
নীল গলা বসন্ত বৌরি।
ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ। শীত পাততাড়ি গুটিয়ে চম্পট দিলেও তার সামান্য রেশ রেখে গিয়েছে। ফলে না-গরম, না-ঠান্ডা চমৎকার আবহাওয়া। বসন্তও হাজির হয়ে গিয়েছে। তাই রোববারের সকালটা সেদিন ছিল খুব লোভনীয়। ঝকঝকে সূর্যের নরম রোদ আমার বাড়ির সামনে রাস্তার ওপারে বড় পাতাওয়ালা মেহগিনি (Swietenia macrophylla) গাছগুলোর ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়েছে। শালিকদুটো সামনের বাড়ির প্যারাপেটে বসে ক্যাঁচ-কোঁচ করে মনে হয় সারাদিনের কাজের পরিকল্পনা আঁটছে। নারকেল গাছের নিচে আর পাঁচিলের উপর ছাতারেগুলো সমানে চ্যাঁচাচ্ছে আর নেচে চলেছে। আর আমার জানালার ঠিক সামনে ইলেকট্রিক তারের উপর স্বামী-স্ত্রী ঘুঘু দুটো চুপচাপ বসে রয়েছে। দেখে মনে হয় ঘুমের রেশ এখনও কাটেনি! পাছে তাদের আলস্য কেউ দেখে ফেলে তাই মনে হয় তারা মাঝে মাঝে এদিক-ওদিক তাকাচ্ছে। প্রাতঃকালীন চা পানের সঙ্গে এমন মনোরম দৃশ্য উপভোগের সুযোগ একটুও হারাতে রাজি ছিলাম না। বেশ তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করছিলাম রোববারের সকালটা। এমন সময় কানে এল লোহার উপর মৃদু শব্দে হাতুড়ি পেটানোর আওয়াজ। আওয়াজটা আসছে সামনে মেহগিনি গাছের ভিতর থেকে। এ আওয়াজ আমার অপরিচিত নয়। গ্রামের বাড়িতে থাকার সময় এমন শব্দ অনেকবার শুনেছি। কিন্তু মাঝে বহুদিন এ শব্দ শুনিনি। আমার কান আর চোখ শব্দকে অনুসরণ করতে লাগল। দোতলার ড্রয়িংরুমের জানালার সোজাসুজিই ওই গাছ, ফলে দেখার অসুবিধা হবার কথা নয়। আবার মেহগিনি গাছটা শীতে বাৎসরিক আবর্জনা ঝরিয়ে ফেলে তখনও পূর্ণ পল্লবিত হয়নি। ফলে কচি পাতার ফাঁক-ফোকর দিয়ে আমার দৃষ্টি প্রসারিত করার খুব একটা সমস্যা হচ্ছিল না। একঘেয়ে জোরালো টুক-টুক-টুক-টুক শব্দটা হয়েই চলেছে। বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হল না। পাতার ফাঁকে দেখা গেল ছোট্টো সবুজরঙা পাখিটাকে। পাতার ফাঁকে ব্যস্তভাবে ছোট ছোট পায়ে লাফিয়ে চলেছে আর নাগাড়ে ডেকে চলেছে টুক-টুক-টুক-টুক।
পাখিটা কখনও পাতার আড়ালে চলে যাচ্ছিল, কখনও আংশিক দেখা যাচ্ছিল। তাও আমি সেদিকেই অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইলাম। পাখিটা কিছুক্ষণের জন্য দৃষ্টির আড়ালে চলে যেতে আমি দৃষ্টি ঘোরালাম আশেপাশে, যদি ওর কোনও সঙ্গীকে দেখা যায় এই আশায়। আমার আশা যে সঙ্গে সঙ্গে পূরণ হবে তা কিন্তু ভাবিইনি। ওই মেহগিনি গাছের পাশেই আর একটা অপেক্ষাকৃত কম শাখাওয়ালা একই জাতের মেহগিনি গাছের একটা