শুক্রবার ২৮ মার্চ, ২০২৫


ছবি: প্রতীকী।

অনেক কাল পূর্বে যখন গান্ধারদেশের রাজগণ তক্ষশিলায় বাস করছেন তখন বোধিসত্ত্ব গোজন্ম লাভ করেছিলেন। তিনি যখন নিতান্তই শিশু, তখন গোবৎসটিকে এক ব্রাহ্মণ জনৈক দাতার থেকে দক্ষিণারূপে লাভ করেছিলেন। সেই ব্রাহ্মণের আলয়ে অতি যত্নে পুষ্টিকর আহার্যে তিনি পুত্রনির্বিশেষে প্রতিপালিত হতে থাকলেন, তাঁর নাম হল নন্দিবিলাস।

নন্দিবিলাসরূপী বোধিসত্ত্ব ক্রমে প্রাপ্তবয়স্ক হলেন। তিনি মনে মনে ভাবলেন যে, তাঁর পালক ব্রাহ্মণ অতি কষ্টে রক্ষণাবেক্ষণ করেছেন। সমগ্র জম্বুদ্বীপে তাঁর তুল্য বলশালী ভারবাহী গো দুটি নেই। তাই নিজের বলের পরিচয় দিয়ে এই ব্রাহ্মণের প্রত্যুপকার করা যেতে পারে। এমনভাবে প্রতিদানের ইচ্ছে করে বোধিসত্ত্ব ব্রাহ্মণকে ডেকে তাঁর পরিকল্পনা জানালেন।
ব্রাহ্মণকে নন্দিবিলাস পরামর্শ দিল যে, অনেক গরু আছে এমন শ্রেষ্ঠীর কাছে গিয়ে সহস্র মুদ্রা পণ বা বাজি রেখে বলতে হবে, তাঁর গরু একশতটি দ্রব্যপূর্ণ শকট একাই টানতে পারে। তখন ব্রাহ্মণ নগরের জনৈক শ্রেষ্ঠীর কাছে গিয়ে নগরে কার কার গরু বলবান এই প্রসঙ্গের অবতারণা করলেন। জানা গেল কয়েকজনের নাম। তাঁদের বলশালী গরু আছে বটে। তবে তাঁর গরুর কাছে এরা কিছুই নয়, তাঁর গরু-ই সর্বাপেক্ষা বলবান।

ব্রাহ্মণ তখন জানালেন যে তাঁর-ও একটি গরু আছে যে কীনা একশ’ বোঝাই গাড়ি টানতে পারে। শ্রেষ্ঠী হেসে বললেন, তাই বুঝি! তা সে গরু কোথায় থাকে?
—কেন আমার গৃহেই সে প্রতিপালিত হচ্ছে।
—আচ্ছা! তবে বাজি রাখুন।
—তাই হোক, হাজার মুদ্রা বাজি থাকল তবে।
আরও পড়ুন:

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৭৪: মনের ইচ্ছে থাকলেই কার্যসিদ্ধি সম্ভব

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১০৭: লুকাবো বলি, লুকাবো কোথায়?

এরপর ব্রাহ্মণ কাঁকর, পাথর, বালি দিয়ে একশ’ গাড়ি পূর্ণ করে তাদের শ্রেণিবদ্ধ করে বাঁধলেন। নন্দিবিলাসকে উত্তমরূপে স্নান করিয়ে তাকে পুষ্পমাল্যে সজ্জিত করলেন, চর্চিত করলেন গন্ধদ্রব্যে। এরপর সর্বাগ্রে তাকে যুক্ত করে গাড়িতে চড়ে চাবুক হাঁকিয়ে বললেন, অ্যাই বদমাইশ!! বেটা চল্ চল্, জোরে টান্ রে হতভাগা!

