কলকাতায় বৃষ্টি

ছবি : প্রতীকী।

শ্রাবণী পূর্ণিমায় আজ বিশ্ব সংস্কৃত দিবস। কালিদাস আষাঢ়কে অমর করেছেন। তাঁর মেঘ কখনো অলকায় পৌঁছেছিল কীনা জানা যায় না। তবে সে অজ্ঞেয় ব্যক্তিগত অনুভব বিশ্বজনীন হয়ে চিরকালের হয়েছে। আষাঢ়ের গুরুপূর্ণিমার ঠিক পরেই শ্রাবণের এই রক্ষাবন্ধনের রাখিপূর্ণিমায় আজ বিশ্ব সংস্কৃত দিবস। মানুষের মুখে সার্থক বাক্ আত্মপ্রকাশ করেছিল সুদূর অতীতে একদিন। ক্রমে সেই বাণী হলেন ভাষা। মানুষ ভূমি এবং ভাষাকে নারীরূপে, মাতৃরূপে দেখেছে।

সংস্কৃত ভাষার নামের মধ্যেই তার পরিমার্জিত হয়ে ওঠার সূত্রটুকু থেকে যায়। ভাষার সঙ্গে নিবিড় আত্মবন্ধন মানুষকে সার্থক করে। ভাষার পথে তার মন, বুদ্ধি, চিন্তা কিংবা ভাবনা সংহত সাবলীল হয়। সংস্কৃত হয়ে ওঠা সেই ভাষার পথে ভারতবর্ষের মন, বুদ্ধি, চিন্তা কিংবা ভাবনা উত্সারিত হয়েছিল।
সংস্কৃত ভাষা বিবাহ-পূজার মন্ত্রেই আবদ্ধ নয়। তার বিস্তার মন থেকে মননে। কণ্ঠ থেকে হৃদয়ে। নানা ভারতীয় ভাষার অঙ্গে-প্রত্যঙ্গে কিংবা শোণিত-মজ্জায় সেই সংস্কৃত ভাষার প্রকাশ নিত্য বহমান। মানুষের অমেয় প্রজ্ঞার, এককে বহুতে, বহুকে একে পূর্ণ, সার্থক করার দিকনির্দেশ এই ভাষাতেই লিপিবদ্ধ আছে। বর্তমান বিশ্বে একটি ভাষা যেভাবে সমাজ, ইতিহাস, রাজনীতি, বাণিজ্য, মন, মস্তিষ্ক, আদর্শ, বিজ্ঞান, অধ্যাত্মবোধ, প্রেম, অ-প্রেম ইত্যাদি সকল দিককেই ব্যাপ্ত করে আছে বা থাকে, সংস্কৃত-ও তেমনই বহমান ছিল নানা প্রাকৃত ভাষার পাশেই তার স্বাতন্ত্র্য নিয়ে। এই ভাষায় আয়ুর্বেদ থেকে রাজনীতি সকল দিকের, ধর্মার্থকামমোক্ষ এই চতুষ্টয়ের তত্ত্ব ও তথ্য সমাবিষ্ট হয়েছে। সংস্কৃত ভাষায় আজ পর্যন্ত যা যা তথ্য গবেষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে তার তাত্পর্য অপরিসীম। এছাড়াও কালের স্রোতে বিলীন হয়ে গেছে চিরতরে যা কিছু তাও কম নয়। তবুও ভবিষ্যতে এই ভাষার গভীরলোক থেকেই নতুন ইতিহাস, নবতর ভাবনার ভাষ্য স্ফুরিত হবে, এই আশা সংস্কৃতজ্ঞমাত্রেই রাখবেন।
আরও পড়ুন:

গল্পবৃক্ষ, পর্ব-৬৬ : ঘটজাতক/১ : নিয়তিঃ কেন বাধ্যতে?

