
বাড়িতে রেডিয়ো বাজতো নিয়ম করে। সকাল হলেই নানা গানের পথ বেয়ে বেয়ে কফি হাউসের আড্ডাটা, সুন্দর বনের সুন্দরী গাছ, কিংবা তখন তোমার একুশ… তারপর একসময় স্থানীয় সংবাদ। পর পর চলতে থাকতো, ব্যাটারি কমে আসতো, তারপর ফুরিয়ে যেত দিনে দিনে। গানগুলো তখন শেষবেলার প্রলম্বিত ছায়ার মতো এলিয়ে পড়তে চাইতো, কথাগুলোয় একটা কষ্ট পাকিয়ে পাকিয়ে উঠতো রেডিওর ভিতর থেকে। পরে আবার তাজা ব্যাটারি পেলে হেসে উঠতো তারা।
মহালয়ার আগে আগে তাই একটু স্বাস্থ্যপরীক্ষা করে নিতেই হতো। ভোররাত আশ্বিনের শিশির মেখে এলিয়ে পড়ে আছে ফুটপাতের আলোর নিচে। দূরে কুয়াশার জটলা। অসুরবধের খবর পৌঁছবে খানিক পরেই। তারপর একসময় রাতশেষের অনেক ঘুম পেরিয়ে জেগে উঠতো “যা চণ্ডী মধুকেটভাদিদৈত্যদলনী”… অ্যালার্ম বাজতো, কেউ কেউ পাশ ফিরে ডুব দিতো আরো গভীরে। বাইরে তখন ভোররাতের শিউলি ঝরে পড়ছে একে একে টুপটাপ। কেউ কেউ তখন-ই নিদ্রাসুরকে বধ করে ধীর পায়ে পৌঁছে যাচ্ছে চায়ের জল চড়াতে। অকালবোধন। একটা ঠাণ্ডা হালকা বাতাস পাক খেতে খেতে নেমে আসে আকাশ বেয়ে— ‘ধরণীর বহিরাকাশে অন্তরিত মেঘমালা, প্রকৃতির অন্তরাকাশে জাগরিত জ্যোতির্ময়ী জগন্মাতার আগমন-বার্তা।’
ব্যাকরণের বইতে সমাসের অধ্যায়। মাতা চ পিতা চ। সমাসে দ্বন্দ্ব হল দুয়ের। হল নতুন শব্দ “পিতরৌ”… এই হল যুগলরূপের অভিজ্ঞান। অন্নদামঙ্গলে ভারতচন্দ্র জানাচ্ছেন যে, অন্নপূর্ণা ভবানন্দের গৃহে যাওয়ার সময়ে ঈশ্বরী পাটনীকে আত্মপরিচয় দিয়েছেন দ্ব্যর্থবোধক ভাষায়। তাঁর “অতি বড় বৃদ্ধপতি” দেবাদিদেব কেমন? “কুকথায় পঞ্চমুখ কণ্ঠে ভরা বিষ/ কেবল আমার সঙ্গে দ্বন্দ্ব অহর্নিশ।।”
ব্যাকরণের বইতে সমাসের অধ্যায়। মাতা চ পিতা চ। সমাসে দ্বন্দ্ব হল দুয়ের। হল নতুন শব্দ “পিতরৌ”… এই হল যুগলরূপের অভিজ্ঞান। অন্নদামঙ্গলে ভারতচন্দ্র জানাচ্ছেন যে, অন্নপূর্ণা ভবানন্দের গৃহে যাওয়ার সময়ে ঈশ্বরী পাটনীকে আত্মপরিচয় দিয়েছেন দ্ব্যর্থবোধক ভাষায়। তাঁর “অতি বড় বৃদ্ধপতি” দেবাদিদেব কেমন? “কুকথায় পঞ্চমুখ কণ্ঠে ভরা বিষ/ কেবল আমার সঙ্গে দ্বন্দ্ব অহর্নিশ।।”
আরও পড়ুন:

গল্পবৃক্ষ, পর্ব-৭১ : ঘটজাতক/৬ : যারে তুমি নীচে ফেল

উপন্যাস: আকাশ এখনও মেঘলা/ ৯১

এআই যুগেও উপনিষদের আবেদন অমলিন, কেন?