কেটে নেওয়া শাখার উপর আরও একটা। কাটা শাখার গোড়াটা ফুট দুয়েক লম্বা। ওই কাটা অংশের নীচে থেকে কোনও শাখা না বেরনোয় মনে হয় ওই অংশটা শুকিয়ে গিয়েছে। পাখিটা একমনে শাখাটার তলার দিকে একটা গর্ত বানাচ্ছিল তার মোটাসোটা চঞ্চু দিয়ে। ব্যাপারটা বেশ আকর্ষণীয়। ইঞ্চি দুয়েক ব্যাসের গোলাকার গর্তটার গভীরতা তখনও বেশি হয়নি। পাখিটা তার রঙিন মাথা একবার গর্তের মধ্যে ঢোকাচ্ছিল, পরক্ষণেই চঞ্চুতে কাঠের গুঁড়ো বার করে এনে বাইরে ফেলে দিচ্ছিল। প্রত্যেকবার গর্তে মাথা ঢোকানোর আগে ডাইনে-বাঁয়ে মাথা ঘুরিয়ে চারপাশটা একবার দেখে নিচ্ছিল। পুরো ব্যাপারটা দেখে মনে হল ডালের গায়ে গর্ত করে বাসা বানানোর ব্যাপারে ওর বেশ তাড়া আছে! আমি জানতাম মেহগিনি গাছের কাঠ খুব শক্ত। কিন্তু এত সাবলীলভাবে সে গর্ত বানাচ্ছিল যে আমার মনে হয় ওই ডালটা শুধু শুকিয়েই যায়নি, পচে বেশ নরম হয়ে গিয়েছে। প্রায় তিন মিনিট এভাবে গর্ত খোঁড়ার কাজ চলল। তারপর কাজের বিরতি। কাজ ছেড়ে সে ডালের ওপর দিকে চলে গেল। তারপর পুরো ডালটা এক চক্কর দিয়ে ফের চলে এল গর্তের কাছে। তারপর আবার একইভাবে গর্ত বানানোর কাজ। ইতোমধ্যে পাশের গাছে থাকা জুড়ি পাখিটাকে আর দেখতে পেলাম না। কোনদিকে গেছে আমি খেয়াল করিনি দ্বিতীয় পাখিটার কান্ডকারখানা দেখতে গিয়ে। ওদিকে দ্বিতীয় পাখিটা নিষ্ঠার সঙ্গে তার কাজ করে চলেছে। মিনিট তিনেক পর আবার বিরতি। আবার সেই ঘুরপাক। এমন সময় একটু দূরে জামগাছের দিক থেকে আবার সেই টুক-টুক-টুক-টুক। প্রথম পাখিটার ডাকই হবে। দ্বিতীয় পাখিটাকে কি ডাক দিল? সে ফুরুৎ করে উড়ে গেল জাম গাছটার দিকে।
আরও পড়ুন:

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১১৩: ভাবনা উইদাউট ভদ্কা

বিখ্যাতদের বিবাহ-বিচিত্রা, পর্ব-১৭: একাকিত্বের অন্ধকূপ/২: অন্ধকারের উৎস হতে
এই পাখি দুটো আমার খুব চেনা চেনা লাগল। সুন্দরবনের বসতি এলাকায় এর ডাক প্রায়শই শোনা যায়। কিন্তু কী নাম মাথায় আসছিল না। বহুদিন আগে, মানে স্কুলে পড়ার সময় মাঝে মাঝে গ্রামের বাড়িতে আমাদের আম, আমড়া, অর্জুন বা সজনে গাছে পাতার আড়ালে ঘোরাফেরা করতে দেখেছি আর ওই মৃদু স্বরে হাতুড়ি-পেটার মতো শব্দ টুক-টুক-টুক-টুক শুনেছি। সময়ের ধুলো জমে গিয়েছে স্মৃতির উপর। কিছুক্ষণ স্মৃতি হাতড়ে সেই ধুলো কিছুটা সাফ করতেই মনে পড়ে গেল নামটা—বসন্ত বৌরি।
