
তপন জোরে জোরে প্যাডেল করে। আজ একটু তাড়াতাড়ি ফিরতে পারলে দুপুরের ম্যাচটায় থাকতে পারবে। গলি পার হয়ে বড় রাস্তা। নানা দিক থেকে গান ভেসে আসে। লতার বন্দেমাতরম, এছাড়াও উঠো গো ভারতলক্ষ্মী, কারার ওই লৌহকপাট, বিধির বাঁধন, যদি তোর ডাক শুনে… এই আগস্টে যখন তখন বৃষ্টি, এই রোদ, এই মেঘ। চিরাগদের বাড়ির পাশের মাঠটায় প্যাণ্ডেল বাঁধার কাজ অনেকটা এগিয়ে গিয়েছে। এবার পুজো তাড়াতাড়ি, পুজোটাও না নিম্নচাপের চাপে মাঠে মারা যায়… পাশ দিয়ে সাঁই সাঁই করে দুটো গাড়ি চলে গেল, তপন সাইকেল থেকে নেমে গেটটা ঠেলে খুলল, কুকুরটা তড়াক করে সরে যায়, স্যারকে চেনে ও। প্যাসেজটা পেরিয়ে কল বেল দেয়, দরজা খুলে যায়।
পড়ার ঘরটায় জানালার ওপাশে মাধবীলতার ঝাড় ঘন হয়ে আছে, জানলায় এখন খানিকটা রোদ জমাট বাঁধছে। চিরাগের এখন ক্লাস নাইন, অনুযোগের সুরে বলে, “স্যর, আজকেও পড়তে হবে, এগারোটা থেকে ম্যাচ ছিল।”
তপনের হাসি পায়, সকলেই আজ মাঠে নামবে নাকি। গম্ভীর হয়ে চশমাটা সোজা করে নিয়ে বলে, “তুমি তো অল্টারনেটিভ ডেটের কথা জানাওনি আগে থেকে, জানালেও অবশ্য আমি সময় করতে পারতাম কীনা বলতে পারি না। আজ ছুটির দিন, বাড়িতে বসে পড়াশোনার অনেক সময় পাবে।”
তপনের হাসি পায়, সকলেই আজ মাঠে নামবে নাকি। গম্ভীর হয়ে চশমাটা সোজা করে নিয়ে বলে, “তুমি তো অল্টারনেটিভ ডেটের কথা জানাওনি আগে থেকে, জানালেও অবশ্য আমি সময় করতে পারতাম কীনা বলতে পারি না। আজ ছুটির দিন, বাড়িতে বসে পড়াশোনার অনেক সময় পাবে।”
আরও পড়ুন:

গল্পবৃক্ষ, পর্ব-৩৬: বরুণজাতক: অলস মস্তিষ্কের গল্প

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১২৭: আঁধারে ছিল আগন্তুক?

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১২৭: রবীন্দ্রনাথের নামে ভিত্তিহীন অভিযোগ, ‘চোখের বালি’ নাকি চুরি করে লেখা

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১১১: পাতিকাক
“স্যর, স্বাধীনতা দিবসের দিনেও পড়তে হবে? রোজ তো পড়ি।”
“আচ্ছা, বলো তো, স্বাধীনতা দিবস কি?”
“এই দিন আমাদের দেশ স্বাধীন হয়েছিল।”
“তার মানে তুমি আমি স্বাধীন দেশের নাগরিক। আজ স্বাধীন বলেই তুমি পড়াশোনা করতে পারছো।”
“কী যে বলেন স্যর, স্বাধীন হলে এখন আমি মাঠে ব্যাট হাতে রান নিচ্ছি। বাবা যেতে বারণ করল, আপনি পড়াতে আসবেন, আমার তো হাত পা বাঁধা।” অভিমানের সুরে চিরাগ বলে।
“একে বলে অনুশাসন। যেমন আমাদের দেশের আইন মেনে আমরা চলি এও তেমন। কিন্তু আজ স্বাধীন বলেই তুমি মাঠে গিয়ে ক্রিকেট খেলে আনন্দ করতে পারবে। যদি সেই যুগে জন্মাতে হয়তো এমন নিশ্চিন্তে পড়াশোনার সুযোগটাই আসতো না। তুমি আমি যে প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখি সেটা কখনও সম্ভব-ই হতো না। আচ্ছা, স্বাধীনতা বলতে তুমি কি বোঝো বলো তো?”
“আচ্ছা, বলো তো, স্বাধীনতা দিবস কি?”
“এই দিন আমাদের দেশ স্বাধীন হয়েছিল।”
“তার মানে তুমি আমি স্বাধীন দেশের নাগরিক। আজ স্বাধীন বলেই তুমি পড়াশোনা করতে পারছো।”
“কী যে বলেন স্যর, স্বাধীন হলে এখন আমি মাঠে ব্যাট হাতে রান নিচ্ছি। বাবা যেতে বারণ করল, আপনি পড়াতে আসবেন, আমার তো হাত পা বাঁধা।” অভিমানের সুরে চিরাগ বলে।
“একে বলে অনুশাসন। যেমন আমাদের দেশের আইন মেনে আমরা চলি এও তেমন। কিন্তু আজ স্বাধীন বলেই তুমি মাঠে গিয়ে ক্রিকেট খেলে আনন্দ করতে পারবে। যদি সেই যুগে জন্মাতে হয়তো এমন নিশ্চিন্তে পড়াশোনার সুযোগটাই আসতো না। তুমি আমি যে প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখি সেটা কখনও সম্ভব-ই হতো না। আচ্ছা, স্বাধীনতা বলতে তুমি কি বোঝো বলো তো?”
আরও পড়ুন:

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৮৭: শুধু মুখে ধর্মের বুলি আওড়ালেই কেউ ধার্মিক হয়ে যায় না

ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৭০: ত্রিপুরায় বারবার দেশের ইংরেজ শাসন বিরোধী মানসিকতার প্রতিফলন ঘটেছে
“সত্যি বলব স্যর, আপনার কাছেই বলতে পারি, ক্লাসের মনিটরকে ম্যানেজ করে টয়লেট যাবো বলে বেরিয়ে পড়তে পারা আর মাঝেমধ্যে বন্ধুদের সঙ্গে সিনেমা আর চিকেনরোল।”
তপনের হাসি পায়। হাসতে গিয়েও মুখটা গম্ভীর করে রাখে। বাবা মাঝেমধ্যে রাত করে ফিরলে দাদাকে কথা শোনায়, স্বাধীনতা আর স্বেচ্ছাচারের মধ্যে পার্থক্য আছে। দাদা এত রাত পর্যন্ত কী যে করে কে জানে। সারা দিন তো ঘরেই বসে থাকে, সন্ধ্যে হলে পাড়ার মোড়ের আড্ডা, বাবা এখন আর দাদার সঙ্গে কথা বলে না।
চিরাগের ডাকে সম্বিত ফেরে। জানালার ওপারে রোদটার মধ্যে একটা ছায়া দুলছে। আলোটা হঠাত্ করে যেন কমে আসে।
তপনের হাসি পায়। হাসতে গিয়েও মুখটা গম্ভীর করে রাখে। বাবা মাঝেমধ্যে রাত করে ফিরলে দাদাকে কথা শোনায়, স্বাধীনতা আর স্বেচ্ছাচারের মধ্যে পার্থক্য আছে। দাদা এত রাত পর্যন্ত কী যে করে কে জানে। সারা দিন তো ঘরেই বসে থাকে, সন্ধ্যে হলে পাড়ার মোড়ের আড্ডা, বাবা এখন আর দাদার সঙ্গে কথা বলে না।
চিরাগের ডাকে সম্বিত ফেরে। জানালার ওপারে রোদটার মধ্যে একটা ছায়া দুলছে। আলোটা হঠাত্ করে যেন কমে আসে।
আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১২৫: আজও আধুনিক সমাজ রাজা দুষ্মন্তের তঞ্চকতা এবং দ্বিচারিতার দূষণমুক্ত নয়

রহস্য রোমাঞ্চের আলাস্কা, পর্ব-৬৩: অগত্যা আমার গাড়িতে বন্ধুদের নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম আলাস্কা ভ্রমণে
“নাও, নাও বইটা খোলো। যে অঙ্কটা আগের দিন আটকে গেল সেটা দিয়েই শুরু করো।”
“আচ্ছা স্যর…”
“আর গল্প নয়, সকলে ভাববে মাস্টারমশাই গল্প করে কাটিয়ে দিচ্ছে। আচ্ছা বলো, কী বলছো। একটাই প্রশ্ন।”
“বলছি, স্যর, আপনি স্বাধীনতা বলতে কি বোঝেন?”
তপন থমকে যায়। তাই তো, কাকে বলে স্বাধীনতা? অনেক অনেক কথাই তো শোনা যায়। নিজের কথা বলতে পারার অধিকার, খেয়ে পরে বাঁচার অধিকার, নারীমুক্তি, মানবাধিকার, পারস্পরিক বিদ্বেষ, ঘৃণা, সংকীর্ণ চিন্তাভাবনা থেকে মুক্ত একটা সমাজ, যেখানে সকলে সুস্থ ভাবে বাঁচবে, যোগ্য মর্যাদা, সম্মান পাবে, মুক্ত চেতনা ভালোকে ভালো, খারাপকে খারাপ বলতে শেখাবে, মানতে শেখাবে, যেখানে তর্ক আর ঝগড়ার ফারাক বোঝার সামর্থ্য থাকবে সেটাই তো স্বাধীন দেশ। এই স্বাধীনতা কষ্টার্জিত, একে অর্জন করা কঠিন, রক্ষা করা আরও বেশি কঠিন।
“আচ্ছা স্যর…”
“আর গল্প নয়, সকলে ভাববে মাস্টারমশাই গল্প করে কাটিয়ে দিচ্ছে। আচ্ছা বলো, কী বলছো। একটাই প্রশ্ন।”
“বলছি, স্যর, আপনি স্বাধীনতা বলতে কি বোঝেন?”
তপন থমকে যায়। তাই তো, কাকে বলে স্বাধীনতা? অনেক অনেক কথাই তো শোনা যায়। নিজের কথা বলতে পারার অধিকার, খেয়ে পরে বাঁচার অধিকার, নারীমুক্তি, মানবাধিকার, পারস্পরিক বিদ্বেষ, ঘৃণা, সংকীর্ণ চিন্তাভাবনা থেকে মুক্ত একটা সমাজ, যেখানে সকলে সুস্থ ভাবে বাঁচবে, যোগ্য মর্যাদা, সম্মান পাবে, মুক্ত চেতনা ভালোকে ভালো, খারাপকে খারাপ বলতে শেখাবে, মানতে শেখাবে, যেখানে তর্ক আর ঝগড়ার ফারাক বোঝার সামর্থ্য থাকবে সেটাই তো স্বাধীন দেশ। এই স্বাধীনতা কষ্টার্জিত, একে অর্জন করা কঠিন, রক্ষা করা আরও বেশি কঠিন।
আরও পড়ুন:

সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-৯ : মণিহারা: করিডর, সেজবাতি আর…

আলোকের ঝর্ণাধারায়, পর্ব-১১০: মা সারদার মানবীলীলার অবসান
কী বলবে ভেবে পায় না তপন। তারপর বলে, “আমরা কি সত্যিই স্বাধীন এটা সমাজমাধ্যমে কপি-পেস্ট না করে আমি কী পারি আর কী পারি না সেটা বোঝার আত্মশক্তি অর্জন আমার কাছে স্বাধীনতা। নিজেকে চেনার জন্য নিজেকে নিজের অধীনে আনা। অন্যের চোখে নিজেকে না দেখে নিজের চোখে নিজেকে জানা। নিজের ভুলত্রুটিগুলো মেনে নিয়ে নিজেকে আরও কাছ থেকে চেনা, বোঝা, জানা ও মানা। এই তো, ব্যস, তবেই তো অঙ্ক মিলবে। নাও, খাতাটা খোলো।”
মাইকে পতাকা উত্তোলনের স্লোগান শোনা যায়, আরও দূরের মাইকে গান ভেসে আসে
“আমরা রয়েছি সেই সূর্যের দেশে/ লীলা চঞ্চল সমুদ্রে অবিরাম/ গঙ্গা যমুনা ভাগিরথী যেথা মেশে/ ভারতবর্ষ : সূর্যের এক নাম।”
মাইকে পতাকা উত্তোলনের স্লোগান শোনা যায়, আরও দূরের মাইকে গান ভেসে আসে
“আমরা রয়েছি সেই সূর্যের দেশে/ লীলা চঞ্চল সমুদ্রে অবিরাম/ গঙ্গা যমুনা ভাগিরথী যেথা মেশে/ ভারতবর্ষ : সূর্যের এক নাম।”
* ড. অভিষেক ঘোষ (Abhishek Ghosh) সহকারী অধ্যাপক, বাগনান কলেজ। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগ থেকে স্নাতকস্তরে স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত। স্নাতকোত্তরের পর ইউজিসি নেট জুনিয়র এবং সিনিয়র রিসার্চ ফেলোশিপ পেয়ে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগে সাড়ে তিন বছর পূর্ণসময়ের গবেষক হিসাবে যুক্ত ছিলেন। সাম্বপুরাণের সূর্য-সৌরধর্ম নিয়ে গবেষণা করে পিএইচ. ডি ডিগ্রি লাভ করেন। আগ্রহের বিষয় ভারতবিদ্যা, পুরাণসাহিত্য, সৌরধর্ম, অভিলেখ, লিপিবিদ্যা, প্রাচ্যদর্শন, সাহিত্যতত্ত্ব, চিত্রকলা, বাংলার ধ্রুপদী ও আধুনিক সাহিত্যসম্ভার। মৌলিক রসসিক্ত লেখালেখি মূলত: ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে। গবেষণামূলক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়ে চলেছে বিভিন্ন জার্নাল ও সম্পাদিত গ্রন্থে। সাম্প্রতিক অতীতে ডিজিটাল আর্ট প্রদর্শিত হয়েছে আর্ট গ্যালারিতে, বিদেশেও নির্বাচিত হয়েছেন অনলাইন চিত্রপ্রদর্শনীতে। ফেসবুক পেজ, ইন্সটাগ্রামের মাধ্যমে নিয়মিত দর্শকের কাছে পৌঁছে দেন নিজের চিত্রকলা। এখানে একসঙ্গে হাতে তুলে নিয়েছেন কলম ও তুলি। লিখছেন রম্যরচনা, অলংকরণ করছেন একইসঙ্গে।


















