কলকাতায় বৃষ্টি

'দেয়া নেয়া' ছবিতে 'হৃদয়হরণ'।

ইতিহাসে নানা যুগের ভাগ থাকে। প্রস্তর, তাম্র, ব্রোঞ্জ কিংবা স্বর্ণ। এই যেযন গুপ্তযুগ কি সত্যিই স্বর্ণযুগ? তবে বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এরকম নানা যুগবিভাগের গুপ্তকথা আছে কি না তা তাত্ত্বিকরা জানবেন। কিন্তু ‘স্বর্ণযুগ’ যে ছিল তা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই, কারণ উত্তমকুমার ছিলেন, অনেকের সঙ্গেই।

কাব্যতত্ত্বে প্রথমশ্রেণীর কাব্যকে উত্তমকাব্য বলা হয়। আবার ব্যাকরণে উত্তমপুরুষ হল ‘আমি’র অভিজ্ঞান। বাঙালির জাতীয় আত্মপরিচয়ে অনেককিছুই স্থান করেছে। এর মধ্যে দুর্গাপুজো, রসগোল্লা, ইলিশ-চিংড়ি, ইস্ট-মোহন, রবীন্দ্র-নজরুল, ঋত্বিক-সত্যজিৎ, সুভাষ-বিবেকানন্দ প্রমুখ, ইত্যাদি, প্রভৃতির ভিড়ে অনিবার্য হয়ে উঠেছেন উত্তমকুমার। তাঁর শ্রেষ্ঠত্বের অভিজ্ঞান হল তাঁর অভিধা—মহানায়ক। নায়ক অনেকেই হন। কিন্তু তিনিই উত্তম, তিনিই বাংলা সিনেমার প্রথমপুরুষ। নায়ক কিংবা নেতা নিয়ে চলেন। ব্যক্তি অরুণকুমার ‘উত্তম’ হয়ে বাংলা চলচ্চিত্রের একটি সময়কালকে যে উচ্চতায় নিয়ে গেছেন, নিজেকে যে গন্তব্যে উত্তীর্ণ করে গিয়েছেন সেই হৃদয়পুরে তাঁর স্থায়ী আসন আজও অমলিন, তাঁর জন্মের একশো বছরেও।
একশো বছরে অনেক খ্যাতকীর্তি মানুষ-ই বিস্মৃত হন। আলোকবৃত্তে থাকা হয়ে ওঠে না অনেকের। উত্তমকুমার কী ছিলেন, কী ছিলেন না তা ফিল্মের আলোচকরা বলবেন। তবে তিনি নিজেই যেন এক আলোকবৃত্ত ছিলেন, হয়ে আছেন এ নিয়ে খুব বেশি মতভেদ হয়তো থাকবে না। সিনেমার ফ্রেমে তিনি এলেই সেই আলো জ্বলে ওঠে। তাই তিনি ভাস্বর হয়ে আছেন। তাঁর জীবন, তাঁর নায়কসত্তা, তাঁর আসা কিংবা যাওয়ার অধ্যায়গুলি তো সিরিয়াস বিদগ্ধ নানা আলোচনায় উঠে আসে। কিন্তু “যাওয়া তো নয় যাওয়া” যে একটা কথার কথা নয় কেবল, তা যাঁরা প্রতিটি মুহূর্তে প্রমাণ করে চলেন, তাঁদের অন্যতম তিনি, উত্তমকুমার, বাঙালির ব্যক্তি থেকে সমষ্টিজীবনে তিনিই উত্তম, তিনিই প্রথম, শুরুর কথা, শেষের কথা।

কায়দা করে বললে বলা যায় যে একশোতেও তিনি একাই একশো কিংবা একশোয় একশো। কিন্তু ভেবে দেখলে মনে হয় দর্শকের বিচারে আর ভালবাসায় কোনো সংখ্যাতত্ত্বে তাঁর বিচার কেবল একটা আনুষ্ঠানিকতা কেবল। তাঁর স্থান আরো ওপরে বোধহয়। তিনি বাঙালির শ্রেষ্ঠ ম্যাটিনি আইডল। কালের কষ্টিপাথর তার বিচার করে নিয়েছে।
আরও পড়ুন:

জন্মশতবর্ষে উত্তমকুমার : শতফুল বিকশিত হোক

সংস্কৃত দিবস

এই দেশ এই মাটি, ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-১১১ : কবি রাজার বিবসনা রমণীর চিত্রাঙ্কন / ৪

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৭৪: সোনার হরিণ কোথায় নেই? আছে সর্বত্র

কোনও ছবিতে তিনি উত্তম, কোনওটায় মধ্যম, কোনওটিতেই বা প্রথম এসব ভাবনা বিশেষজ্ঞদের। সাধারণ সিনেমামোদী দর্শকের দৃষ্টিতে তিনি অনন্য। এর নেপথ্যে যুক্তির থেকে আবেগ, মস্তিষ্কের থেকে হৃদয়ের যোগ বেশি বলে অনেকেই ইতস্ততঃ করবেন। কিন্তু নানা ভূমিকায় পর্দায় আলো জ্বালার কাজটিই যাঁর পেশা, তিনি সেই আলোর ইন্ধনটুকু মস্তিষ্ক থেকে না হৃদয় থেকে না কি দুটি থেকেই সঞ্চালিত করছেন সেটি আর ততো গুরুত্বপূর্ণ থাকে না বোধহয়, যখন আলোটি অনির্বাণ হয়।

তাঁকে প্রথম দেখেছি টিভির পর্দায়। তারপর টিভির জগৎ বড় হয়েছে। টিভি রঙিন হয়েছে। পর্দাও ছোট হতে হতে পকেটে প্রবেশ করেছে। তবুও পর্দায় তিনি এলেই বিরাট। কেন তাঁকে ভাল্লাগে? অভিনয়? রোম্যান্স কিংবা রোম্যান্টিকতার শেষ কথা বলে? নাগরিক নায়ক বলে? নাগরিক হয়েও গাঁয়ের মাটির দাওয়ায় অনায়াস বলে? যে ভূমিকায় সর্বস্ব উজাড় করে দিচ্ছেন সেখানে তাঁকেই অপরিহার্য অনিবার্য মনে হচ্ছে বলে? নাকি তাঁর হাসি, তাঁর তাকানো, তাঁর অভিনয়ের খুঁটিনাটি, অথবা সচ্ছন্দ সাবলীল বুদ্ধিদীপ্ত, সর্বাঙ্গসুন্দর, চোখজোড়ানো উপস্থিতিতে জ্বলে থাকা সেই আলো-র জন্য তাঁকে ভাল লাগে?

চোখে লেগে থাকেন তিনি। এই মনে হবে আদ্যন্ত সাহেব সেজে নিখুঁত পদক্ষেপে তিনি চলে গেলেন লিফটের দিকে। নয়তো বা, সব্যসাচী হয়ে জাহাজঘাটা পেরোচ্ছেন কিংবা অগ্নীশ্বর হয়ে রোগীকে ধমকাচ্ছেন। আবার অ্যান্টনি ফিরিঙ্গী কিংবা চিড়িয়াখানার ছদ্মবেশী জাপানি সাহেব যখন অন্যত্র নায়িকাকে নিয়ে মোটরবাইকে ছুটে চলেন অনন্তের দিকে, তখন? সেই অমলিন আলোটাই জ্বলতে থাকে পর্দায়।
আরও পড়ুন:

রহস্য উপন্যাস: হ্যালো বাবু!, পর্ব-১৫০: হার্ড ড্রাইভ হত্যারহস্য / ৩০

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-১০৮: স্তাবক-পরিবেষ্টিত রাজা কেবল অন্ধই হন না, নিজের দুর্গেই জ্যান্ত সেদ্ধ হন!

‘রাইকমল’-র রঞ্জন, ‘ওরা থাকে ওধারে’-র চঞ্চল, “শাপমোচন”-র মহেন্দ্র, ‘সবার উপরে’-র শঙ্কর, ‘সাগরিকা’র অরুণ অথবা ‘সাহেব বিবি গোলাম’-র ভূতনাথ কিংবা ‘হারানো সুর’-র অলক হয়ে তিনি পর্দায় যে মায়া রচনা করেন, সেখানে বাস্তব-অবাস্তব ইত্যাদি হিসেব নিকেশের বাইরে যা জেগে থাকে তা হল নিখাদ ভাল লাগা মেশানো বিস্ময়। গত শতাব্দীর অনেকগুলো দশক পার হয়ে সেই বিস্ময়ের ভাব এই শতাব্দীর একটি পাদ পার হয়েও অটুট। এর রহস্য উন্মোচিত হলে সেই ভাবটি আর থাকে না। তাই তা অধরা-ই থেকে যায়।

