শনিবার ৫ এপ্রিল, ২০২৫


ছবি: প্রতীকী।

বহুশ্রুত কিংবদন্তি জানায় যে মহর্ষি বাল্মীকি নাকি একদা দস্যু রত্নাকর হয়ে তস্করবৃত্তি অবলম্বন করে প্রাণের বিনিময়ে জীবিকা নির্বাহ করতেন। তিনি ভেবেছিলেন যে, তাঁর অন্নে প্রতিপালিত তাঁর পরিবার এই পাপের ভার গ্রহণ করবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল পরিবারের পালনের দায় যেমন ওই ব্যক্তির, সদুপায়ে কিংবা অসদুপায় কোনটি অবলম্বন করে সে এই কাজ সম্পন্ন করবে সেও তার একান্ত সিদ্ধান্ত-নির্ভর। কর্মফলের ভোক্তাও সেই ব্যক্তি। শুভ বা অশুভ কোন্ ফলটি সে লাভ করবে তা কর্মের ওপর নির্ভর করে, যে কর্মের দায় ব্যক্তির, গোষ্ঠীর নয়। ব্যক্তির পাপে যেমন পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হবে তেমনই দেশনায়ক রাজার পাপে রাজ্য সামগ্রিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কিন্তু বিচার্য যে, জীবিকার জন্য যখন ব্যাধ প্রাণিবধ করছে তখন কতটা তার পাপ, কতটাই বা কর্তব্য?
মঙ্গলকাব্যে এমন এক ব্যাধ কালকেতুকে দেশনায়ক রাজা হয়ে উঠতে দেখা যাবে। শাস্ত্র তার দীর্ঘ বিচার-বিশ্লেষণে যুগে যুগে এই সংকটকে উপলব্ধির চেষ্টা করেছে। বৈদিক যজ্ঞানুষ্ঠানের পশুবধ এবং তার বিপক্ষে প্রতিবাদী ধর্মান্দোলন ও বোধিসত্ত্বের আত্মপ্রকাশ কিংবা সম্রাট্ অশোকের অনুশাসনে অহিংসা, রন্ধনাগারে প্রাণিমাংসের ব্যঞ্জন কমিয়ে আনার আশ্বাস খাদ্য-খাদক শৃঙ্খল, খাদ্যরুচি, ন্যায় অন্যায়ের সূক্ষ্ম বিচারের নানা দিক নিয়ে ভাবিয়েছে কালে কালে। আজকের কাহিনি সেই কর্তব্য ও অন্যায়ের সংঘাতের পরিসরে জন্ম নিয়েছে।
আরও পড়ুন:

গল্পবৃক্ষ, পর্ব-২২: নন্দিবিলাস-জাতক: রূঢ়ভাষে কষ্ট কারও করিও না মন

আলোকের ঝর্ণাধারায়, পর্ব-৯o: মা সারদার কথায় ‘ঈশ্বর হলেন বালকস্বভাব’

বোধিসত্ত্ব সেবারও বারাণসীতে ব্রহ্মদত্তের শাসনকালে জন্ম নিয়ে তক্ষশিলায় পাঠ গ্রহণ করে সর্ববিদ্যানিষ্ণাত হয়েছেন। যথারীতি প্রব্রজ্যা গ্রহণ করে আশ্রয় নিয়েছেন হিমালয়ের কোলে, ধ্যানসুখে অর্জন করছেন অভিজ্ঞা। এক রমণীয় বনভূমিতে বাস করতে করতে একদিন নেমে এসেছেন পর্বত-পাদদেশের এক প্রত্যন্ত গ্রামে, অম্ল ও লবণ সেবনের অভিপ্রায়ে। সেখানে পরম যত্ন পেলেন, গ্রামবাসীদের অনুরোধে নিকটের অরণ্যে পর্ণশালায় বসবাস আরম্ভ করলেন। গ্রামবাসীরা পরিধেয় পরিষ্কার চীবরাদি বস্ত্র দিয়ে তাঁর বসবাসের ভার গ্রহণ করল।

সেই গ্রামের এক পাখিশিকারী একটি তিত্তিরপাখিকে খাঁচায় ধরে তাকে নানা শিক্ষা দিতো। পাখিটি তার রক্ষণাবেক্ষণেই পিঞ্জরাবদ্ধ থাকতো। সেই শিকারী পাখিটিকে নিয়ে বনে যেত, পাখিটি কলকণ্ঠে ডেকে উঠতো, আকৃষ্ট হয়ে যেসকল তিতিরপাখি আসতো, তারা ধরা পড়তো।