বসন্ত বৌরি পাখি রূপে অতুলনীয়। তার বর্ণময়তা নয়নমনোহর। সারা পিঠ, ডানা, লেজ ও পেটের রঙ সবুজ। তবে পেটের সবুজ রঙ সামান্য ফিকে। চোখের উপর ও নিচে এবং গলায় উজ্জ্বল হলুদ রঙের ছোপ দেখে মনে হয় যেন গায়ে হলুদ মেখে বিয়ের পিঁড়িতে বসার জন্য প্রস্তুত হচ্ছে! কপাল আর বুকে টকটকে লাল ছোপ। চোখের হলুদ ও কপালের লাল ছোপের পেছনে এবং বুকের লাল ছোপের দু’পাশে কালো দাগ ছোপগুলোকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। পালকের কোথাও কোথাও গাঢ় সবুজ রঙ দেখে মনে হবে যেন সবুজ ধান ক্ষেতের মাঝে গাঢ় সবুজ আগাছা জন্মেছে। আবার পেটের হালকা সবুঝের মাঝে রয়েছে কালো রঙের ছিটে। সত্যিই যেন লাল, কালো, সবুজ ও হলুদের মেলা বসেছে বসন্ত-বৌরির সারা শরীর জুড়ে।
বসন্ত বৌরি পাখি রূপে অতুলনীয়। তার বর্ণময়তা নয়নমনোহর। সারা পিঠ, ডানা, লেজ ও পেটের রঙ সবুজ। তবে পেটের সবুজ রঙ সামান্য ফিকে। চোখের উপর ও নিচে এবং গলায় উজ্জ্বল হলুদ রঙের ছোপ দেখে মনে হয় যেন গায়ে হলুদ মেখে বিয়ের পিঁড়িতে বসার জন্য প্রস্তুত হচ্ছে! কপাল আর বুকে টকটকে লাল ছোপ। চোখের হলুদ ও কপালের লাল ছোপের পেছনে এবং বুকের লাল ছোপের দু’পাশে কালো দাগ ছোপগুলোকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। পালকের কোথাও কোথাও গাঢ় সবুজ রঙ দেখে মনে হবে যেন সবুজ ধান ক্ষেতের মাঝে গাঢ় সবুজ আগাছা জন্মেছে। আবার পেটের হালকা সবুঝের মাঝে রয়েছে কালো রঙের ছিটে। সত্যিই যেন লাল, কালো, সবুজ ও হলুদের মেলা বসেছে বসন্ত-বৌরির সারা শরীর জুড়ে।

কোটর থেকে উঁকি দিচ্ছে বসন্ত বৌরির বাচ্চা।
সুখের সঙ্গে যেমন সময়ের বৈরিতা, তেমনই পাখিদের রূপের সাথে মনে হয় আকারেরও বৈরিতা আছে। নইলে অধিকাংশ রূপসী পাখিরা কেন আকারে ছোটো হবে? বসন্ত বৌরির সাইজ প্রায় চড়াই পাখির মতো, কিন্তু মোটাসোটা। লম্বায় হয় মাত্র ১৫-১৮ সেমি, আর ওজন মাত্র ৩০-৫০ গ্রাম। এদের লেজটার আকার ভারি অদ্ভুত। ছোট্টো লেজ। কিন্তু আগার দিকটা দেখে মনে হবে কেউ যেন কাঁচি দিয়ে সমান করে ছেঁটে দিয়েছে। যখন ওরা উড়ে যায় তখন লেজটাকে ত্রিভুজের মতো দেখায়। এদের ওড়া দেখেছি অনেকবার। দ্রুত ডানা ঝাপটে একেবারে সরলরেখা বরাবর ওড়ে। বসন্ত বৌরির দুটো পা বেশ ছোটখাট, আর রং গোলাপি। গাছের ডালের নিচের দিকে পা দিয়ে ডাল আঁকড়ে ঝুলে ঝুলে যখন অনায়াসে গর্ত বানায় তখন বলতেই হয় পা দুটো বেশ শক্তপোক্ত। এদের দুটো খয়েরি রঙা চোখ বেশ ড্যাবাড্যাবা। চোখের সীমানা ধরে যেন লাল রঙের আই-লাইনার লাগানো! এদের ঘাড় শরীরের তুলনায় খাটো হলে কী হবে মাথাটা বেশ বড়। তবে চঞ্চুর কথা আলাদা করে না বললেই নয়। কালো রঙের শক্তপোক্ত চঞ্চুটা যতটা মোটা সেই তুলনায় লম্বা নয়। চঞ্চুর গোড়ায় চারপাশ জুড়ে স্পষ্ট কালো রঙের গোঁফ আছে স্ত্রী ও পুরুষ উভয়েরই।
