
ছবি: প্রতীকী।
এপ্রিল মাস শুরু হল। “এপ্রিল ফুল” কেন আর কীভাবে এই জগতে নেমে এসেছিল তা নিয়ে ইতিহাস ধন্দে আছে, তাই দ্বন্দ্ব-ও আছে বৈকী। তবে শোনা যায়, পোপ গ্রেগরি জর্জিয়ান ক্যালেন্ডার চালু করলে পয়লা জানুয়ারি থেকে নববর্ষের সূচনা হয়। তখনও যারা জুলিয়ান ক্যালেন্ডার মেনে পয়লা এপ্রিল থেকেই নববর্ষ গুণতে চেয়েছিল তাদের জন্য এই বোকা-দিবসের আয়োজন। চসারের “ক্যান্টারবারি টেলস” বত্রিশে মার্চ বা পয়লা এপ্রিলের কথা বলে, এককথায় অসম্ভবের সম্ভাবনা। তো এই এপ্রিলের বসন্তদিনে কারা যেন বুঝে নিয়েছিল “ফুল খেলবার দিন নয় অদ্য”, অতয়েব বোকা বানানো যাক। যাকে “প্রাঙ্ক” বলা হয়। মজাদার তামাশার আয়োজন। সেই সারস শেষটায় যা করেছিল, শেয়ালকে নেমন্তন্ন করে কুঁজোতে স্যুপ খেতে দিয়েছিল। হতভাগা শেয়ালটা কুঁজোর গলা চেটেই বাড়ি ফিরেছিল। নীতিবিদ্যা একে জানিয়েছে “শঠে শাঠ্যং” বলে। তবে এপ্রিলের প্রথম দিনে আপনি এমনি এমনিই বোকা বনতে পারেন।
দর্শনে জগত্, মায়া, ব্রহ্ম, জীব ইত্যাদি মিলেমিশে যে তত্ত্ব জেগে ওঠে তার পিছনেও এক বিরাট বোকামির উঁকিঝুঁকি যেন। মায়ার আবেশ এমনভাবে কাজ করছে নাকি জগতে যে, জীবের পার্থিব অস্তিত্বটাই নাকি বেবাক ফাঁকি, তার থাকাটা সত্য, এবং থেকেও না থাকাটাই সারসত্য। ভ্রম-বিভ্রমের এই সখাত সলিলে বোকা, মূর্খ, গবেট, হাবা, ক্যাবলা, ক্যালাস ও ইডিয়টরা ভাসছে। ফুল মানে বোকা, ফুল মানে ভরা, ফুল আবার গাছেও ফোটে। এপ্রিলের এই বসন্তদিন আকস্মিক বোকা গজানোর দিন। অন্যকে বোকা বানিয়ে আমোদ পাওয়ার লগ্ন। চালকদের ফুল বানিয়ে, ফুলদের হুল ফুটিয়ে একটু কোণঠাসা করার দিন।
আরও পড়ুন:

গল্পবৃক্ষ, পর্ব-২৩: তিত্তিরজাতক: পাপ ও আত্মজিজ্ঞাসা

আলোকের ঝর্ণাধারায়, পর্ব-৯o: মা সারদার কথায় ‘ঈশ্বর হলেন বালকস্বভাব’
হয়তো, রামধনের পিসেমশাই চোখ বুজেছেন শুনে আপনি তাকে শেষবারের মতো দেখতে গিয়ে দেখলেন তিনি দিব্যি তক্তপোশে বসে ফলার করছেন। অথবা, “এক্ষুণি চলে আয়” বলে ডেকে নিয়ে দুঘণ্টা অপেক্ষা করানো, কিংবা “ওই কী যেন চকচক করছে, মোহর বোধহয়” এইসব বলে মাথায় টুপি পরানোর কিংবা ঘোল ঢালার আয়োজন করার মতো সময়, ইচ্ছে, সামর্থ্য যাদের আছে তারা আনাচে কানাচে এপ্রিল ফুল করবে।
আরও পড়ুন:

উপন্যাস: আকাশ এখনও মেঘলা, পর্ব-৯: আকাশ এখনও মেঘলা

রহস্য রোমাঞ্চের আলাস্কা, পর্ব-৫১: রোজই দেখি আলাস্কা পর্বতশৃঙ্গের বাঁ দিকের চূড়া থেকে সূর্য উঠতে
এপ্রিলের প্রথম দিনেই নতুন অর্থবর্ষের সূচনা। আর বলাই তো হয়, অর্থ অনর্থের মূল, বোকা বানানোর একটা বড় অবলম্বন। হয়তো আপনাকে বলা হল লটারি পেয়েছেন, তবে টাকাটা নিতে গেলে একটু চাঁদা দিতে হবে। কিংবা, পৃথিবীর অষ্টম বিস্ময়টি সুলভ মূল্যে বেচা হচ্ছে, কিনতে হলে পয়সা নয়, টাকা নয়, লাগবে সদিচ্ছা। আপনি কিনতে রাজি তো? তাহলে আমাদের আখড়ায় নাম লেখান। আমরা আবার যে সে কেউ নই গো। ঢুকতে গেলে খানিক খর্চা আছে। মেম্বার হও আশ্চর্য প্রদীপ নাও। কিংবা, চোর সাধু সেজেছে। বাটপাড় চোরকে বোকা বানাচ্ছে। এগুলোকে আজকাল প্রতারণা বলা হচ্ছে। আসলে ছোট্ট ছোট্ট মজা এসব। সারাবছর ধরেই চলে। এসবের জন্য দিন লাগে না। লাগে সদিচ্ছা, গ্রহণ করার মতো উন্মুক্ত নিষ্পাপ হৃদয়বত্তা, মেজাজ। এই যেমন দুশো বছর আগে কেউ এসে বলেছিল, একটু দোকান দেব, পুওর আদমি, প্লিজ হেল্প মি। দিন গড়াতে না গড়াতেই তার চেয়ার কী করে যেন সিংহাসন হয়ে গেল।
আরও পড়ুন:

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১০৭: লুকাবো বলি, লুকাবো কোথায়?

সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-৯৩: সাত-সহেলি
আগে এসব মাঠে ঘাটে হতো। এখনও হয়। তবে এখন দুনিয়া ডিজিটাল। সেই মাঠেই খেলা চলে। একবার হালখাতার নেমন্তন্ন করে ধার-বাকির শোধ কড়ায় গণ্ডায় তুলতে চেয়েছিল কারা যেন! সেটাও তো মজা-ই ছিল। মজেছিল প্যালা আর টেনিদা। কিংবা, খড়ে আগুন দিতেই ধোঁয়ায় মহাদেব ক্যাবলানন্দ হয়ে গেলেন, বিরিঞ্চিবাবা হলেন জোচ্চোর। আসলে, ফুলস ডে প্রতিদিন। একদিনে এর মাহাত্ম্য উপলব্ধি করা যায় নাকি!
আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১০৭: সুভদ্রাপুত্র অভিমন্যু ও দ্রৌপদীর পঞ্চ পুত্র, কে বা কারা রইলেন পাদপ্রদীপের আলোয়?

