ আপনি ভক্তি, মুক্তির স্বাদ এনে দিয়েছেন। পঙ্কজ কুমার ও মহেশ লিমায়ের চিত্রগ্রহণ সুন্দর, কাব্যোপযোগী। রামায়ণের মৌল রচনা সূত্র সাহিত্যের পূর্ববর্তী হওয়ায় ধর্মীয় ও সামাজিক রীতিনীতি পালনের প্রথা ছিল তুলনামূলক সরল আর সে সবের চিত্রায়ণে আপনাদের চিন্তা, চেতনা উৎসাহব্যঞ্জক।
আরও পড়ুন:

রহস্য উপন্যাস: হ্যালো বাবু! পর্ব-১৫৯: হার্ড ড্রাইভ হত্যারহস্য

শারদীয়ার গল্প/২ : কনটেন্ট

আর সেই রাজকুমার যিনি রাজ্যাভিষের পূর্ব রাত্রে মাতা কৈকেয়ীর মুখে নিজের বনবাসের নিষ্ঠুর সংবাদ শুনে নির্বিকার চিত্তে বলেছিলেন, হে দেবি! আমি অর্থাসক্ত নই, রাজ্যাভিলাষী নই, মিথ্যাবাদীও নই, আমি সত্যবাদী ও শুদ্ধ স্বভাব, কস্মান্মাং পরিশঙ্কসে—কিসের জন্য আমাকে সন্দেহ করছেন? তাঁর চরিত্রে অভিনয় কোনও সহজ কাজ নয়, কিন্তু দশরথনন্দন থেকে সিয়াপতি হয়ে বনচারী আপনার স্বধর্ম পালনের যে যথাযথ উত্তরণ রণবীর কাপুর করে দেখিয়েছেন তাতে তাঁর নিঃসন্দেহে সাধুবাদ প্রাপ্য। লৌকিক, অলৌকিকের বিচ্ছুরণে তিনি সাবলীল।
আরও পড়ুন:

দশমী

ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-১১৩ : ত্রিপুরায় আহোম রাজদূতের গুপ্তচর নিয়োগ/১

এই ছবির সীতা শুধু দাম্পত্য প্রেম ও পতিভক্তির উন্নততম আদর্শই অনুসরণ করেননি, অরণ্যাঞ্চলে নিজেদের বিপদে, রাম লক্ষণের সহায়তার জন্য অস্ত্রচালনাও করেছেন, সীতা সেইসব মহাকাব্যিক চরিত্রদের মধ্যে অন্যতম যাঁরা বিপরীত লিঙ্গের কাছে সুরক্ষিত, অসুরক্ষিত দুই-ই হয়েছেন, কিন্তু তাঁর মহিমা কখনোও কমেনি। এমন মহিমান্বিত নারী চরিত্রে অভিনয়ের জন্য সাই পল্লবী ছিলেন সঠিক নির্বাচন আর তিনি অভিনয়ও করেছেন নিজেকে উজাড় করে।

রাবণের চরিত্রে যশ নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন দর্পের সঙ্গে, যা ছিল রাবণ রাজের বিনাশের অন্যতম কারণ। তিনি বুদ্ধিমত্তা, উচ্চাকাঙ্ক্ষা আর পেশীশক্তির জোরকে সুচারুভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন তাঁর সূক্ষ্ম ও উগ্র অভিনয়ের মাধ্যমে। দশরথের চরিত্রে অরুণ গোভিল, লক্ষণের চরিত্রে রবি দুবে, ভরতের চরিত্রে আদিনাথ কোঠারে, সূর্পনখার চরিত্রে রাকুল প্রীত সিং, কৈকেসীর চরিত্রে শোভনা, বিদ্যুজ্জিহ্বের ভূমিকায় বিবেক ওবেরয়, মারিচের ভূমিকায় সৌরভ সচদেব, মন্থরার চরিত্রে শিবা চড্ডা যথাযথ। জটায়ুর ভূমিকায় অনুপম খের অনবদ্য। কৈকেয়ীর চরিত্রে লারা দত্ত বেমানান, সাজসজ্জায় তিনি আধুনিকা।

সুরকার এআর রহমান ও অস্কারজয়ী হান্স জিমার এই রামায়ণ —প্রথম পর্বে আবহসঙ্গীতের যে কাজ করেছেন তা অত্যন্ত প্রশংসার যোগ্য, দৃশ্য নির্মাণের সঙ্গে গানের সামঞ্জস্য বজায় থেকেছে তাই আলাদা করে সুরকারের খামতি খুঁজতে যাওয়া অর্থহীন।
কলকাতায় বৃষ্টি
যে আদিকবির শোক শ্লোকে পরিণত হয়েছিল, যে রামগান স্বয়ং লব-কুশ শুদ্ধ উচ্চারণ সহকারে বীণা সহযোগে দ্রুত, মধ্য ও বিলম্বিত লয়ে গেয়ে স্বয়ং রামচন্দ্রকে আবিষ্ট করেছিলেন, যে কাব্যগান, গাথা, বিগত দু’হাজার বছর ধরে বহু মানুষের কীর্তি, মনের আরাম, রুজি রোজগারের মাধ্যম, যে মহাকাব্যকে ভারতীয় চিত্ত কালে কালে নিজের প্রয়োজনমতো নব নব রূপে গড়ে নিয়েছে সেই সুললিত সাহিত্যের সঠিক রূপান্তর যে ছবির প্রযোজক, পরিচালককে আলোর পথে নিয়ে যাবে তা বলাই বাহুল্য।
* চলচ্চিত্র সমালোচনা (Film Review) : ড. বিদিশা মিশ্র (Bidisha Misra), সহকারী অধ্যাপক, সংস্কৃত বিভাগ, লেডি ব্রেবোর্ন কলেজ। বিদিশা বাঙালি নৈয়ায়িক চিরঞ্জীব ভট্টাচার্য্যের গ্রন্থ কাব্যবিলাসের উপর গবেষণা করেছেন। দেশের বিভিন্ন প্রদেশের পত্রিকায় তাঁর শোধপত্রগুলো প্রকাশিত হয়েছে।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content