কলকাতায় বৃষ্টি

ছবি : সংগ্রহীত।

বিশ্বকর্মা পুজো মানেই দুর্গাপুজোর আগে সেমিফাইনাল। ভাদ্রের সংক্রান্তিতে বিশ্বকর্মা আসেন। আসেন শরতের কাশের বনে বনে, আকাশের নীলে ছুটির ডাক নিয়ে। হাতে তাঁর ঘুড়িটি দিয়ে তিনি আশ্বিনের দ্বারোদ্ঘাটন করে যাবেন। সমাজমাধ্যমে বিশ্বকর্মা ও কার্ত্তিক ঠাকুরের আশ্চর্য সাদৃশ্য নিয়ে নানা গবেষণা চোখে পড়ে। কেবল যে আকারে প্রকারে তাঁদের নৈকট্য আছে তা নয়, গুণগত বৈশিষ্ট্যেও নাকি তাঁরা এক ইত্যাদি ইত্যাদি নানা পর্যবেক্ষণ চোখে পড়বে। কুমোরটুলির অন্দরে পালমশাই কীরকম ম্যাজিক ঘটান তা বলা মুশকিল, তবে ইদানিং বিনায়ক গণেশের সঙ্গেই তাঁর নৈকট্য দেখা যাচ্ছে। এ যে কেবল শিল্প ও বাণিজ্যের সহাবস্থানের তত্ত্ব তা নয়, পুজোর তিথি নক্ষত্র-ও প্রায় “বাড়ির পাশে আরশিনগরের” মতোই কাছাকাছি পাশাপাশি এসে দাঁড়াচ্ছে।
মা দুগ্গার সঙ্গে কার্ত্তিক ঠাকুরের মতোই মর্ত্যধামে আসেন গণেশ-ও। বিশ্বকর্মার সঙ্গে কার্ত্তিকের নানা সাদৃশ্য যেমন দৃ্শ্যমান, তেমন-ই গণেশের সঙ্গে শত কিংবা সহস্র যোজনেও খুঁজে পাওয়া কঠিন। একজন সুঠাম যুবাপুরুষ। অন্যজন স্থূল নরশরীরে হস্তিমুণ্ড ধারণ করে আছেন। তবে দু’জনের-ই চারটি হাত। আরেকটি বিষয়ও দৃষ্টি এড়িয়ে যাবে না হয়তো। বিশ্বকর্মার বাহন হাতি। সেই হাতির মস্তকটিই স্কন্ধে নিয়ে গণেশ প্রসিদ্ধ ও সর্বাগ্রে বন্দিত হয়েছেন। সভ্যতার তরণীকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য একজন যদি কষে হাল ধরেন তো অন্যজন পাল তুলে ধরেছেন সেই ঝঞ্ঝাকুটিল সাগরযাত্রায়। একজন যদি বাটালি কিংবা হাতুড়ির ঘা দিয়ে সচল রাখেন সভ্যতার চাকা, জ্বালিয়ে রাখেন পূতাগ্নি, গজদন্তমিনারের স্বপ্নকে সত্য করেন তো আরেকজন পুঁথি-লেখনীর যুগল-সম্মিলনে রচনা করে যান বিপুল এই মহাভারতের ধর্মার্থ-কাম-মোক্ষ। বিশ্বকর্মা যদি বিশ্বের মহাকর্মী হন, হন অনন্ত কর্মরাশির নেপথ্যে বহমান এক মহাসত্তা, তবে জাগতিক কর্মযজ্ঞের মহাসিদ্ধি ঘটান সিদ্ধিদাতা বিনায়ক।