নন্দিবিলাস মনে মনে ভাবল, আমি যা নই আমাকে তাই বলা হচ্ছে। সে চারটি পা স্তম্ভের মতো নিশ্চল করে দাঁড়িয়ে থাকল। এক পা-ও নড়ল না। ব্রাহ্মণ বাজি হারলেন নিমেষে। শ্রেষ্ঠী সঙ্গে সঙ্গে অর্থ আদায় করে ফিরে গেলেন। ব্রাহ্মণ সহস্রমুদ্রা দণ্ড দিয়ে গরুটিকে মুক্ত করলেন এবং গৃহে প্রত্যাগমন করে নিতান্ত দুঃখিত হয়ে শয্যাগত রইলেন।
আরও পড়ুন:

উপন্যাস: আকাশ এখনও মেঘলা, পর্ব-৯: আকাশ এখনও মেঘলা

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৭০: বিচারক

নন্দিবিলাস চারণভূমি থেকে ফিরে এভাবে ব্রাহ্মণকে দেখে কারণ জানতে চাইল।
—আপনি কি নিদ্রিত?
—যার হাজার মুদ্রা বিনষ্ট হয়েছে সে কি ঘুমাতে পারে?
—আমি দীর্ঘকাল আপনার আশ্রয়ে প্রতিপালিত, কখনও দ্রব্যের অপচয় করেছি? ভাণ্ড ভেঙেছি? আহত করেছি? অস্থানে মলমূত্র ত্যাগ করেছি?
—না বাবা, তা তুমি করো নি কখনও।
—তবে আমাকে বদমাইশ বললেন কেন? যে ক্ষতি হয়েছে তা আপনার নিজের দোষেই ঘটেছে ঠাকুর। আমার কোনও দোষ নেই। আমার পরামর্শ হল এই যে, আবার শ্রেষ্ঠীর কাছে গিয়ে এবার দুই সহস্র মুদ্রা পণ ধরুন। তবে সাবধান! আর কখনোই আমাকে বদমাইশ বলবেন না।

তারপর কী হল?
ব্রাহ্মণ তেমনটাই করলেন। গাড়ি বোঝাই হল। একটিমাত্র বলদের দ্বারাই বহনোপযোগী করে শক্তপোক্তভাবে সমগ্র ব্যবস্থাটিকে প্রস্তুত করা হল। তারপর গরুটিকে অগ্রে স্থাপন করলেন।
এরপর ব্রাহ্মণ গাড়িতে চড়ে নন্দিবিলাসের পিঠে হাত বুলিয়ে বললেন, সোনা, বাবা, যাদু আমার, একবার টানো তো বাপ।

বোধিসত্ত্বের টানে মুহূর্তে গাড়ি চলল। যেখানে প্রথম গাড়িটি ছিল নিমেষেই সেখানে শেষ গাড়িটি এসে দাঁড়াল।
আরও পড়ুন:

সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-৯৩: সাত-সহেলি

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১০৬: ভারতীয় পারিবারিক জীবনে স্নেহময় জ্যেষ্ঠর ভূমিকায় রামচন্দ্র কতটা আকর্ষণীয়?

তারপর?

শ্রেষ্ঠী বাজি হেরে পণের দুই সহস্র মুদ্রা দান করলেন। অন্যান্য সকলে বোধিসত্ত্বকে প্রভূত অর্থসম্পদে ভূষিত করলেন। ব্রাহ্মণ সেই সকলকিছু লাভ করলেন। এভাবে বোধিসত্ত্বের চেষ্টায় ব্রাহ্মণ ধনৈশ্বর্য লাভ করলেন।

ব্রাহ্মণের স্খলন এবং উত্তরণ এই জাতকের অন্যতম মুখ্য বিষয়। তার সঙ্গেই যুক্ত আছে যথার্থ আচরণের প্রসঙ্গটি। ব্রাহ্মণের রূঢ় ব্যবহারে বোধিসত্ত্ব রুষ্ট হয়েছিলেন। আবার ব্রাহ্মণের মিষ্টবচনে শোভন আচরণে হৃষ্টচিত্ত হয়ে তাঁকে ঐশ্বর্যমণ্ডিত করেছিলেন। তবে ব্রাহ্মণ তো কোপনস্বভাব ছিলেন না। রূঢ়বাক্যে মনুষ্যেতর প্রাণী থেকে মানুষ সকলেই ক্ষুণ্ণ হয়। তবে আত্মগর্বে, হয়তো বা, মনুষ্যেতর প্রাণী বলেই আত্মঘোষণার সুপ্ত বাসনায় ব্রাহ্মণ তাঁর পুত্রতুল্য গরুটিকে তুচ্ছজ্ঞানে অপমান মিথ্যাবাক্যের করেছিলেন, আবার নিজেকে সংশোধন-ও করেছিলেন। জীবচরিত্রে এই পার্থিব বিচলন যেমন প্রণিধানযোগ্য, তেমনই আত্ম-উপলব্ধির ক্ষেত্রটিও সমধিক গুরুত্বপূর্ণ।
আরও পড়ুন:

এগুলো কিন্তু ঠিক নয়, পর্ব-৪৮: সকালবেলাই হাঁটতে হবে?

আলোকের ঝর্ণাধারায়, পর্ব-৯o: মা সারদার কথায় ‘ঈশ্বর হলেন বালকস্বভাব’

আজকের পৃথিবী মানবাধিকারের কথা বলে। প্রাণীমাত্রের জীবনের অধিকার আজকের পৃথিবীতে সভ্যতার মাণদণ্ড। শিশুর মনোজগৎ, ছাত্রের আচরণ, গ্রাহকের আকাঙ্ক্ষা ম্যানেজমেন্টের নানা শাখায় যে প্রতিকূলতাকে উত্তরণের পাঠ, মানবসম্পদের সুষ্ঠু প্রয়োগের নানা তত্ত্ব ও আদর্শ আচরণের বিভিন্ন প্রয়োগ, সেখানে জাতকমালার এই কাহিনী শাশ্বত সমাজবোধের বার্তা বহন করে আধুনিক ব্যবস্থাপন বিদ্যার মূল স্রোতে এসে মেশে। রূঢ় ও মিষ্টবচনের সুফল ও কুফল এই কাহিনীর একটি শিক্ষণীয় বিষয় হয়। জনসংযোগমুখী বাণিজ্যক্ষেত্রের সাফল্যেও সেই এক-ই সত্য। আজকের জটিলতর কৌশলী পৃথিবীর আধুনিকতম তত্ত্বেও সেই প্রাচীন প্রাথমিক শাশ্বত সত্যবোধটি চর্চিত হয়, জাতকের এই কাহিনীটি সেই উপলব্ধির ক্ষেত্রটিকেই উন্মুক্ত করে।
* ড. অভিষেক ঘোষ (Abhishek Ghosh) সহকারী অধ্যাপক, বাগনান কলেজ। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগ থেকে স্নাতকস্তরে স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত। স্নাতকোত্তরের পর ইউজিসি নেট জুনিয়র এবং সিনিয়র রিসার্চ ফেলোশিপ পেয়ে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগে সাড়ে তিন বছর পূর্ণসময়ের গবেষক হিসাবে যুক্ত ছিলেন। সাম্বপুরাণের সূর্য-সৌরধর্ম নিয়ে গবেষণা করে পিএইচ. ডি ডিগ্রি লাভ করেন। আগ্রহের বিষয় ভারতবিদ্যা, পুরাণসাহিত্য, সৌরধর্ম, অভিলেখ, লিপিবিদ্যা, প্রাচ্যদর্শন, সাহিত্যতত্ত্ব, চিত্রকলা, বাংলার ধ্রুপদী ও আধুনিক সাহিত্যসম্ভার। মৌলিক রসসিক্ত লেখালেখি মূলত: ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে। গবেষণামূলক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়ে চলেছে বিভিন্ন জার্নাল ও সম্পাদিত গ্রন্থে। সাম্প্রতিক অতীতে ডিজিটাল আর্ট প্রদর্শিত হয়েছে আর্ট গ্যালারিতে, বিদেশেও নির্বাচিত হয়েছেন অনলাইন চিত্রপ্রদর্শনীতে। ফেসবুক পেজ, ইন্সটাগ্রামের মাধ্যমে নিয়মিত দর্শকের কাছে পৌঁছে দেন নিজের চিত্রকলা। এখানে একসঙ্গে হাতে তুলে নিয়েছেন কলম ও তুলি। লিখছেন রম্যরচনা, অলংকরণ করছেন একইসঙ্গে।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content