এই দেশ এই মাটি, ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-১১১ : কবি রাজার বিবসনা রমণীর চিত্রাঙ্কন / ৪

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৮১: সীমান্ত-সংঘাত

হ্যালো বাবু!, পর্ব-১৪৮: হার্ড ড্রাইভ হত্যারহস্য / ২৮

সংস্কৃত ভাষা ভারতবর্ষের প্রাচীনতর কালের বিশিষ্ট ঐতিহাসিক তথ্যে সমাকীর্ণ। এই ভাষার আধারেই আজ-ও সেই ইতিহাস জেগে ওঠে, এই ভাষার বাক্য-ব্যাকরণের সুচিন্তিত গঠনতন্ত্রে কাব্য থেকে সমাজেতিহাসের গভীর ব্যঞ্জনা থেকে গেছে। সেখানে পাণিনীয়-অপাণিনীয়, নিয়ম কিংবা নিয়মহারা হিসাবহীন সকলেই আছে তাদের সত্তা ও স্মৃতি নিয়ে। আজকের বিশ্বগ্রামের জন্য ন্যায়-নীতি থেকে রাজনীতির প্রতি কোণের যাথার্থ্য, আদর্শ, মূল্যকে চেতনা, বোধের স্তরে নিয়ে যেতে পারে এই ভাষার ক্রমবর্ধমান চর্চা। জাগাতে পারে নতুন ভাবনা, নতুন করে চেনাতে পারে ভারতভূখণ্ডকে। তাই এই ভাষা মৃত কিংবা অপ্রাসঙ্গিক নয়। বঙ্কিমচন্দ্রের ভাষাতেই বলা যায় “বাণী বিদ্যাদায়িনী, নমামি ত্বাং নমামি কমলাং, অমলাং অতুলাম্, সুজলাং সুফলাং মাতরম্!”
আরও পড়ুন:

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৬৩: কেউটে

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-১০৮: স্তাবক-পরিবেষ্টিত রাজা কেবল অন্ধই হন না, নিজের দুর্গেই জ্যান্ত সেদ্ধ হন!

সেই অতুল গৌরবময়ী সংস্কৃতভাষার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দুটি উদাহরণ শেষে রাখা যায়। বিশ্রুত কবি কালিদাস প্রথম জীবনে যখন রঘুবংশ রচনা করছেন তখন তিনি নিজেই সন্দিহান এই ভেবে যে আদৌ কেউ তাঁর মতো নতুন কবির কাব্য পড়ে দেখবে তো? অবশ্য খানিক পরেই তিনি আত্মবিশ্বাসী, আত্মশক্তিতেই তিনি এই প্রতিকূলতা থেকে উত্তীর্ণ হতে পারবেন এমন আভাস পাওয়া গেল। মনে হয়, এই আত্মশক্তি তিনি লাভ করেছেন এই ভাষার সম্পদ, দার্ঢ্য ও দার্শনিক প্রেরণা থেকে। গুরুর প্রদর্শিত পথে চলার আদর্শে সিঞ্চিত এই ভাষা, এই “বিদ্যা”র জগতে তিনি আস্থা রাখেন পরম্পরায়, ব্যাস-বাল্মীকি প্রমুখ পূর্বজ কবিদের দেখানো পথেই যাত্রা শুরু হয় তাঁর, যে পথ ক্রমে পৌঁছেছে অভিজ্ঞানশকুন্তলের আত্মানুসন্ধানে।
আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৭৩: চেদিরাজ শিশুপালের কৃষ্ণবিদ্বেষ কি কৃষ্ণেরই কোন পরিকল্পিত ইচ্ছার প্রকাশ?

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৯৭ : সূর্যশিখা

আবার কালিদাসের রচনাবলী যেমন তাঁকে অমরত্ব দিয়েছে, তেমন-ই নাম না জানা, স্বল্পখ্যাত কতো কবি এই ভাষাতেই বর্তমানের কূলে ভেসে ওঠা একটি বা কয়েকটি শ্লোকেই অক্ষয় কীর্তি স্থাপন করেছেন। এলাহাবাদ প্রশস্তিকার হরিষেণ, কিংবা শীলাভট্টারিকা এঁদের-ই অন্যতম। সংস্কৃত ভাষার সেই সুদূর কালের বিজনবীথী থেকে আজকের সভ্যতার রাজমার্গে পদপাতের আত্মশক্তি এই ভাষার আন্তরসম্পদেই বহমান আছে। এখানেই সংস্কৃত ভাষা অতুলনীয়, মার্জিত, নন্দিত, সুচারু পদবিক্ষেপে অপ্রতিহত।
আরও পড়ুন:

দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-২৯ : নয়া ভুবনের প্রজাপতি

এআই যুগেও উপনিষদের আবেদন অমলিন, কেন?