তিনি যখন ট্রেনের কামরায় বসে বিপরীতে থাকা জনৈকের প্রশ্নের মৃদু উত্তর করেন, “কী করি বলুন, কানে যে শুনতে পাই” এরকম জাতীয় কিছু, তখন তিনি নেহাত্ সামান্য মানুষ, অর্থের বিনিময়ে মহিলা যাত্রীর পাহারায় থাকেন, সম্ভব অসম্ভব নানা কথা শুনে যান নির্বিকার হয়ে, তিনিই আবার ডাক্তারির ছাত্র, কিংবা ডাক্তার, কিংবা ধুরন্ধর প্রতারক, লম্পট জমিদার, কিংবা এই হয়তো ছোট্ট খোকাবাবুর পিছনে ঘুরে বেড়ানো বোকাসোকা নিবেদিতপ্রাণ চিরভৃত্য, কিংবা ছদ্মবেশে পুলিশ বিভাগের গোয়েন্দা বনাম প্রেমিক, অথবা এই হয়তো রিক্সাওয়ালাকে পিছনে বসিয়ে প্যাডেলে চাপ দেবেন।

অথবা ‘মরুতীর্থ হিংলাজের’ বিকারগ্রস্ত পুণ্যার্থী পিরুমল, ‘সাথীহারার’ দেহাতি কুন্দন, ‘ভ্রান্তিবিলাসের’ চিরঞ্জীব ও চিরঞ্জিৎ, ‘থানা থেকে আসছি’র এস আই তিনকড়ি। মনে হবে এখনই হয়তো হাসতে হাসতে ঝাঁপিয়ে পড়বেন খাদের অতলে, কিংবা অতলে তলিয়ে গিয়েছে যারা তাদের বিবেক হয়ে জেগে উঠবেন কোনো বৃষ্টির সন্ধ্যায়। ‘সবরমতী’র শঙ্কর যেমন সৎ নির্ভীক, তেমন-ই ‘কখনো মেঘের’ সি আই ডি অশোক ওরফে নারায়ণ। এরা সমাজের যেকোনও শ্রেণিতে থেকে একটা পচে যাওয়া, বিকৃত, বিকারগ্রস্ত সমাজের বুকে সেই আলোটাই জ্বেলে রাখে পর্দায়।
আরও পড়ুন:

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৮২: ডাবল ধামাকা

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৬৪: গোখরো

যা হতে পারে, যা হলে ভাল হতো, যা হওয়া উচিত ছিল, যা হতে চেয়েছে সেই সময়, দেশ-কাল, তার প্রতিভূ হয়ে ‘কমললতা’র শ্রীকান্ত, ‘সূর্যতপা’র দীপেন্দ্র, ‘রাজকন্যা’র জয়ন্ত, ‘দেয়া নেয়া’র হৃদয়হরণ ওরফে প্রশান্ত ওরফে অভিজিৎ, ‘সপ্তপদী’র কৃষ্ণেন্দু, ‘বিলম্বিত লয়ে’র মৃগাঙ্ক ধরা দেন। এছাড়াও ‘জয়জয়ন্তী’, ‘বনপলাশীর পদাবলী’, ‘কায়াহীনের কাহিনি’, ‘যদি জানতেম’, ‘অমানুষ’, ‘মৌচাক’, ‘আমি সে ও সখা’, ‘প্রিয় বান্ধবী’, ‘সন্ন্যাসী রাজা’, ‘বাঘবন্দী খেলা’, ‘আনন্দ আশ্রম’ ইত্যাদি ছবির শেষে “শেষ হয়ে শেষ না হওয়ার” আমেজ ছড়িয়ে রাখেন তিনি প্রজন্মের পর প্রজন্ম।

রোম্যান্টিক নায়ক সত্তার বাইরেও তিনি ‘শেষ অঙ্ক’ ছবিতে মুখোশধারী এলিট অপরাধী, যিনি ‘সূর্যতোরণ’ ছবিতে আর্কিটেক্ট হয়ে অসুন্দর অমানবিক বহুতল ধ্বংস করে ধরা দেন রাষ্ট্রের কাছে, ‘শহরের ইতিকথা’য় গান ধরেন, তিনিই ‘রাজদ্রোহী’র প্রতাপ হয়ে ধনীর সম্পদ লুঠে নিয়ে বিলিয়ে দেন দরিদ্রের মাঝে। যিনি ‘হারানো সুরে’র নায়ক, তিনিই আবার ‘চিড়িয়াখানা’য় ব্যোমকেশ। সেই আলোকস্তম্ভ জ্বলতেই থাকে।
আরও পড়ুন:

দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-২৯ : নয়া ভুবনের প্রজাপতি

এআই যুগেও উপনিষদের আবেদন অমলিন, কেন?