আরও পড়ুন:

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৭৮: রক্তে ভেজা মাটিতে গড়ে ওঠে সত্যিকার প্রাপ্তি

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১১৩: একটি হিংসা অনেক প্রতিহিংসা, জিঘাংসা, হত্যা এবং মৃত্যুর কারণ হয়ে ওঠে সর্বত্র
বসন্ত বৌরির ইংরেজি নাম কপারস্মিথ বারবেট (Coppersmith Barbet)। তাম্রকার তামার পাতের উপর হাতুড়ি দিয়ে পেটালে যেমন আওয়াজ হয় তেমনই টুক-টুক-টুক-টুক শব্দ করে ওরা ডাকে বলে ওদের এমন নাম। বিজ্ঞানসম্মত নাম ‘Megalaima haemacephala’। হিন্দিতে এদের নাম টুকটুকিয়া বা ছোটা বসন্ত। টুকটুকিয়া নামের পেছনে যে ওদের বৈশিষ্ট্যপূর্ণ ডাকই দায়ী সে কথা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। বাংলায় এদের তাম্রকার বসন্ত বৌরি বললে মন্দ হয় না! বড্ড একঘেয়ে এদের এই ডাক। একটানা অনেকক্ষণ ধরে ডেকে চলে। শব্দ করার সময় ওদের চঞ্চু বন্ধ থাকে, কিন্তু গলার দু’পাশ ফুলে-ফুলে ওঠে। শীতকালে অবশ্য এরা ডাকাডাকি করে না। ঘন জঙ্গল এদের পছন্দ নয়। কাষ্ঠল গাছপালা ভরা এলাকা এদের প্রিয়। তাই সুন্দরবনের গ্রাম ও আধাশহর এলাকায় তো বটেই, অনেক শহুরে এলাকাতেও এদের দেখা মেলে। মাঝে মাঝে বড় গাছের আগার দিকের ডালে সকালবেলা পাশাপাশি লাইন দিয়ে একাধিক বসন্ত বৌরিকে বসে থাকতে দেখা যায়। বট, অশ্বত্থ ও ডুমুর গাছ যেখানে আছে তার আশেপাশেই বসন্ত বৌরির দেখা মেলার সম্ভাবনা বেশি, কারণ বট, অশ্বত্থ ও ডুমুরের ফল ওদের সবচেয়ে প্রিয় খাবার। এজন্য মাঝে মাঝে ওদের বট, অশ্বত্থ বা ডুমুর গাছে অন্য অনেক ফলাহারী পাখিদের সঙ্গে একসঙ্গে পাকাফলের ভোজে মেতে উঠতে দেখা যায়। অবশ্য সময় বিশেষে ওদের ফুলের পাপড়ি এবং পোকা-মাকড় ধরে খেতেও দেখা যায়।

বসন্ত বৌরি।
ভারত, বাংলাদেশ, নেপাল, পাকিস্তানসহ প্রায় পুরো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ও দক্ষিণ-পশ্চিম চিনে বসন্ত বৌরির বাসস্থান। বাসা বানানোর জন্য এরা গাছের মরা ও শুকনো ডালকে বেছে নেয়। ভারতে ফেব্রুয়ারি থেকে এপ্রিল হল এদের প্রজননকাল। স্ত্রী ও পুরুষ উভয় পাখি মিলিতভাবে গাছের অনুভূমিক কোনও শুকনো ডালে গর্ত তৈরি করে বাসা বানায়। তারপর স্ত্রী পাখি বাসায় ৩টি সাদা ও অনুজ্জ্বল ডিম পাড়ে। ডিমের গায়ে কোনও ছিট দাগ থাকে না। এরা সাধারণতঃ কাছাকাছি দু’তিনটে ডালে গর্ত করে বাসা বানায়। একটা গর্তে ডিম পাড়ে, আর অন্য গর্তে রাতে বিশ্রাম নেয়। এদের একটা বৈশিষ্ট্য হল স্ত্রী ও পুরুষ আলাদা আলাদা গর্তে বিশ্রাম নেয়। যাইহোক, স্ত্রী