বিশ্বকর্মা বিশ্বকর্মী। বিশ্ব জুড়েই চলছে এক বিপুল কর্মকাণ্ড। সেই নির্মাণ-বিনির্মাণের প্রেরণা, প্রমাণপুরুষ তিনি। বৈদিক আদর্শের যে কর্মযজ্ঞ জগতের আনন্দযজ্ঞ, যেখানে কর্ম-ই প্রধান। সেখান থেকে কর্মী উত্তীর্ণ হন জ্ঞানে। মোক্ষকারক সেই জ্ঞান-ই “বিদ্যা”। কায়িক, বাচিক, মানসিক যেকোনো কর্মের নেপথ্যেই জ্ঞান, বিদ্যার অবিসংবাদী ভূমিকার পাশেই কর্মে সিদ্ধির আকাঙ্ক্ষাটি সর্বজনীন। কর্মের সিদ্ধিতেই তার ফল উৎপন্ন হয়, সেই ফল ভোগ ও ত্যাগকে নিয়ে দর্শন বহুবিস্তৃত হয়েছে, কিন্তু ফলের পূর্বেও থেকে যায় কর্মসিদ্ধির প্রসঙ্গটি।
আরও পড়ুন:

বিচিত্রের বৈচিত্র, গল্পবৃক্ষ, পর্ব-৬৯ : ঘটজাতক/৪ : বীরভোগ্যা বসুন্ধরা

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৭৫: কৃষ্ণবিরোধিতার প্রসঙ্গে ভীষ্মের বিরূপ সমালোচনা সত্ত্বেও কে স্মরণীয়? শিশুপাল? না ভীষ্ম?

এআই যুগেও উপনিষদের আবেদন অমলিন, কেন?

রহস্য উপন্যাস: হ্যালো বাবু! পর্ব-১৫২: হার্ড ড্রাইভ হত্যারহস্য / ৩২

গণেশ নানা বিবর্তনের পথ ধরে বিঘ্নবিনাশক হয়েছেন। তিনি গণের ঈশ, গণপতি। বিশ্বকর্মাও একই রূপে থেমে থাকেননি। আর্যাবর্তের বিশ্বকর্মা পক্বকেশ প্রবৃদ্ধ। কিন্তু বঙ্গে সুঠাম সুপুরুষ। গণপতি এবং বিশ্বকর্মার রূপকল্পের বিশদ তত্ত্বন্যাসে প্রবেশ না করেও যে কথাটি বলা বিশেষ প্রয়োজনীয় হয়ে পড়ে সেটি হল, উভয় দেবতাই শাস্ত্রে পুরাণে পরম সত্তার ধ্যেয় রূপটিতে উত্তীর্ণ হয়ে উপাসককে বিমুগ্ধ করেছেন। বিশ্বকর্মা সূর্যদেবের শ্বশুর, কালে কালে সৌরদেবতার শ্রেণিভুক্ত, যন্ত্রের অধীশ্বর, তথাকথিত অনার্য জাতিসত্তা বহন করে পুর, পুরী, নগরের, যাবতীয় নির্মাণ-নির্মিতির কর্তা, ক্রমে ক্রমে বিশ্বজগতের প্রণেতা কিংবা প্রজাপতি, পরমেষ্টির সমতুল হয়ে বিশ্বচরাচর, জগৎ প্রপঞ্চের নির্মাতা —এইসব তথ্য-তত্ত্ব পৌঁছে দেবে সেই পরম ও চরম ধারণায়, যেখানে অন্যতম দেবতা নন, বিশ্বকর্মা পরমপুরুষ, সর্বময়, জাগতিক যাবতীয় কর্মকান্ডের অন্তর্যামী।
আরও পড়ুন:

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৬৬: শাঁখামুটি

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-১০৮: স্তাবক-পরিবেষ্টিত রাজা কেবল অন্ধই হন না, নিজের দুর্গেই জ্যান্ত সেদ্ধ হন!

