কলকাতায় বৃষ্টি
১৫ আগস্ট শুধু ক্যালেন্ডারের একটি তারিখ মাত্র নয়, এটি একটি জাতির আত্মমর্যাদা, আত্মগৌরব ফিরে পাওয়ার দিন। বহু শতকের পরাধীনতার অন্ধকার বিদীর্ণ করে যে সূর্যোদয় হয়েছিল তা ভারতবর্ষকে যেন নতুন করে গড়ে তুলেছিল, তার আলোতে আজও আমরা উদ্ভাসিত। কিন্তু এক্ষেত্রে একটা প্রশ্ন উঠেই আসে, স্বাধীনতার প্রকৃত তাৎপর্য কি কেবল উৎসব, শোভাযাত্রা ও আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ? নাকি স্বাধীনতা এমন এক চেতনা, যা আমাদের সততা, দায়িত্ববোধ ও মানবিকতার মাধ্যমে প্রকাশ পায়?
ভারতের স্বাধীনতার ইতিহাস বহু মানুষের আত্মবলিদানের ইতিহাস। এই স্বাধীনতা অর্জনের জন্য কেউ বন্দুক হাতে লড়েছেন, কেউ বা কলমকে হাতিয়ার করেছেন, কেউ কারাগারের অন্ধকারকে বরণ করেছেন, আবার কেউ হাসতে হাসতে প্রাণ উৎসর্গ করেছেন। তাঁরা তাদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে অর্জন করা স্বাধীনতাকে আমাদের হাতে এক অমূল্য উত্তরাধিকার হিসাবে তুলে দিয়ে গিয়েছেন। সেই উত্তরাধিকারকে রক্ষা করাই এবং যথাযথ সম্মান করা প্রতিটি ভারতীয় নাগরিকের নৈতিক কর্তব্য।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর কালজয়ী প্রার্থনায় লিখেছিলেন— “চিত্ত যেথা ভয়শূন্য, উচ্চ যেথা শির।” এই পঙ্ক্তিটি কেবলমাত্র একটি কবিতার অংশ নয়, এটি স্বাধীনতার প্রকৃত অর্থ। যেখানে মানুষ ভয়মুক্ত হয়ে উদাত্ত কণ্ঠে সত্য উচ্চারণ করতে পারে, যেখানে জ্ঞান সংকীর্ণতার বেড়াজালে আবদ্ধ নয়, সেখানেই স্বাধীনতার পূর্ণ বিকাশ।
আরও পড়ুন:

এআই যুগেও উপনিষদের আবেদন অমলিন, কেন?

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৮০: যাত্রাপথে

মানুষকে দেখি গণদেবতার বেশে…

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৬২: ছুঁচো

স্বামী বিবেকানন্দের অমর বাণী— “ওঠো, জাগো, এবং লক্ষ্য না পাওয়া পর্যন্ত থেমো না।” স্বামীজির এই বাণী স্বাধীন ভারতের তরুণ প্রজন্মের কাছে আজও এক চিরন্তন আহ্বান। সরকারের দায়িত্ব শুধুমাত্র জাতির অগ্রগতি নয়; একজন শিক্ষক, কৃষক, চিকিৎসক, বিজ্ঞানী, শ্রমিক কিংবা ছাত্র—প্রত্যেকের অবিরত নিঃস্বার্থ কর্মই দেশের ভবিষ্যতকে সুদৃঢ় করে, সুন্দর করে গড়ে তোলে।

মহাত্মা গান্ধী বলেছিলেন, “তুমিই হও সেই পরিবর্তন, যা তুমি পৃথিবীতে দেখতে চাও।” স্বাধীনতার প্রকৃত বিশ্লেষণ এই বাণীতেই। যদি আমরা দুর্নীতিকে প্রত্যাখ্যান করি, আইনকে সম্মান করি, যথাযথ ভাবে পরিবেশ রক্ষা করি, নারী-পুরুষের সমান মর্যাদা নিশ্চিত করি এবং একই সঙ্গে ভিন্ন মতের প্রতিও শ্রদ্ধাশীল হই, তবেই স্বাধীনতার মূল্য সজীব থাকবে আমাদের মধ্যে।
আরও পড়ুন:

এই দেশ এই মাটি, ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-১০৯ : কবি রাজার বিবসনা রমণীর চিত্রাঙ্কন / ২

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-১০৮: স্তাবক-পরিবেষ্টিত রাজা কেবল অন্ধই হন না, নিজের দুর্গেই জ্যান্ত সেদ্ধ হন!

নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর বজ্রকণ্ঠ আজও আমাদের অনুপ্রাণিত করে— “তোমরা আমাকে রক্ত দাও, আমি তোমাদের স্বাধীনতা দেব।” স্বাধীনোত্তর ভারতে আজ কিন্তু আর রক্ত দেওয়ার আহ্বান নেই; আজ প্রয়োজন সততা, অধ্যবসায়, দক্ষতা এবং ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে জাতীয় স্বার্থকে রাখা।

বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম লিখেছিলেন— “মোরা একই বৃন্তে দুটি কুসুম হিন্দু-মুসলমান।” এই বাণী আজ আরও বেশি তাৎপর্যপূর্ণ। বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্যই ভারতের শক্তি। আমাদের লক্ষ্য রাখতে হবে ধর্ম, ভাষা, সংস্কৃতি কিংবা অঞ্চল যেন কখনও বিভেদের কারণ না হয়। অর্থাৎ স্বাধীনতার প্রকৃত সৌন্দর্য নিহিত রয়েছে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহমর্মিতা এবং জাতীয় ঐক্যে।
আরও পড়ুন:

উপন্যাস: হ্যালো বাবু! পর্ব-১৪৭: হার্ড ড্রাইভ হত্যারহস্য / ২৭

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৯৭ : সূর্যশিখা

আমাদের প্রাচীন শাস্ত্রেও রাষ্ট্রচিন্তার গভীর বাণী উচ্চারিত হয়েছে—
“जननी जन्मभूमिश्च स्वर्गादपि गरीयसी।”

অর্থাৎ, জননী ও জন্মভূমি স্বর্গের থেকেও শ্রেষ্ঠ।

এই শ্লোক কেবল দেশপ্রেমের কথা বলে না; এটি আমাদের ভারতবাসীদের মাতৃভূমির প্রতি দায়িত্ব, কৃতজ্ঞতা ও আত্মনিবেদনের শিক্ষা দেয়। আসুন, আজ ৮০ তমস্বাধীনতা দিবসে আমরা শুধু পতাকাকে স্যালুট না জানিয়ে তার আদর্শকেও সম্মান জানাই। আমাদের প্রতিজ্ঞা হোক—সত্যকে ধারণ করব, কর্তব্যকে শ্রদ্ধা করব, মানবিকতাকে লালন করব এবং দেশকে ভালোবাসব দৈনন্দিন কাজের মাধ্যমে। কারণ স্বাধীনতার সর্বশ্রেষ্ঠ উদ্যাপন মঞ্চে নয়, নাগরিকতায়; স্লোগানে নয়, সৎ কর্মে।
আরও পড়ুন:

দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-২৯ : নয়া ভুবনের প্রজাপতি

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৭২: কামোদ্দীপক প্ররোচনা ও রাবণের পরস্ত্রী-অপহরণের লোলুপতা আজও অব্যাহত

আজকের প্রজন্মই স্বাধীন ভারতের আগামী অধ্যায় লিখবে। তাই স্বাধীনতার আলো যেন কেবলমাত্র অতীতের গৌরবকে আলোকিত না করে, সেই সঙ্গে ভবিষ্যতের পথকেও সমান উজ্জ্বল করে তোলে—এই হোক আমাদের ১৫ আগস্টের অঙ্গীকার।
* লেখক: ড. সঞ্চিতা কুণ্ডু (Sanchita Kundu) সংস্কৃতের অধ্যাপিকা, হুগলি মহসিন কলেজ।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content