ও পুরুষ বসন্ত বৌরি পালা করে ১৩-১৬ দিন ডিমে তা দেওয়ার পর ডিম ফুটে ছানারা বেরিয়ে আসে। বাচ্চারা প্রথম প্রথম বাসার গর্তেই থাকে। এই সময় মা ও বাবা বসন্ত বৌরি বাচ্চাদের খাওয়ানোর দায়িত্ব পালন করে। বাচ্চাদের বট, অশ্বত্থ বা ডুমুরের পাকা ফল এনে খাওয়ায়। গর্তের বাইরে বসে গর্ত দিয়ে খাবারসহ মুখটা সে ঢুকিয়ে দিয়ে বাচ্চাদের খাবার খাওয়ায়। এরা এত ভীতু পাখি যে কয়েক সেকেন্ড পরেই মাথাটা বার করে নিয়ে চারপাশটা একবার দেখে নেয়। তারপর আবার গর্তে মাথা ঢোকায়। মাঝে মাঝে গর্তের ভেতর থেকে ওদের খাবারের অবশিষ্টাংশ ও বাচ্চাদের বর্জ্য চঞ্চু দিয়ে নিয়ে এসে গর্তের বাইরে ফেলতে দেখা যায়। বাচ্চাদের পরিচ্ছন্নতার ব্যাপারে এরা সদাসতর্ক। ডিমে তা দেওয়া শুরু করার প্রায় ৩৬ দিন পর ওরা ওড়ার উপযুক্ত হয়ে ওঠে। বাচ্চা উড়তে না-শেখা পর্যন্ত তার পরিচর্যার ভার বাবা-মা পাখির। কিন্তু উড়তে শিখলেই স্বনির্ভর হতে হয়।
আরও পড়ুন:

আলোকের ঝর্ণাধারায়, পর্ব-৯৭: শ্রীমার কথায় ‘ঠাকুরের দয়া পেয়েচ বলেই এখানে এসেচ’

রহস্য রোমাঞ্চের আলাস্কা, পর্ব-৫৫: সর্বত্র বরফ, কোত্থাও কেউ নেই, একেবারে গা ছমছম করা পরিবেশ
আরও একপ্রকার বসন্ত বৌরি আমি ছোটবেলায় গ্রামে থাকার সময় থেকে দেখেছি। বলা ভালো, তাম্রকার বসন্ত বৌরির চেয়ে বেশিই দেখেছি। এরা আকারে শালিক পাখির মতো। লম্বায় প্রায় ২৩-২৮ সেমি, আর ওজন হয় ৭৫-১০০ গ্রাম। এদের বেশি দেখতে পেতাম আমাদের বাগানে আম পাকলে। ওদের পাকা আম ঠোক্কর দিয়ে খেতে দেখেছি। বেশ বড়ো বড়ো অনেকগুলো আমগাছ ছিল আমাদের গ্রামের বাড়িতে। ফলে প্রতি বছর গ্রীষ্মে ওদের দেখতে পেতাম। এমনিতে এদের দেখতে পাওয়া খুব মুশকিল কারণ এদের গায়ের রঙের সঙ্গে পাতার রং একেবারে মিশে যায়। কিন্তু ওদের দেখতে পেতাম ওদের ডাক শুনে। ঘন পাতার আড়ালে বসে কুটরু-কুটরু-কুটরু করে একটানা অনেকক্ষণ ডেকে যেত। এদের গলা, বুক ও চোখের দু’পাশে অনেকটা জায়গা জুড়ে অপূর্ব আকাশী-নীল বা তুঁতে রঙের সমারোহের জন্য এদের নাম দেওয়া হয়েছে নীলগলা বসন্ত বৌরি, ইংরেজিতে ‘Blue-throated Barbet’। বিজ্ঞানসম্মত নাম ‘Megalaima asiatica’। সার্থকনামা সন্দেহ নেই।

গাছে কোটর তৈরিতে ব্যস্ত নীল গলা বসন্ত বৌরি।
