শনিবার ২৯ মার্চ, ২০২৫


এই সেই উজ্জ্বল সবুজ মেরুজ্যোতি। ছবি: অঙ্কনা চৌধুরী।

আলাস্কায় চূড়ান্ত শীতের কষ্ট বা অন্ধকার রাতের সমস্ত ভয় দূরে সরে যায় যখন ওই অন্ধকারের বুক চিরে চলে যায় উজ্জ্বল সবুজ মেরুজ্যোতি। আর ঠিক তখনই মনে হয় এই যাবতীয় ভয়, কষ্ট, অসহনীয়তা সব কিছু মেনে নেওয়া যায় তার জন্য। তার সর্পিল তরঙ্গায়িত গতি কে জানে মহাবিশ্বের কোনও প্রান্ত থেকে কার বার্তা বহন করে আনছে। সময় কালের কোনও এক অসীম বক্রতা থেকে বা হয়তো সমান্তরাল আরেক মহাবিশ্বের থেকে উদ্ভূত হয়ে যেন মাঝে মাঝে চলে আসছে এই দুনিয়ার নজরে। অথবা হয়তো এই সেই শিবশঙ্কর নটরাজ যিনি নিজের মাথার সমস্ত জটা খুলে মত্ত প্রলয় নৃত্যে। দক্ষযজ্ঞের শেষে বিদ্রোহী নটরাজ যেন স্বর্গ মর্ত্য পাতাল সব খান খান করে চলে যাচ্ছেন। আর তাঁর সেই তাল যেন পৃথিবীর এই প্রান্তে এসে মিলে যায় আমার বাংলার বিদ্রোহী কবির সৃষ্টিতে: ‘জগদীশ্বর ঈশ্বর আমি পুরুষোত্তম সত্য।… আমি তাথিয়া তাথিয়া মথিয়া ফিরি এ স্বর্গ পাতাল মর্ত্য’।
ফেয়ারব্যাঙ্কস এবং তার পার্শ্ববর্তী এলাকায় মেরুজ্যোতি দেখা যায় প্রায় সারা বছর। কখনও তার তীব্রতা বেশি হয়, আবার কখনও কম পার্থক্য এইটুকুই। তবে গ্রীষ্মকালে সবসময় আলো থাকার কারণে তা দেখা যায় না। শীতকালে দিনের বেশিরভাগটাই অন্ধকার থাকার কারণে তাকে দেখার যায় বেশি। আবার মেঘলা থাকলে মেরুজ্যোতি দেখাই যায় না। তীব্রতা মাঝারি থেকে বেশি থাকলে আমার বাড়িতে বসেই প্রতি রাতেই মেরুজ্যোতি দেখা যায়।
আরও পড়ুন:

রহস্য রোমাঞ্চের আলাস্কা, পর্ব-২২: সেদিন গাড়ি থেকে নেমে যে দীর্ঘশ্বাস ছেড়েছিলাম, তার অনুভূতির রেশ চিরকাল মনে থাকবে!

আলোকের ঝর্ণাধারায়, পর্ব-৩৫: মা সারদার ভ্রাতৃবিয়োগ

দশভুজা, সরস্বতীর লীলাকমল, পর্ব-১৩: ইন্দিরা দেবী—ঠাকুরবাড়ির আলো!

আমার স্ত্রী প্রতি রাতে শুতে যাওয়ার আগে একবার করে ঘরের বড় জানলাটা দিয়ে দেখে নেন যে দেখা যাচ্ছে কিনা। যদি খুব ভালো দেখা যায় সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয় ছবি তোলার পালা। মাঝে মাঝেই দেখছি। মুখে বলছিও যে মেরুজ্যোতি এখন আমাদের কাছে বাঙালির দী-পু-দা অর্থাৎ দীঘা, পুরী, দার্জিলিং। অথচ যখনই দেখা যায়, তখনই মনে হয় যেন আবার নতুন করে দেখছি। ঠিক যেমন ছোটবেলায় কোথাও যাওয়ার কথা হলেই চলে যেতাম এই তিনটে জায়গার মধ্যেই কোথাও একটা। যতই দেখি ততই বেশি ভালো লাগে। মুখে বলছি যে এখন ভিড় বেড়ে গিয়েছে, আগের মতো আর নেই, এর পরে আর যাব না। অথচ, কোথাও যেতে হলেই প্রথমেই ওই দী-পু-দা। এই মেরুজ্যোতিও এখন ঠিক তাই। রোজই দেখছি। ভাবছি আর নতুন কিছুই তো নেই, তবুও রোজ আকাশে এলেই খুব ভালো লাগে।
আরও পড়ুন:

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-৮১: কবির ‘গানের ভাণ্ডারী’ দিনেন্দ্রনাথ বৈষয়িক-কারণে শান্তিনিকেতন ত্যাগ করেছিলেন

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-৫২: রামচন্দ্রের বনবাসগমনের সিদ্ধান্তে নৈতিকতার জয়? নাকি পিতার প্রতি আনুগত্যের জয় ঘোষণা?

এই দেশ এই মাটি, পর্ব-৩৭: সুন্দরবনের নদীবাঁধের ভবিতব্য

এই মেরুজ্যোতি কীভাবে সৃষ্টি হয় তাই নিয়ে প্রচুর পৌরাণিক কাহিনি আছে। সারা পৃথিবীর সমস্ত আর্কটিক অঞ্চলেই (যেমন, আলাস্কা, গ্রিনল্যান্ড, নরওয়ে, ফিনল্যান্ড ইত্যাদি) নিজেদের লোক-সংস্কৃতি আর পুরাণের সঙ্গে মিলিয়ে চলে বিভিন্ন রকমের কাহিনি। তবে সমস্ত কাহিনিতেই সাধারণত আমি দেখেছি, এই মহাজাগতিক কর্মকাণ্ডকে মৃত আত্মাদের কোনও না কোনও কর্মকাণ্ডের সঙ্গে মিলিয়ে দেওয়া হয়। যেমন গ্রিনল্যান্ডে ভাবা হয় যে এ হল, মৃত আত্মাদের কোনও এক মহাজাগতিক খেলা। আবার নরওয়েজিয়ান কিছু উপকথায় একে বর্ণনা করা হয়েছে, মৃত শিশুদের আত্মা হিসেবে। আলাস্কা অঞ্চলের আদি বাসিন্দা, যাঁদের চলিত ভাষায় আলাস্কান, এস্কিমো বলা হয় তাঁদেরও এমন কাহিনি রয়েছে। তাঁরা এই মেরুজ্যোতিকে বলেন, আকসানিরক, অর্থাৎ মৃত আত্মাদের নাচ।

সরস্বতী পুজোয়। ছবি: অঙ্কনা চৌধুরী।

আলাস্কার ওই আদি বাসিন্দাদের মতে, মৃত আত্মারা মশাল বা টর্চ জ্বালিয়ে দিগন্তের এই প্রান্ত থেকে ওই প্রান্তে চলে যাচ্ছে অন্যান্য আত্মা যারা এখনও পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে উঠতে পারেনি তাদের পথপ্রদর্শন করতে করতে। আবার এই অঞ্চলের অন্যন্য কিছু আদিবাসী পুরাণের মতে, এ হল মৃত আত্মাদের নিছক প্রমোদ বিনোদন। তাঁরা ওয়ালরাস নামের এক জলচর জীবের খুলি নিয়ে খেলেন। এককালে এখানকার অধিবাসীদের এক প্রধান খাদ্য ছিল ওয়ালরাস। সম্ভবত সেখান থেকেই এই ওয়ালরাস পুরাণে জায়গা পেয়েছে। —চলবে।
* রহস্য রোমাঞ্চের আলাস্কা (Mysterious Alaska) : ড. অর্ঘ্যকুসুম দাস (Arghya Kusum Das) অধ্যাপক ও গবেষক, কম্পিউটার সায়েন্স, ইউনিভার্সিটি অব আলাস্কা ফেয়ারব্যাঙ্কস।

Skip to content