রবিবার ৮ মার্চ, ২০২৬


কলকাতায় বৃষ্টি

কাছাড়ি রাজার নিদর্শন। সংগৃহীত।

মাটি মায়ের মতো সবাইকে কাছে টেনে নেয়। তাঁর কাছে সবাই সন্তানসম। অসমের মাটিতেও নানা ধর্ম, নানা ভাষা, নানা জাতির লোক বসবাস করেন। আর সময়ের সঙ্গে হাত মিলিয়ে তারাও হয়ে উঠেছেন অসমের জন সম্পদ। অসমের প্রতিবেশী রাজ্য মণিপুর। সেই মণিপুরের প্রভাব অসমে যথেষ্ট পড়েছে, অসমের বরাক উপত্যকায় মণিপুরীদের জনবসতিও যথেষ্ট।
বরাক উপত্যকায় কাছাড়ি রাজাদের রাজত্ব ছিল। কাছাড়ের শেষ রাজা ছিলেন গোবিন্দচন্দ্র। তাঁর রাজত্বকালের শেষের দিকে ১৮১৮ থেকে ১৮২৪ সাল, এই ছয় বছর কাছাড়ের শাসনভার ছিল মণিপুরী রাজার হাতে। ইতিহাসের এই পর্বটি যেন এক গল্পের মতো। যে গল্পের শুরু অসমের প্রতিবেশী রাজ্য মণিপুর থেকে। মণিপুরের রাজদণ্ড ঘড়ির পেন্ডুলামের মতো এদিক-ওদিক হয়েছে। পিতা-পুত্র কিংবা ভাইদের মধ্যে প্রায়শই চলেছে দ্বন্দ। মণিপুর রাজ জয়সিংহের মৃত্যুর পর তাঁর আট পুত্রদের মধ্যে চলে শুরু হয় ক্ষমতা লাভের লড়াই।
আরও পড়ুন:

অসমের আলো অন্ধকার, পর্ব-৫৬: অসমের ইতিহাস বিজড়িত রাস্তা ‘ধোদর আলি’

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১১৫: পাতি গাঙচিল

পৃথিবীর সর্বোচ্চ একক আর্চ ব্রিজের নির্মাণে বিনয়ী এক অধ্যাপিকা

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৩০: চুপি-চুপি আসে

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১২৮: স্ত্রী সীতার ব্যক্তিত্বের প্রভায় রামচন্দ্রের আলোকিত উত্তরণ সম্ভব হয়েছে কি?

রাজকুমার মধুচন্দ্র নিজের ভাইদের দ্বারা বিতাড়িত হয়ে কাছাড় রাজ কৃষ্ণচন্দ্রের কাছে সাহায্য নিয়ে নিজের ক্ষমতা পুনরায় লাভ করেন। এই রাজনৈতিক বন্ধুত্বকে বৈবাহিক সম্পর্কে পরিণত করার জন্য রাজা মধুচন্দ্র তাঁর কন্যা ইন্দুপ্রভাকে রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের সঙ্গে বিবাহ দেন। কিন্তু ক্ষমতার লোভে রাজকুমার মার্জিত সিংহ নিজের ভাই মধুচন্দ্রকে হত্যা করেন। তখন মধুচন্দ্রের স্ত্রী প্রাণ বাঁচানোর জন্য নিজের ছেলেদের এবং বিশ্বস্ত আত্মীয়স্বজন সঙ্গে নিয়ে কাজারের রাজবাড়িতে আশ্রয় নেন।
আরও পড়ুন:

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৯০: শত্রুকে হারাতে সব সময় অস্ত্র নয়, ছলনারও আশ্রয় নিতে হয়

ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৭৩: রাজা গোবিন্দমাণিক্য চেয়েছিলেন ঘরে ঘরে পুরাণ পুঁথির প্রচার হোক