রূপের তুলনা করলে তাম্রকার বসন্ত বৌরির চেয়ে নীলগলা বসন্ত বৌরি কিঞ্চিৎ বেশি নম্বর পাবে। কারণটা ওই আকাশী-নীল বা তুঁতে রঙের উপস্থিতি। পিঠ ও ডানার রং টিয়া পাখির মতো সবুজ। তবে পেটের রঙ হলুদাভ-সবুজ। কপাল আর মাথার চাঁদির রঙ টকটকে লাল। তবে কপাল আর চাঁদির মধ্যে বিভাজন করেছে একটা কালো ডোরা দাগ। দাগটা চাঁদির লাল অংশের দু’পাশ দিয়ে পেছনের দিকে বিস্তৃত হয়েছে। গলার তুঁতে রঙের ছোপের দু’পাশে রয়েছে দুটো লাল ফোঁটা। মোটা চঞ্চুর আগার দিকটা ধূসর আর গোড়ার দিকটা হলুদ। তাম্রকার বসন্ত বৌরির মতো এরও চঞ্চুর গোড়ায় অনেক শক্ত রোমওয়ালা গোঁফ আছে। পায়ের রঙ ধূসর। চোখের তারার রং লাল, আর চোখের চারিদিকে ঘিরে আছে লাল রঙের বলয়। বড়োদের তুলনায় কচিকাচাদের রঙের চাকচিক্য সামান্য কম। নইলে তাম্রকার বসন্ত বৌরিদের মতো এদেরও চেহারা দেখে স্ত্রী-পুরুষ আলাদা করে বোঝার উপায় নেই।
আরও পড়ুন:

সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-৯৭: পাতি সরালি

পঁচিশে বৈশাখ
ঘন গাছপালাসমৃদ্ধ এলাকা নীলগলা বসন্ত বৌরিদের পছন্দ। তাম্রকার বসন্ত বৌরিদের যে সব দেশে দেখা যায় এদেরও সেখানে দেখা যায়। এদের বেশি দেখা যায় বসন্তকাল থেকে বর্ষার শুরু পর্যন্ত, কারণ এই সময়েই ওদের ডাকাডাকি শোনা যায়। খাবারদাবার ও স্বভাব তাম্রকার বসন্ত বৌরিদের মতোই। মার্চ থেকে জুলাই প্রজননকাল। মাটি থেকে ১.৫-৮ মিটার উচ্চতার মধ্যে ওরা বাসা বানায়। কখনও কখনও কাঠঠোকরাদের ফেলে যাওয়া বাসাকেও ওরা প্রজননের জন্য ব্যবহার করে। স্ত্রী পাখি বাসায় ৩/৪টে সাদা রঙের ডিম পাড়ে। প্রায় দু’সপ্তাহ পালা করে স্ত্রী ও পুরুষ পাখি ডিমে তা দেয়। তারপর ছানারা বেরিয়ে এলে তাদের ভরণ-পোষনের ভার যথারীতি বাবা-মায়ের উপরই বর্তায়। তবে ৩০-৪০ দিনের মধ্যে বাচ্চারা উড়তে শিখে গেলে তাদের দেখভালের জন্য বাবা-মায়ের আর কোনও দায় থাকে না।

খাবার সংগ্রহরত নীল গলা বসন্ত বৌরি।
নীলগলা বসন্ত বৌরিও অনেকদিন পর দেখেছিলাম আট বছর আগে মে মাসের এক নিদাঘ দ্বিপ্রহরে। স্নান সেরে ছাদে গিয়েছিলাম ভেজা গামছা ও লুঙ্গি মেলতে। হঠাৎ কানে এল ‘কুটরু-কুটরু-কুটরু’ ডাক। এ ডাক বড়ো চেনা। ঘাড় ঘোরাতেই দেখি একাকী এক নীলগলা বসন্ত বৌরি পাশের বাড়ির ঝাউগাছের মগডালে বসে ডেকে চলেছে। রোদের তীব্রতায় ছাদে দাঁড়িয়ে থাকা যাচ্ছিল না। তাই সরে এসে চিলেকোঠা থেকে ওকে দেখতে থাকলাম। মিনিট দু’ইয়েক সে একইভাবে ডেকে চলল। তারপর ক্ষণিক থামল। আর তারপর দ্রুত ডানা কাঁপিয়ে স্বভাবসিদ্ধ সরলরৈখিক উড্ডয়ন। চলে গেল আমার দৃষ্টির আড়ালে। মনটা খুশিতে ভরে উঠেছিল অনেকদিন পর ওকে দেখে। তারপর থেকে প্রতি বছর বসন্ত ও গ্রীষ্মে প্রতিদিন নীল গলা বসন্ত বৌরির একঘেয়ে বিরক্তিকর ডাক কানে আসে—কুটুরু কুটুরু কুটুরু। আমার পেয়ারা ও আম গাছে ওরা প্রায়শই আসে পাকা পেয়ারা ও আম খেতে। প্রতিটি ফল একটুখানি করে খেয়ে চলে যায়!
