
ছবি: প্রতীকী। সংগৃহীত।
আজকের গানের অনুষ্ঠানের ধরনকে যাঁরা আধুনিক যুগের চাহিদা বলেন ফাদার স্যামুয়েল তাঁদের কাছে জানতে চান চাহিদাটা চর্চার নয় কেন? সুরের নয় কেন? কঠোর সংগীত অনুশীলনের নয় কেন? শাস্ত্রীয় সংগীতের অনুষ্ঠানে তো এই আধুনিকতার আঁচড় লাগেনি। সেখানে তো পুরনো দিনের রীতির পরিবর্তন ঘটেনি। যান্ত্রিক সুবিধা বা উন্নতি তো বাধা নয়, সমস্যাটা আধুনিকতার নামে ফাঁকিবাজির। শরীরের প্রকৃত কুরূপকে ঢাকা দিতে দামি পোশাক-আশাক গয়নাগাটি আর মুখে চোখে সাদা লাল নীল রঙের আঁকিবুঁকির ব্যবহার। বাহ্যিক পরিবর্তন বা কসমেটিক চেঞ্জে অন্তরের গরল ঢাকা যায় না। অনেকখানি গল্পগুজব করলে কম গান গাইতে হয় সেটা সেকালে তাঁরাও জানতেন। কিন্তু তাঁদের এত এত সফল গান ছিল ফাঁকি মারার কথা ভাবতেও পারতেন না। ফাঁকি মারতে তাঁদের তখনও টিকে থাকা মূল্যবোধে লাগতো। এখন ও বালাই নেই! সর্বক্ষেত্রে তাই ফাঁকি মারতে হয়! সেটাই দস্তুর! একলাইন নিজে গেয়ে পরের লাইন দর্শককে দিয়ে গাওয়াতে হয়। এটা বিদেশি কনসার্টের নকল, ফাদারের বয়সী লোকেরা ঠিক ওই রকম গান বাজনার সঙ্গে পরিচিত নন।
সম্প্রতি এ ভাবেই দুটি হারমোনিয়াম নিয়ে একালের দুজন শিল্পীর অনুষ্ঠান। একজন কিছুদিন আগের খুব বিখ্যাত আরেকজন হালের। একজন জ্যেষ্ঠ একজন কনিষ্ঠ। তাঁরা ওই গল্পগুজব-এর মধ্যেই হারমোনিয়াম বাজালেন নিজেরাই নিজেদের বাহবা দিলেন আর গান গাইলেন সব ষাট-সত্তর দশকের। তারপরে জ্যেষ্ঠপুত্র বললেন, “সবাই বলে আগেকার দিন ভালো ছিল এখনটা খারাপ। ঘেঁচু ভালো ছিল মশাই! কোনওদিন দেখেছেন হেমন্ত আর মান্না দে একইসঙ্গে বসে গান গাইছেন। দেখেছেন কখনও সতীনাথ আর শ্যামল মিত্তির পাশাপাশি বসে জলসায় গল্প করতে করতে গাইছেন? এখন সেটা দেখছেন!”
আরও পড়ুন:

উপন্যাস: আকাশ এখনও মেঘলা, পর্ব-৯: আকাশ এখনও মেঘলা

আলোকের ঝর্ণাধারায়, পর্ব-৯o: মা সারদার কথায় ‘ঈশ্বর হলেন বালকস্বভাব’
কথাটা শুনেই ফাদার স্যামুয়েলের মনে হল, তাঁরা ছিলেন একেকজন দিকপাল! এতসব বিখ্যাত কালজয়ী গানের স্রষ্টা তাঁরা। এককভাবে গোটা সন্ধে থেকে রাত গানে ভরিয়ে দিতে পারতেন। গল্প করতে হোত না মশকরা করতে হতো না। সময় কাটানোর ফিকির করতে হতো না তাতে গানের সময় কম পড়ে যেত। কথাগুলো ভেবে নিজের মনে হাসতে হাসতে ফাদার মরিসের কাছে বারে বারে শোনা একটা কোটেশনের কথা মনে এল— “Your life is the fruit of your own doing. You have no one to blame but yourself.”
আরও পড়ুন:

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১০৭: লুকাবো বলি, লুকাবো কোথায়?