মার্জিত সিংহের সিংহাসন কিছু দিনের মধ্যেই সর্জিত সিংহ দখল করে নিলে তিনি মনঃকষ্টে তীর্থে বেরিয়ে যান। যাত্রা পথে গোবিন্দ চন্দ্রের দ্বারা অপমানিত হন। সেই অপমানের প্রতিশোধ নেওয়ার দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করেন। তিনি ব্রহ্মদেশের রাজার সাহায্য লাভ করে ১৮১২ সালে পুনরায় মণিপুরের সিংহাসন লাভ করেন। দিকে কাছাড়ের রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের মৃত্যুর পর গোবিন্দ চন্দ্র রাজা হলেন। এদিকে মার্জিত সিংহ নিজের অপমানের প্রতিশোষ নিতে কাছাড় আক্রমণ করেন।
আরও পড়ুন:

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১৩০: ঠাকুরবাড়ির জামাই রমণীমোহনকে মন্ত্রী করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ

রহস্য উপন্যাস: হ্যালো বাবু! পর্ব-৯৭: গ্রিন টি /৫

গোবিন্দ চন্দ্র তখন মণিপুরের আরেক রাজকুমার মার্জিত সিংহের সাহায্যে মার্জিত সিংকে পরাস্থ করেন। কিন্তু এই সুযোগের লাভ নিয়ে সুরজিৎ সিংহ নিজেই কাছাড়ে আধিপত্য বিস্তার করেন। মার্জিত সিংহ আবার মণিপুরে ফিরে গেলেন। ব্রহ্মদেশের রাজা তখন তাঁকে মণিপুর থেকে বিতাড়িত করেন এবং তিনি আবার কাছাড়ে আশ্রয় লাভ করেন। সুরজিৎ সিংহ তো ছিলেনই মার্জিত সিংহও কাছাড়ে চলে আসলেন। এদিকে আরেক মণিপুরী রাজকুমার গম্ভীর সিংহ আগেই কাছাড়ের কালাইন অঞ্চলে এসে থাকতে শুরু করেছিলেন। তিনজনই নিজের নিজের মতো করে শাসন করতে শুরু করে।
আরও পড়ুন:

সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-১০ : নায়ক ও মহাপুরুষ

আলোকের ঝর্ণাধারায়, পর্ব-১১০: মা সারদার মানবীলীলার অবসান

তবে এই শাসনকাল বেশিদিন স্থায়ী হল না। অল্পদিনের মধ্যেই সুরজিৎ সিংহের এবং গম্ভীর সিংহের মধ্যে বিরোধ দেখা দেয়। সুরজিৎ সিংহ তখন বর্তমান বাংলাদেশের সিলেটে গিয়ে আশ্রয় নেন। সিলেটে তখন ব্রিটিশ সরকারের রাজ ছিল। এদিকে কাছাড়ের রাজা তখন ব্রহ্মদেশের কাছ থেকে সাহায্য নিয়ে কাছাড় থেকে মণিপুরী রাজ অবসানের প্রচেষ্ঠ হন। ব্রহ্মদেশীয় সেনা বিভিন্ন দিক থেকে কাছাড়ে প্রবেশ করে। ব্রিটিশ সরকার তখন হস্থক্ষেপ করে। ব্রিটিশরা তখন গম্ভীর সিংহের সঙ্গে আলোচনা করলেও কোনও সমাধান সূত্র পাওয়া যায়নি। পরে ব্রিটিশ সরকার রাজা গোবিন্দ চন্দ্রের সঙ্গে আলোচনায় বসে এক চুক্তিতে আবদ্ধ হয়। আর মাত্র ছয় বছরের মধ্যেই কাছাড়ে মণিপুরি রাজ শেষ হয়ে যায়।

মণিপুরি রাজত্ব শেষ হয়ে গেল। তার পর গোবিন্দ চন্দ্রের মৃত্যুর পর শুরু হল ইংরেজ রাজ। সময় নিজের মতো করে চলতে থাকে, আর ইতিহাসের খাতায় লিখা হতে থাকে কত গল্প গাঁথা। ইতিহাসের এই বদলের হাত ধরেই তো প্রজন্মের পর প্রজন্ম দেখে কত পরিবর্তন। বর্তমান এই সময়ও চিরস্থায়ী নয়, আর এই বর্তমানও এসেছে অনেক অতীত পেরিয়ে।—চলবে।
* ড. শ্রাবণী দেবরায় গঙ্গোপাধ্যায় লেখক ও গবেষক, অসম।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content