তাম্রকার ও নীলগলা বসন্ত বৌরিরা সুন্দরবনের বসতি এলাকা থেকে হারিয়ে যায়নি বলে বেশ আস্বস্ত হয়েছি। কিন্তু ওদের সংখ্যা যে কমেছে সে ব্যাপারে কোনও সন্দেহ নেই। যদিও IUCN এই দুই প্রজাতির বসন্ত বৌরিকে ‘ন্যূণতম বিপদগ্রস্ত’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এরা ভারতীয় বন্যপ্রাণ সংরক্ষণ আইনের (১৯৭২) চতুর্থ শিডিউলে সংরক্ষিত। তবে তাম্রকার ও নীলগলা বসন্ত বৌরির সংখ্যা কমে যাওয়ার পেছনে আমার মতে নিশ্চিত কারণ হল এলাকায় বট, অশ্বত্থ ও ডুমুর গাছের সংখ্যা কমে যাওয়া এবং শক্ত কাঠের আকাশমণি, মেহগনি, শিশু ইত্যাদি গাছের প্রাধান্য। পাশাপাশি বৃক্ষচ্ছেদন ও নগরায়নের মতো স্বাভাবিক সমস্যা তো আছেই। একদিকে খাদ্যাভাব, অন্যদিকে বাসস্থানের অভাব—এই দুই অভাবের তাড়নায় বসন্ত বৌরিরা আজ সুন্দরবনের বসতি এলাকায় বিপন্ন। স্বাভাবিক পরিবেশ রক্ষা করতে না পারলে হয়তো একদিন বসন্ত পার হয়ে গ্রীষ্ম, বর্ষা চলে গিয়ে ঢাকের বাদ্যি শোনা যাবে কিন্তু বসন্ত বৌরিদের ডাক শোনা যাবে না। প্রকৃতির এই বর্ণময় বিহঙ্গকে রক্ষার দায়িত্ব কি আমাদের নয়?—চলবে।
তাম্রকার ও নীলগলা বসন্ত বৌরিরা সুন্দরবনের বসতি এলাকা থেকে হারিয়ে যায়নি বলে বেশ আস্বস্ত হয়েছি। কিন্তু ওদের সংখ্যা যে কমেছে সে ব্যাপারে কোনও সন্দেহ নেই। যদিও IUCN এই দুই প্রজাতির বসন্ত বৌরিকে ‘ন্যূণতম বিপদগ্রস্ত’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এরা ভারতীয় বন্যপ্রাণ সংরক্ষণ আইনের (১৯৭২) চতুর্থ শিডিউলে সংরক্ষিত। তবে তাম্রকার ও নীলগলা বসন্ত বৌরির সংখ্যা কমে যাওয়ার পেছনে আমার মতে নিশ্চিত কারণ হল এলাকায় বট, অশ্বত্থ ও ডুমুর গাছের সংখ্যা কমে যাওয়া এবং শক্ত কাঠের আকাশমণি, মেহগনি, শিশু ইত্যাদি গাছের প্রাধান্য। পাশাপাশি বৃক্ষচ্ছেদন ও নগরায়নের মতো স্বাভাবিক সমস্যা তো আছেই। একদিকে খাদ্যাভাব, অন্যদিকে বাসস্থানের অভাব—এই দুই অভাবের তাড়নায় বসন্ত বৌরিরা আজ সুন্দরবনের বসতি এলাকায় বিপন্ন। স্বাভাবিক পরিবেশ রক্ষা করতে না পারলে হয়তো একদিন বসন্ত পার হয়ে গ্রীষ্ম, বর্ষা চলে গিয়ে ঢাকের বাদ্যি শোনা যাবে কিন্তু বসন্ত বৌরিদের ডাক শোনা যাবে না। প্রকৃতির এই বর্ণময় বিহঙ্গকে রক্ষার দায়িত্ব কি আমাদের নয়?—চলবে।
* সৌম্যকান্তি জানা। সুন্দরবনের ভূমিপুত্র। নিবাস কাকদ্বীপ, দক্ষিণ ২৪ পরগনা। পেশা শিক্ষকতা। নেশা লেখালেখি ও সংস্কৃতি চর্চা। জনবিজ্ঞান আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত। বিজ্ঞান জনপ্রিয়করণের জন্য ‘দ্য সায়েন্স অ্যাসোসিয়েশন অফ বেঙ্গল ২০১৬ সালে ‘আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু মেমোরিয়াল অ্যাওয়ার্ড’ এবং শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞান লেখক হিসেবে বঙ্গীয় বিজ্ঞান পরিষদ ২০১৭ সালে ‘অমলেশচন্দ্র তালুকদার স্মৃতি সম্মান’ প্রদান করে সম্মানিত করেছে।


