উপনিষদে ‘বিদ্যা’র তাত্পর্য বিশিষ্ট, তা পরাজ্ঞান। কৌটিল্য তাঁর অর্থশাস্ত্রে জানিয়েছেন চতুর্বিধ বিদ্যার কথা। শেষের তিনটিতে ত্রয়ী, বার্তা বা কৃষি-পশুপালন ও দণ্ডনীতি বৈদিক-জাগতিক কর্মকাণ্ডের আশ্রয়। তবে প্রথমেই যে বিদ্যার কথা তিনি জানিয়েছেন সেটিই সর্বোত্কৃষ্ট। তার নাম আন্বীক্ষিকী বা হেতুবিদ্যা। অন্বীক্ষা, বিশেষভাবে জানা অর্থাৎ ‘লজিক’ প্রয়োগ করে কার্য-কারণ নির্ধারণ করার বাস্তববোধ। কৌটিল্য বলবেন, আন্বীক্ষিকী সকল ধর্ম-কর্মের আশ্রয় ও উপায়। অর্থাৎ মুড়ি-মুড়কি আলাদা করার মতো বিবেচনার শক্তি উৎপন্ন হয় এই বিদ্যায়। তাই আন্বীক্ষিকী সকল বিদ্যার প্রদীপ হয়ে কিংকর্তব্যবিমূঢ় অন্ধকার পথে আলো দেখিয়ে চলেছে সেই সুদূর অতীত থেকে আজ-ও। তার নাম দেশকালভেদে পরিবর্তিত হয়, কিন্তু মূলগত রূপটি এক থেকে যায়। সংস্কৃত ভাষা এই বিদ্যার উপদেশে দীক্ষিত করে চলেছে সুধী রসজ্ঞ মানুষকে। বিশ্ব সংস্কৃত দিবসে সেই ভাষা অন্তরতর হয়ে অন্তরকে বিকশিত, আলোকিত, বিস্তৃত, মার্জিত করুক।
* ড. অভিষেক ঘোষ (Abhishek Ghosh) সহকারী অধ্যাপক, বাগনান কলেজ। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগ থেকে স্নাতকস্তরে স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত। স্নাতকোত্তরের পর ইউজিসি নেট জুনিয়র এবং সিনিয়র রিসার্চ ফেলোশিপ পেয়ে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগে সাড়ে তিন বছর পূর্ণসময়ের গবেষক হিসাবে যুক্ত ছিলেন। সাম্বপুরাণের সূর্য-সৌরধর্ম নিয়ে গবেষণা করে পিএইচ. ডি ডিগ্রি লাভ করেন। আগ্রহের বিষয় ভারতবিদ্যা, পুরাণসাহিত্য, সৌরধর্ম, অভিলেখ, লিপিবিদ্যা, প্রাচ্যদর্শন, সাহিত্যতত্ত্ব, চিত্রকলা, বাংলার ধ্রুপদী ও আধুনিক সাহিত্যসম্ভার। মৌলিক রসসিক্ত লেখালেখি মূলত: ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে। গবেষণামূলক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়ে চলেছে বিভিন্ন জার্নাল ও সম্পাদিত গ্রন্থে। সাম্প্রতিক অতীতে ডিজিটাল আর্ট প্রদর্শিত হয়েছে আর্ট গ্যালারিতে, বিদেশেও নির্বাচিত হয়েছেন অনলাইন চিত্রপ্রদর্শনীতে। ফেসবুক পেজ, ইন্সটাগ্রামের মাধ্যমে নিয়মিত দর্শকের কাছে পৌঁছে দেন নিজের চিত্রকলা। এখানে একসঙ্গে হাতে তুলে নিয়েছেন কলম ও তুলি। লিখছেন রম্যরচনা, অলংকরণ করছেন একইসঙ্গে।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content