‘দেবদাসে’র চুনীবাবু কিংবা ‘বাঘবন্দী খেলা’র রাজনীতিক ভবেশ ব্যানার্জি, ‘নিশিপদ্মে’ অনঙ্গ যিনি, তিনিই সত্যের প্রতিভূ ব্যারিস্টার পি কে বাসু “যদি জানতেম” ছবিতে। তিনিই কখনও কমললতা’র শ্রীকান্ত, গৃহদাহে’র মহিম, ‘জতুগৃহে’ শতদল কিংবা ‘নায়কে’ অরিন্দম। কখনও মনে হয় না যে এই চরিত্রটিই অন্য ছবির কোনো চরিত্রের ওপিঠ। দর্শক চাইলে পাবেন এলিট থেকে অসহায় নিঃসম্বল— যেকোনও ভূমিকায় আলো ছড়ানো একজন নিপুণ অভিনেতাকে, চাইলে পান তাঁর নায়ককে, অথবা চরিত্রের নাম পরিচয়ের বাইরে তাঁর গুরু ‘উত্তমকুমার’কে।

সারাজীবনে তাঁর কাজ এখনো সোনার তরীতে ভেসে বেড়ায় বিনোদনের দুনিয়ায়। একশো বছর পেরিয়েও সেই তরী ছুটছে। হৃদয়সম্রাট কি বলে উঠবেন “তোমরা বিশ্বাস করো, আমি রাজা হতে আসিনি?”, নাকি “আই উইল গো টু দ্য টপ দ্য টপ দ্য টপ” নাকি” এই পথ যদি না শেষ হয়?” কে জানে! তবে বিমুগ্ধ দর্শক হয়তো তাঁর প্রেয়সীকে নির্জন দুপুরের গোপন প্রেমে আর্জি জানাবেন “একবার বলো উত্তমকুমার”।
* ড. অভিষেক ঘোষ (Abhishek Ghosh) সহকারী অধ্যাপক, বাগনান কলেজ। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগ থেকে স্নাতকস্তরে স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত। স্নাতকোত্তরের পর ইউজিসি নেট জুনিয়র এবং সিনিয়র রিসার্চ ফেলোশিপ পেয়ে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগে সাড়ে তিন বছর পূর্ণসময়ের গবেষক হিসাবে যুক্ত ছিলেন। সাম্বপুরাণের সূর্য-সৌরধর্ম নিয়ে গবেষণা করে পিএইচ. ডি ডিগ্রি লাভ করেন। আগ্রহের বিষয় ভারতবিদ্যা, পুরাণসাহিত্য, সৌরধর্ম, অভিলেখ, লিপিবিদ্যা, প্রাচ্যদর্শন, সাহিত্যতত্ত্ব, চিত্রকলা, বাংলার ধ্রুপদী ও আধুনিক সাহিত্যসম্ভার। মৌলিক রসসিক্ত লেখালেখি মূলত: ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে। গবেষণামূলক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়ে চলেছে বিভিন্ন জার্নাল ও সম্পাদিত গ্রন্থে। সাম্প্রতিক অতীতে ডিজিটাল আর্ট প্রদর্শিত হয়েছে আর্ট গ্যালারিতে, বিদেশেও নির্বাচিত হয়েছেন অনলাইন চিত্রপ্রদর্শনীতে। ফেসবুক পেজ, ইন্সটাগ্রামের মাধ্যমে নিয়মিত দর্শকের কাছে পৌঁছে দেন নিজের চিত্রকলা। এখানে একসঙ্গে হাতে তুলে নিয়েছেন কলম ও তুলি। লিখছেন রম্যরচনা, অলংকরণ করছেন একইসঙ্গে।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content