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৭০: বিচারক
সেই কবে, ঋগ্বেদেই ঋষির কণ্ঠে উচ্চকিত ধ্বনি শোনা গিয়েছিল, “শ্রদস্মৈ ধত্ত”… শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ কর, ইনিই ইন্দ্র। বলতে হয়েছিল, কারণ ততদিনে ইন্দ্রের অবিসংবাদী অস্তিত্বে একদল লোক সন্দিহান বেশ! একে জোরাজুরি মনে হতে পারে, কিন্তু বোকা বানানোর, বোকা বনে যাওয়ার গল্পগুলি তো বিখ্যাত হয়েছে ক্রমশ। যাজ্ঞবল্ক্য মৈত্রেয়ীকে একপর্যায়ে ধমকে থামিয়েছেন, বোকা পণ্ডিতের দল খুব গম্ভীরমুখে উত্পটাং কাজ করে করে হাস্যাস্পদ হয়েছে, জনৈক ব্রাহ্মণের ছাগলকে অন্যের কথায় কুকুর ভাবতে দ্বিধা হয়নি, শেয়ালের প্রশংসায় কাক কোকিলকণ্ঠী হতে চেয়েছে। তোমার সারল্যকে কেউ কেউ হাতিয়ার করেছে, তোমার নির্মলতা কেউ কেউ মূর্খতা মনে করে বেশ হেসেছে একচোট। কেউ কেউ ভালোমানুষীর মুখোশের আড়ালে অস্ত্রে শাণ দিচ্ছে।
এপ্রিল ফুলের দিন এদেরকেও স্মরণ করায় বৈকী! আজও তোমাকে হস্তিমূর্খ বললে কেউ মস্ত পণ্ডিত হয়ে উঠতে পারবে, মনে হতে পারে যে, পৃথিবীতে আসলে দু’দল লোক খেলছে, একদল বোকা, আরেকদল চালাক। তবে সেটাই শেষ সত্য নয়, কারণ আপেক্ষিকতায় গ্রস্ত দুনিয়ায় কে যে কখন বোকা বা জ্ঞানী তার হিসেব রাখে কে?
এপ্রিল ফুলের দিন এদেরকেও স্মরণ করায় বৈকী! আজও তোমাকে হস্তিমূর্খ বললে কেউ মস্ত পণ্ডিত হয়ে উঠতে পারবে, মনে হতে পারে যে, পৃথিবীতে আসলে দু’দল লোক খেলছে, একদল বোকা, আরেকদল চালাক। তবে সেটাই শেষ সত্য নয়, কারণ আপেক্ষিকতায় গ্রস্ত দুনিয়ায় কে যে কখন বোকা বা জ্ঞানী তার হিসেব রাখে কে?
* ড. অভিষেক ঘোষ (Abhishek Ghosh) সহকারী অধ্যাপক, বাগনান কলেজ। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগ থেকে স্নাতকস্তরে স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত। স্নাতকোত্তরের পর ইউজিসি নেট জুনিয়র এবং সিনিয়র রিসার্চ ফেলোশিপ পেয়ে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগে সাড়ে তিন বছর পূর্ণসময়ের গবেষক হিসাবে যুক্ত ছিলেন। সাম্বপুরাণের সূর্য-সৌরধর্ম নিয়ে গবেষণা করে পিএইচ. ডি ডিগ্রি লাভ করেন। আগ্রহের বিষয় ভারতবিদ্যা, পুরাণসাহিত্য, সৌরধর্ম, অভিলেখ, লিপিবিদ্যা, প্রাচ্যদর্শন, সাহিত্যতত্ত্ব, চিত্রকলা, বাংলার ধ্রুপদী ও আধুনিক সাহিত্যসম্ভার। মৌলিক রসসিক্ত লেখালেখি মূলত: ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে। গবেষণামূলক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়ে চলেছে বিভিন্ন জার্নাল ও সম্পাদিত গ্রন্থে। সাম্প্রতিক অতীতে ডিজিটাল আর্ট প্রদর্শিত হয়েছে আর্ট গ্যালারিতে, বিদেশেও নির্বাচিত হয়েছেন অনলাইন চিত্রপ্রদর্শনীতে। ফেসবুক পেজ, ইন্সটাগ্রামের মাধ্যমে নিয়মিত দর্শকের কাছে পৌঁছে দেন নিজের চিত্রকলা। এখানে একসঙ্গে হাতে তুলে নিয়েছেন কলম ও তুলি। লিখছেন রম্যরচনা, অলংকরণ করছেন একইসঙ্গে।