তবে এ কাহিনি চিরাচরিত বদ্ধপিঞ্জরের সুখ, অসুখ ও মুক্তির কথা নয়। মুক্তি ঘটে সংশয় থেকে। বদ্ধতাও এখানে সংশয়িত চিত্তের প্রতিরূপ।
আরও পড়ুন:

সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-৯৩: সাত-সহেলি

রহস্য রোমাঞ্চের আলাস্কা, পর্ব-৫১: রোজই দেখি আলাস্কা পর্বতশৃঙ্গের বাঁ দিকের চূড়া থেকে সূর্য উঠতে

পাখিশিকারী তার জীবিকা অবলম্বন করেছে। সে মাধ্যম করেছে একটি তিত্তিরপাখিকে। সেই পাখিটি দাসত্ববৃত্তিতে আবদ্ধ, কিন্তু তার কাজের বিনিময়ে একটি সুখী নিশ্চিন্ত জীবন যাপন করে। কিন্তু যে কাজটি সে করছে তা কি ন্যায়সঙ্গত?

এই জিজ্ঞাসা জাগে তিতিরপাখির মনে। সে ভাবে স্বজাতির অনিষ্টসাধন করছে সে। তাই সে মৌন থাকে। শিকারী তার মাথায় বাঁশ দিয়ে আঘাত করে। যন্ত্রণায় চিৎকার করে ওঠে সে। তার আকর্ষণে ছুটে আসে অন্য তিতির পাখির দল, ধরা পড়ে। এভাবেই চলতে থাকে। তিতিরপাখিটি ভাবে, অন্য পাখির বিনাশ তো তার অভিপ্রায় নয়। তবুও সে-ই কি বিনাশের মাধ্যম নয়? তার ডাকের উপরেই তো নির্ভর করছে তাদের আসা, না আসা, জীবন, মরণ। তাহলে? এ পাপের ভার কি তার ওপরেও বর্তায় না? কে দেখাতে পারে আলো, কে দেবে সত্যের সন্ধান? কে নিরসন করবে সংশয়? সে অপেক্ষা করে এক জ্ঞানী, গুরুর।
আরও পড়ুন:

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১০৭: লুকাবো বলি, লুকাবো কোথায়?

গল্পবৃক্ষ, পর্ব-২২: নন্দিবিলাস-জাতক: রূঢ়ভাষে কষ্ট কারও করিও না মন

একদিন শিকারী ঝুড়িতে ধরা-পড়া বহু তিতিরপাখি ধরে জলপানের জন্য বোধিসত্ত্বের আশ্রমে এল। জলপান করে হাতের পিঞ্জরখানি ভূমিতে রেখে বালির ওপর ঘুমিয়ে পড়ল। এই সুযোগ!

তিতিরপাখি সংশয় দূর করার জন্য তাপসকে প্রশ্ন করল। তাপস উত্তর দিলেন। আমি সুখে আছি। অন্ন, জল যখন যা চাই পর্যাপ্ত পরিমাণে পাই। কিন্তু আমার ডাক শুনে আমারই জ্ঞাতিবন্ধুগণ বিপন্ন হয়। এই বিপত্তি কি আমার পাপ নয়?

না নয়। কারণ তুমি এই শিকারির কবলে গ্রস্ত, নিমিত্তমাত্র। পাপপ্রবৃত্তি তো তোমার মনে নেই। তুমি নিষ্পাপ, অশুভ ইচ্ছে তো তোমার মনে নেই, তবে পাপের কী সাধ্য তোমায় স্পর্শ করে! যেন শোনা যায় শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা, যেখানে শ্রীকৃষ্ণ প্রণোদিত করছেন বীরযোদ্ধাকে, বলছেন হে অর্জুন! তুমি এই আসন্ন মৃত্যুর নিমিত্তমাত্র। পাপ তোমাকে স্পর্শ করবে না। বলবেন কর্মের কথা।

কিন্তু তিতিরপাখির এই কাহিনী ন্যায় কিংবা অন্যায়ের সংজ্ঞা, তাকে ঘিরে জমতে থাকা প্রতর্কটুকুকেই আশ্রয় করে দিকনির্দেশ করতে চায়। তবুও ব্যাকুল তিতিরপাখিটি হয়তো বলতে চাইবে, আমার মধ্যস্থতাতেই তো এই মৃত্যুর আয়োজন। তারা তো আমারই জ্ঞাতিকুল। আমি কি দায়ী নই?
আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১০৭: সুভদ্রাপুত্র অভিমন্যু ও দ্রৌপদীর পঞ্চ পুত্র, কে বা কারা রইলেন পাদপ্রদীপের আলোয়?