রহস্য রোমাঞ্চের আলাস্কা, পর্ব-৫১: রোজই দেখি আলাস্কা পর্বতশৃঙ্গের বাঁ দিকের চূড়া থেকে সূর্য উঠতে
আমেরিকান সাহিত্যিক জোসেফ ক্যাম্পবেলের কথা—ক্যাম্পবেল সাহেব কি বাংলা পুরাণের নীতিবাক্য “যেমন কর্ম তেমন ফল” কখনো শুনেছিলেন?
অমৃতলালের ছোটছেলে দুলালের ছোট ভাই সলিল পড়াশোনায় ভালো ছিল, কিন্তু মাথায় কি যে ভূত চাপল জেনারেল লাইনে পড়াশোনা না করে আইটিআই করল। তারপর হঠাৎ একদিন বলল, এদেশে চাকরির কোন ভবিষ্যৎ নেই, সে আবুধাবি যাচ্ছে। ওখানে গিয়ে প্রথম তিন চার বছর যোগাযোগটা রেখেছিল, কখনও কখনও কিছু টাকাও পাঠিয়েছে। তারপর আর কোনও খোঁজ নেই। দুলালের মা রাগ করে বলতেন, সলিলটা স্বার্থপর ছোট বোনের বিয়ে সংসারের দায়িত্ব এসব এড়িয়ে যাবার জন্য সে পালিয়েছে।
অমৃতলালের ছোটছেলে দুলালের ছোট ভাই সলিল পড়াশোনায় ভালো ছিল, কিন্তু মাথায় কি যে ভূত চাপল জেনারেল লাইনে পড়াশোনা না করে আইটিআই করল। তারপর হঠাৎ একদিন বলল, এদেশে চাকরির কোন ভবিষ্যৎ নেই, সে আবুধাবি যাচ্ছে। ওখানে গিয়ে প্রথম তিন চার বছর যোগাযোগটা রেখেছিল, কখনও কখনও কিছু টাকাও পাঠিয়েছে। তারপর আর কোনও খোঁজ নেই। দুলালের মা রাগ করে বলতেন, সলিলটা স্বার্থপর ছোট বোনের বিয়ে সংসারের দায়িত্ব এসব এড়িয়ে যাবার জন্য সে পালিয়েছে।
আরও পড়ুন:

সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-৯৩: সাত-সহেলি

গল্পবৃক্ষ, পর্ব-২২: নন্দিবিলাস-জাতক: রূঢ়ভাষে কষ্ট কারও করিও না মন
কিন্তু মাকে বলতে না পারলেও দুলালের বারবার মনে হয়েছে সলিল সেখানে গিয়ে কোনওভাবে ফেঁসে গিয়েছে। প্রচুর অর্থের লোভে ছুটে গিয়েছিল, ওখানে গিয়ে নিশ্চিত পাসপোর্ট কেড়ে নিয়েছে। ইচ্ছে থাকলেও ফেরার রাস্তা বন্ধ। এরকম অনেক ঘটনা শোনা যায়, হয়তো সলিলের সঙ্গেও তেমনই কিছু ঘটে গিয়েছে। শোনা যায়, চিনেও নাকি এমন ঘটনা ঘটে।
আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১০৭: সুভদ্রাপুত্র অভিমন্যু ও দ্রৌপদীর পঞ্চ পুত্র, কে বা কারা রইলেন পাদপ্রদীপের আলোয়?

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৭০: বিচারক
বহু বছর আগে আমাদের দেশেও জমিদারেরা বাঁধা মজুর পুষতেন। হিন্দিভাষী অঞ্চলে বিহার, উত্তরপ্রদেশে এঁদের বলা হতো বন্ধুয়া মজদুর। মালিকের কাছে কোনও একটা পুরনো ঋণের দায় থাকত মজুরের মাথায়। সে সর্বতোভাবে মালিকের বশ্যতা মেনে নিতো। সে ধার করেনি তো ধার তার বাবার। আজীবনের জন্য সেই মালিকের পোষা মজুর হয়ে সে কাজ করতে করতে মরত। তার ছেলে হতো বাঁধা মজুর। প্রেমচন্দে’র বিখ্যাত সব গল্প রয়েছে। আসামের আড়কাঠি বা দালালরা এ ভাবেই লোভ দেখিয়ে চা শ্রমিক যোগাড় করে জাহাজে জন্তুর মতো গাদাগাদি করে স্বাধীনতার আগে আসামে চালান করা হতো। ঠিক একই কায়দায় আজ ভারতের বিপুল জনগণের ভয়ংকর দারিদ্র্যের সুযোগ নিয়ে দালালরা বিদেশে মজুর পাঠাচ্ছে। একবার সেখানে পোঁছবার পর তাদের পাসপোর্ট কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। দেশে ফেরার রাস্তা বন্ধ তারা সেখানে মালিকের বদান্যতায় কোনওক্রমে বেঁচে থাকতে থাকতে মরে যাচ্ছে।—চলবে।
* জিৎ সত্রাগ্নি (Jeet Satragni) বাংলা শিল্প-সংস্কৃতি জগতে এক পরিচিত নাম। দূরদর্শন সংবাদপাঠক, ভাষ্যকার, কাহিনিকার, টেলিভিশন ধারাবাহিক, টেলিছবি ও ফিচার ফিল্মের চিত্রনাট্যকার, নাট্যকার। জিৎ রেডিয়ো নাটক এবং মঞ্চনাটক লিখেছেন। ‘বুমেরাং’ চলচ্চিত্রের কাহিনিকার। উপন্যাস লেখার আগে জিৎ রেডিয়ো নাটক এবং মঞ্চনাটক লিখেছেন। প্রকাশিত হয়েছে ‘জিৎ সত্রাগ্নি’র নাট্য সংকলন’, উপন্যাস ‘পূর্বা আসছে’ ও ‘বসুন্ধরা এবং…(১ম খণ্ড)’। এখন লিখছেন বসুন্ধরা এবং…এর ৩য় খণ্ড।