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৮৮: প্রতিপক্ষ অন্ধকার
তাঁরা সেই দ্বান্দ্বিক মিলনে মূর্ত হন অর্ধনারীশ্বর-রূপে। পাটনী অবশ্য বুঝেছিল অন্যরকম। তবে সংঘাতের অর্থেও তো সেই মিলনের ভাবটিই থাকে। শাস্ত্রীয় নির্দেশনা জানাবে যে, যাঁরা দেহী থেকে বিদেহী হয়ে বৃহত্তর আধারে আশ্রয় নিয়েছেন, সেই পুণ্যাত্মা পিতৃপুরুষগণের প্রতি সঞ্চিত কর্তব্যের মহাক্ষণ এই মহালয়া। শরীরী অস্তিত্ব, দেহরথ জীর্ণ হয় কালে কালে। আত্মা ধারণ করবেন নতুন দেহ, পূর্বজীবনের কর্মফল ভোগের পর। এই তত্ত্ব বহুবিস্তৃত, আস্তিক্যবাদীর জিজ্ঞাসা ও তত্ত্বান্বেষণের পথে এরপর বহু বাঁক, পাকদণ্ডীর পাক। সদ্য ঘুম-ভাঙা মানুষটির সুষুপ্তি কাটে? সত্যের আলোটুকু জ্বলে ওঠে জীবন্মৃত হতচেতন কিংবা সত্যধর্মার মনের কোণে? কে জানে!
তখন বীরেন্দ্রকৃষ্ণ মন্দ্রস্বরে বলে চলছেন,
“ত্বং স্বাহা ত্বং স্বধা ত্বং হি বষট্কারঃ স্বরাত্মিকা/ সুধা ত্বমক্ষরে নিত্যে ত্রিধা মাত্রাত্মিকা স্থিতা।।”
তখন বীরেন্দ্রকৃষ্ণ মন্দ্রস্বরে বলে চলছেন,
“ত্বং স্বাহা ত্বং স্বধা ত্বং হি বষট্কারঃ স্বরাত্মিকা/ সুধা ত্বমক্ষরে নিত্যে ত্রিধা মাত্রাত্মিকা স্থিতা।।”
আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৭৯: রাজসূয়যজ্ঞে চেদিপতি শিশুপাল ও কুরুপ্রধান ভীষ্মের কথোপকথনে সদর্থক ও নঞর্থক চিন্তার সংঘাত,মহাকাব্যে প্রতিফলিত জীবনবোধ

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-১০৮: স্তাবক-পরিবেষ্টিত রাজা কেবল অন্ধই হন না, নিজের দুর্গেই জ্যান্ত সেদ্ধ হন!
ওঙ্কারময়ী, নিত্য অক্ষরস্বরূপা, হবির্দানের স্বাহামন্ত্ররূপা, পিতৃগণের প্রতি দ্রব্যদানের স্বধামন্ত্ররূপা, দেবতার আহ্বানের বষট্মন্ত্রস্বরূপা, অমৃতরূপা দেবীর আগমনবার্তা শোনান তিনি। ধ্যানগম্ভীর বিশ্ব তাঁর অনুধ্যানেই আনন্দমুখর হবে। মহাবিশ্বে মহাকাশে মহাকালমাঝে একাকী মানবের সম্মিলিত আনন্দযজ্ঞের জীবনগীতটি জীবনের পঞ্চমহাযজ্ঞের উপলব্ধি, সকৃতজ্ঞ প্রণতি, ত্যাগ ও বৃহত্তর বোধে ক্রমে ক্রমে প্রদীপ্ত হবে। পূর্ণ হবে। শোকোত্তীর্ণ আনন্দস্বরূপ হওয়ার পথের অনন্তগামী বিনম্রচিত্ত আলোকযাত্রী এই অলৌকিক আলোর ভোরে স্মরণ করবেন “পিতরি প্রীতিমাপন্নে প্রীয়ন্তে সর্বদেবতাঃ”।
আরও পড়ুন:

জন্মশতবর্ষে উত্তমকুমার : শতফুল বিকশিত হোক

শ্রদ্ধাঞ্জলি : সঙ্গীতই আমার ফার্স্ট লাভ : শচীন দেববর্মণ
দেবী জাগছেন। দেবী জাগবেন। পিতৃপক্ষ শেষ হয়ে যাচ্ছে। ফুরিয়ে যাওয়া রাতের তারার বিদায়গাথা তারপর আশ্বিনের শারদপ্রাতে আগমনীর আনন্দগান হয়ে বেজে উঠবে। জীবনের ভাঙা পথের রাঙা ধুলো শিশিরে স্নান সেরে ভোরের শিউলি হবে। আজ, এখন অমর্ত্যলোক মহালয়ার ভোরে মৃত্যুকুটিল ধূলিমলিন মর্ত্যে নামবে চুপি চুপি।
“সবকটা জানালা খুলে দাও, কেউ যেন ভুল করে গেয়ো নাকো মন-ভাঙা গান।”
মহালয়ার ক্রান্তিকালে গঙ্গার ঘাটে ঘাটে ভিড় জমে তর্পণের। পিতৃপক্ষের ভোরে আসন্ন উৎসবের আলোর বেণুর সুর রেডিও থেকে রেকর্ডার হয়ে কত শত মাধ্যমে ঘুরে-ফিরে বেড়ায় বহু পথ পাড়ি দিয়ে দিয়ে। নবতর প্রজন্মের সমাজমাধ্যম থেকে নবতিপরের “স্মৃতিপিপীলিকার” বয়ে আনা “মৃত মাধুরীর কণায়” সেই তরঙ্গ আলোড়ন তোলে। শুভাশুভের চিরকালের দ্বন্দ্বের শেষে শোণিতস্নানে আসন্ন দেবীপক্ষে মহা-অভ্যুদয় ঘটবে জ্যোতির্ময়ী জগন্মাতার। মহালয়ার ভোর নিষ্কলুষ শুদ্ধ শোকের। পিতৃতর্পণে দিনে দিনে বেড়ে চলা ঋণ স্বীকার করে জগৎ জগজ্জননীর আগমনী গান গাইবে।
“সবকটা জানালা খুলে দাও, কেউ যেন ভুল করে গেয়ো নাকো মন-ভাঙা গান।”
মহালয়ার ক্রান্তিকালে গঙ্গার ঘাটে ঘাটে ভিড় জমে তর্পণের। পিতৃপক্ষের ভোরে আসন্ন উৎসবের আলোর বেণুর সুর রেডিও থেকে রেকর্ডার হয়ে কত শত মাধ্যমে ঘুরে-ফিরে বেড়ায় বহু পথ পাড়ি দিয়ে দিয়ে। নবতর প্রজন্মের সমাজমাধ্যম থেকে নবতিপরের “স্মৃতিপিপীলিকার” বয়ে আনা “মৃত মাধুরীর কণায়” সেই তরঙ্গ আলোড়ন তোলে। শুভাশুভের চিরকালের দ্বন্দ্বের শেষে শোণিতস্নানে আসন্ন দেবীপক্ষে মহা-অভ্যুদয় ঘটবে জ্যোতির্ময়ী জগন্মাতার। মহালয়ার ভোর নিষ্কলুষ শুদ্ধ শোকের। পিতৃতর্পণে দিনে দিনে বেড়ে চলা ঋণ স্বীকার করে জগৎ জগজ্জননীর আগমনী গান গাইবে।
আরও পড়ুন:

দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-২৯ : নয়া ভুবনের প্রজাপতি

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৬৮: চন্দ্রবোড়া
কোনও বিস্মৃত অতীতে শোক থেকে জেগেছিল আদিশ্লোক। তত্ত্ববিৎ জানাবেন যে, নানাবিধ রসে কারুণ্য অনিবার্য, অনপনেয়, অদ্বিতীয়। তার সংবেদন থেকেই জেগে ওঠে অলৌকিক আনন্দের ভার।
মহালয়া শোকের যাপন। তার সঙ্গে দুর্গাপুজো কিংবা “মহিষাসুরমর্দিনী”র প্রত্যক্ষ কোনো যোগ না থেকেও আপাতঃ কোনো এক যোগসূত্র আনন্দ-উত্সবমুখী মানুষের প্রাণে-মনে রচিত হয়েছে কালে কালে। মাস, তিথি, পক্ষ, আচার, সংস্কারের শাস্ত্রীয় অনুশাসন ও কালানুসারী বিধানের বহুবিস্তৃত ক্ষেত্রের বাইরে দাঁড়িয়ে আজ এই ক্রান্তিকাল মানবাত্মার আসা যাওয়ার পথের ধারে চিরকালের কাঁদা-হাসার, সকৃতজ্ঞ স্মৃতিবেদনার ভার বহন করতে করতে বীতশোক হয়ে ওঠার মহাক্ষণ।
মহালয়া শোকের যাপন। তার সঙ্গে দুর্গাপুজো কিংবা “মহিষাসুরমর্দিনী”র প্রত্যক্ষ কোনো যোগ না থেকেও আপাতঃ কোনো এক যোগসূত্র আনন্দ-উত্সবমুখী মানুষের প্রাণে-মনে রচিত হয়েছে কালে কালে। মাস, তিথি, পক্ষ, আচার, সংস্কারের শাস্ত্রীয় অনুশাসন ও কালানুসারী বিধানের বহুবিস্তৃত ক্ষেত্রের বাইরে দাঁড়িয়ে আজ এই ক্রান্তিকাল মানবাত্মার আসা যাওয়ার পথের ধারে চিরকালের কাঁদা-হাসার, সকৃতজ্ঞ স্মৃতিবেদনার ভার বহন করতে করতে বীতশোক হয়ে ওঠার মহাক্ষণ।
* ড. অভিষেক ঘোষ (Abhishek Ghosh) সহকারী অধ্যাপক, বাগনান কলেজ। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগ থেকে স্নাতকস্তরে স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত। স্নাতকোত্তরের পর ইউজিসি নেট জুনিয়র এবং সিনিয়র রিসার্চ ফেলোশিপ পেয়ে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগে সাড়ে তিন বছর পূর্ণসময়ের গবেষক হিসাবে যুক্ত ছিলেন। সাম্বপুরাণের সূর্য-সৌরধর্ম নিয়ে গবেষণা করে পিএইচ. ডি ডিগ্রি লাভ করেন। আগ্রহের বিষয় ভারতবিদ্যা, পুরাণসাহিত্য, সৌরধর্ম, অভিলেখ, লিপিবিদ্যা, প্রাচ্যদর্শন, সাহিত্যতত্ত্ব, চিত্রকলা, বাংলার ধ্রুপদী ও আধুনিক সাহিত্যসম্ভার। মৌলিক রসসিক্ত লেখালেখি মূলত: ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে। গবেষণামূলক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়ে চলেছে বিভিন্ন জার্নাল ও সম্পাদিত গ্রন্থে। সাম্প্রতিক অতীতে ডিজিটাল আর্ট প্রদর্শিত হয়েছে আর্ট গ্যালারিতে, বিদেশেও নির্বাচিত হয়েছেন অনলাইন চিত্রপ্রদর্শনীতে। ফেসবুক পেজ, ইন্সটাগ্রামের মাধ্যমে নিয়মিত দর্শকের কাছে পৌঁছে দেন নিজের চিত্রকলা। এখানে একসঙ্গে হাতে তুলে নিয়েছেন কলম ও তুলি। লিখছেন রম্যরচনা, অলংকরণ করছেন একইসঙ্গে।