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৭০: বিচারক

বোধিসত্ত্ব প্রশান্তচিত্তে বলবেন, তুমি শুদ্ধচিত্ত, নিরপেক্ষ, কেবল এই যাবতীয় বিষয়ের দ্রষ্টা, নিরীক্ষকমাত্র। দুচোখে দেখছো এই পাপকর্ম, কিন্তু পাপ করছে এই শিকারী। পাপের সাধ্য কী যে তোমাকে স্পর্শ করে।

বোধিসত্ত্বের এই বিচার দৃশ্যতঃ প্রবোধমাত্র। তবে তিনি ব্যাকুলচিত্ত পাখিটিকে নিশ্চিন্ত করলেন। পাপভয়ে ভীত, আশঙ্কিত এই তিতিরটি আশ্বস্ত হল। তার আশঙ্কা গেল ঘুচে। এরপর ব্যাধের ঘুম ভাঙলে সে বোধিসত্ত্বকে প্রণাম করে পিঞ্জর নিয়ে চলে গেল।

যেখানে কাহিনিটি শেষ হয়, যেভাবে শেষ হয় তাতে কিছু প্রশ্ন জাগে, জাগে কিছু উপলব্ধি। ন্যায় অন্যায়ের যে স্পষ্ট ভেদ তা কাহিনীর প্রতিপাদ্য নয়। আপাতঃ অন্যায়ের মূলেও যে ন্যায়ের উদ্ভাস, আপাতঃ ন্যায়ের গভীরেও যে অন্যায়ের ছায়া তা কাহিনীর প্রতিপাদ্য। সাদা-কালোয় বাঁধা জীবনকে এই প্রাচীন কাহিনী অতিক্রম করে তার বিচিত্র রহস্যের সূক্ষ্ম পথ চলেছে। এমনকী, উপদেশের অন্তরালে যে ভ্রান্তিহীন অতিমানবিক ভাব থাকে তাও বুঝি এখানে নেই। এখানে ইঙ্গিত আছে মনের আধিপত্যের, আছে গ্লানি ও আত্মজিজ্ঞাসা, আছে আশ্বাস, বিশ্বাস ও প্রবোধের মায়াময় সংবেদনা, তা-ই উত্তীর্ণ করে, হয়ে ওঠে চিরন্তন। এই জাতককথার শক্তি এখানেই।
* ড. অভিষেক ঘোষ (Abhishek Ghosh) সহকারী অধ্যাপক, বাগনান কলেজ। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগ থেকে স্নাতকস্তরে স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত। স্নাতকোত্তরের পর ইউজিসি নেট জুনিয়র এবং সিনিয়র রিসার্চ ফেলোশিপ পেয়ে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগে সাড়ে তিন বছর পূর্ণসময়ের গবেষক হিসাবে যুক্ত ছিলেন। সাম্বপুরাণের সূর্য-সৌরধর্ম নিয়ে গবেষণা করে পিএইচ. ডি ডিগ্রি লাভ করেন। আগ্রহের বিষয় ভারতবিদ্যা, পুরাণসাহিত্য, সৌরধর্ম, অভিলেখ, লিপিবিদ্যা, প্রাচ্যদর্শন, সাহিত্যতত্ত্ব, চিত্রকলা, বাংলার ধ্রুপদী ও আধুনিক সাহিত্যসম্ভার। মৌলিক রসসিক্ত লেখালেখি মূলত: ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে। গবেষণামূলক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়ে চলেছে বিভিন্ন জার্নাল ও সম্পাদিত গ্রন্থে। সাম্প্রতিক অতীতে ডিজিটাল আর্ট প্রদর্শিত হয়েছে আর্ট গ্যালারিতে, বিদেশেও নির্বাচিত হয়েছেন অনলাইন চিত্রপ্রদর্শনীতে। ফেসবুক পেজ, ইন্সটাগ্রামের মাধ্যমে নিয়মিত দর্শকের কাছে পৌঁছে দেন নিজের চিত্রকলা। এখানে একসঙ্গে হাতে তুলে নিয়েছেন কলম ও তুলি। লিখছেন রম্যরচনা, অলংকরণ করছেন একইসঙ্গে।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content