আবার গণপতি গণেশ-ও নামোচ্চারণেই জানিয়ে দেন তাঁর শ্রেষ্ঠ ভূমিকাটি। তিনি “ঈশ”, গণের দেবতা, সমষ্টির আদি পূজ্যপাদ। তাঁর একদন্ত, বক্রতুণ্ড, ক্ষুদ্রনেত্র সকলের-ই দার্শনিক, আধ্যাত্মিক কিংবা সামাজিক তাত্পর্য আছে। তাত্পর্য আছে গণের, গণদেবতার সমাজনীতির, রাজনীতির। তিনি ধীমান, একাগ্রচিত্ত। তাঁকে কেন্দ্র করে অজস্র কাহিনির নির্মাণ বিনির্মাণ ঘটেছে, ঘটে চলেছে। গণেশের মহাভারত রচনার কাহিনি থেকে দুর্গাপুজোয় তাঁর পাশের নবপত্রিকার কলাবউ হয়ে ওঠার মধ্যে সেই সমাজদর্শনের প্রতিচ্ছায়া থেকে গেছে।

তবু তাঁরা স্বমহিমায় আছেন। তবে বিশ্বকর্মা ও গণেশকে কেন্দ্র করে যুগবাহিত, প্রজন্মলালিত ভাবধারাটিও খানিক বদলে গেছে বিলক্ষণ। যন্ত্রের দেবতা বিশ্বকর্মার উত্সবে পেশীবলের অবাধ বিচরণ, পরিশীলিত বিদ্যাবুদ্ধির ততটা বুঝি নয় যেন। অথচ কর্মের নেপথ্যে বুদ্ধির অন্দরে বহমান ক্রিয়া-প্রক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার প্রেরণারূপেই বিশ্বকর্মা একদা সর্বময় বিশ্বপুরুষ, এখন নিতান্ত যন্ত্রপুরুষ। আরো স্পষ্ট করে বললে সেখানে সিদ্ধি বিলক্ষণ থাকলেও, মার্জিত কুলীন বিদ্যা ও উন্নাসিক বুদ্ধির প্রবেশ খানিক প্রতিহত যেন।
আরও পড়ুন:

জন্মশতবর্ষে উত্তমকুমার : শতফুল বিকশিত হোক

এই দেশ এই মাটি, ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-১১১ : কবি রাজার বিবসনা রমণীর চিত্রাঙ্কন / ৪

আবার, বিঘ্ন ও বিঘ্নবিনাশকে কেন্দ্র করে, গণের, সমষ্টির ভাবধারাকে পুঞ্জীভূত করে গণেশ হয়ে ওঠার নেপথ্যের কাহিনিটিও কি তেমন মনোরম ছিল কি? জগতে অদ্ভুতকর্মা মানুষ নায়ক হন। বিশ্বকর্মা নায়ক হয়েছেন। কিন্তু অদ্ভুতদর্শন কি তেমন আনুকূল্য পেয়েছে সমাজে কখনো? সেখান থেকে বিনায়ক হয়ে ওঠার, কৌলীন্য অর্জনের নেপথ্যের ঘাত-প্রতিঘাতটুকু অনেক সময় অলক্ষ্য থেকে যায়। গণেশের ওই হস্তিমুণ্ড কিংবা স্থূলবপুও কালে কালে রূপান্তরে শিশুর স্বপ্ন-সহচর হয়েছে। এও এক সমাজভাবনা বটে! মূলস্রোত থেকে খানিক দূরে থেকেও সর্বাগ্রগামী হয়ে, ক্রমে “ছোটা গণেশ” হয়ে ওঠার পথটাও তেমন সুগম ছিল না বোধহয়।

তবে পৃথিবীর পথ উচ্চাবচ, বন্ধুর। তাতে ওঠাপড়া আছে। বর্ষণস্নাত, ঈষৎ ক্লান্ত পৃথিবীও এই ক্রান্তিকাল পার হয়ে হয়ে শরতের অরুণ আলোয় ঝলমল করবে। আষাঢ় থেকে কার্ত্তিকের শুক্ল একাদশীর মাঝের চাতুর্মাস্যে এই ঋতুর পথ ধরে ধরে পৃথিবী আবাহন করে নিয়েছে তার ধ্যেয়কে যুগে যুগে প্রজন্মে প্রজন্মে। সেই পথ ধরে আসেন গণপতি, আসেন বিশ্বকর্মা। পৃথিবীতে খানিক আলো ও আশা রেখে যান।
আরও পড়ুন:

দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-২৯ : নয়া ভুবনের প্রজাপতি

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৮৪: বুনো তেঁতুল, বাঘা ওল

আজকের পৃথিবীতে যন্ত্র ও যন্ত্রণার রূপ বিচিত্র। কর্ম-ও প্রবল হয়ে কখনো কখনো আচ্ছন্ন করে। সিদ্ধির চিরাচরিত ক্ষুরধার পন্থাটি আছে আজ-ও, তবে রজ্জুতে সর্পভ্রমের যন্ত্রণাটিও কণ্টকিত করে নিয়ত-ই। যন্ত্রদুনিয়া তার থেকে সভ্যতাকে কতটা মুক্ত করতে পেরেছে তা তর্কের বিষয়। বিশ্বকর্মার এই জগতে কর্মের প্রণোদনাটুকু সত্য, তবে কর্মমাত্রেই তর্কাতীত নয়। অন্যায় আকাঙ্ক্ষার দগদগে রক্তছাপ, মিথ্যার ক্লেদ তাকে মলিন করে। সেই কর্মীর সিদ্ধি কি তর্কাতীত? আজকের যন্ত্র ও যান্ত্রিকতার ঝকঝকে অঙ্গেও সেই প্রচ্ছন্ন মালিন্য আছে। বর্তমান বিচিত্রগামী যন্ত্রবিশ্বের যন্ত্রণাটিও তাই পৃথিবীর গভীরতর অসুখ হয়ে নিজের অস্তিত্বকে জানিয়ে যাচ্ছে প্রতিদিন। আজকের পৃথিবীর কর্ম ও সিদ্ধির আদর্শের মাঝে এটা ভুললে চলবে না।
* ড. অভিষেক ঘোষ (Abhishek Ghosh) সহকারী অধ্যাপক, বাগনান কলেজ। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগ থেকে স্নাতকস্তরে স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত। স্নাতকোত্তরের পর ইউজিসি নেট জুনিয়র এবং সিনিয়র রিসার্চ ফেলোশিপ পেয়ে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগে সাড়ে তিন বছর পূর্ণসময়ের গবেষক হিসাবে যুক্ত ছিলেন। সাম্বপুরাণের সূর্য-সৌরধর্ম নিয়ে গবেষণা করে পিএইচ. ডি ডিগ্রি লাভ করেন। আগ্রহের বিষয় ভারতবিদ্যা, পুরাণসাহিত্য, সৌরধর্ম, অভিলেখ, লিপিবিদ্যা, প্রাচ্যদর্শন, সাহিত্যতত্ত্ব, চিত্রকলা, বাংলার ধ্রুপদী ও আধুনিক সাহিত্যসম্ভার। মৌলিক রসসিক্ত লেখালেখি মূলত: ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে। গবেষণামূলক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়ে চলেছে বিভিন্ন জার্নাল ও সম্পাদিত গ্রন্থে। সাম্প্রতিক অতীতে ডিজিটাল আর্ট প্রদর্শিত হয়েছে আর্ট গ্যালারিতে, বিদেশেও নির্বাচিত হয়েছেন অনলাইন চিত্রপ্রদর্শনীতে। ফেসবুক পেজ, ইন্সটাগ্রামের মাধ্যমে নিয়মিত দর্শকের কাছে পৌঁছে দেন নিজের চিত্রকলা। এখানে একসঙ্গে হাতে তুলে নিয়েছেন কলম ও তুলি। লিখছেন রম্যরচনা, অলংকরণ করছেন একইসঙ্গে।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content