
ছবি: সংগৃহীত।
শান্তিনিকেতনের নৃত্য ধারায় প্রত্যন্ত রাজ্য ত্রিপুরার সামান্য ভূমিকা আজ অসামান্য গর্বের সঙ্গেই এক স্মরণযোগ্য ঘটনা বলা যায়। সে এক ইতিহাস। এক রাজবংশের চারজন রাজার সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের যোগাযোগ কিম্বা প্রাসাদ রাজনীতির ডামাডোলই শেষ কথা নয়। ছিল আরও অনেক কিছু। নীরবে যেন খুলে গিয়েছিল এক বিরাট সম্ভাবনার দুয়ার। শান্তিনিকেতনের নৃত্য ধারায় মণিপুরী নৃত্য সংযোজনের ক্ষেত্রে ত্রিপুরাও নিজেকে যুক্ত করার সুযোগ পেয়েছিল মূলত কবির সঙ্গে এই পার্বতী রাজ্যের রাজপরিবারের নিবিড় যোগাযোগের সূত্রেই।
শান্তিনিকেতনের নৃত্য ধারায় যে মণিপুরী নৃত্য সংযোজিত হয়েছিল তার উৎসে ছিল ত্রিপুরা, প্রায়োগিক ক্ষেত্রেও ছিল তার ভূমিকা। রবীন্দ্রনাথ প্রথম মণিপুরী নৃত্য দেখেছিলেন তাঁর প্রথম আগরতলা সফরে। কিন্তু পরবর্তীকালে সিলেটের মাছিমপুরে দেখা মণিপুরি নাচ তাঁর নৃত্য ভাবনাকে আলোড়িত করে। কবি শান্তিনিকেতনের নৃত্য ধারায় মণিপুরী নৃত্য কৌশল সংযোজনে উদ্যোগী হন। ত্রিপুরা থেকে নিয়ে যান মণিপুরী নৃত্য শিক্ষক। ‘নটীর পূজা’, ‘শাপমোচন’, ‘চিত্রাঙ্গদা’ নৃত্যনাট্যে নৃত্য কৌশল সংযোজনে ত্রিপুরার মণিপুরী নৃত্য শিক্ষকদের ভূমিকা সেদিন সকলের প্রশংসা অর্জন করেছিল। সে জন্য শান্তিনিকেতনের নৃত্য চর্চার ইতিহাসে ত্রিপুরা স্হান করে নিয়েছে।
আরও পড়ুন:

ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৫৪: রবীন্দ্রনাথের ‘মুকুট’ ত্রিপুরার ইতিহাসাশ্রিত গল্প

আলোকের ঝর্ণাধারায়, পর্ব-৯২: শ্রীমার সঙ্গে এক মেমসাহেবের কথোপকথন
শান্তিনিকেতনের মাধ্যমে একদিন বাংলার ভদ্র সমাজে নৃত্য চর্চার সূত্রপাত ঘটলেও শুরুর সেই দিনগুলোতে নৃত্য চর্চায় পৃষ্ঠপোষকতার জন্য রবীন্দ্রনাথকে অনেক বিরূপ সমালোচনার সম্মুখীন হতে হয়েছিল। ভারতীয় সমাজে অবশ্য সুপ্রাচীন কাল থেকেই নৃত্যের প্রচলন। আমাদের পৌরাণিক কাহিনিতে রয়েছে নৃত্যের কথা।স্বর্গের দেবতাদের মনোরঞ্জনে ছিল অপ্সরাদের নৃত্য।দক্ষযজ্ঞ পণ্ড করে সতীর্থ দেহ কাঁধে নিয়ে শিবের তাণ্ডব নৃত্যে সৃষ্টি লোপের উপক্রম হয়েছিল।
আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১০৮: গার্হস্থ্যজীবনে জ্যেষ্ঠ রামচন্দ্রের ভাবমূর্তি, তাঁর দেববিগ্রহে উত্তরণের একটি অন্যতম কারণ?

এপ্রিল ফুল
এমনকি, মণিপুরেও প্রচলিত এক কাহিনিতে রয়েছে যে, সুন্দরী দেবী ‘নোংথাং লৈমা’ নৃত্যের মাধ্যমে বশ করেছিলেন ভয়ঙ্কর এক অসুরকে। ‘হারাবা লৈথীঙ্গায়’ নামের এই অসুর পৃথিবী সৃষ্টির কাজে বাধা দিচ্ছিল। সৃষ্টিকর্তার আদেশে তখন দেবী নৃত্যের মাধ্যমে অসুরকে মুগ্ধ করেন। অবশেষে সম্পূর্ণ হয় সৃষ্টির কাজ। বাংলা মঙ্গলকাব্যেও অনুল্লেখ্য নয় নৃত্যের কথা। স্বামী লক্ষীন্দরের নিষ্প্রাণ দেহে প্রাণ সঞ্চারের উদ্দেশ্যে মনসামঙ্গল কাব্যের নায়িকা বেহুলা স্বর্গের দেবতাদের তুষ্টি সাধনে নৃত্য করেছিলেন। পুরাণ, মঙ্গলকাব্য ইত্যাদি ছাড়াও উল্লেখ করা যায় দেবদাসীদের কথা। মন্দিরে মন্দিরে দেবদাসীদের নৃত্যের কথা আমাদের নানা গল্প সাহিত্যে, এমনকি ক্ষেত্র বিশেষে ইতিহাসেরও উপাদান হয়ে আছে। কিন্তু ভারতীয় সমাজ-সংস্কৃতি এবং ধর্ম বিশ্বাসবোধে এই যখন নৃত্যের পশ্চাৎপট,তখন বাস্তবটা কী? বিংশ শতাব্দীর শুরুতেই বাঙালি ভদ্র সমাজে নৃত্য চর্চা ছিল অতীব নিন্দনীয়।
আরও পড়ুন:

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১০৯: যে-আঁধার আলোর অধিক

সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-৯৪: মৌটুসি
নৃত্যের প্রসঙ্গ এলেই সকলের চোখের সামনে যেন ভেসে উঠতো বাঈজি নাচের কথা। রাজা বাদশা আর জমিদারদের ফূর্তির জন্যই যেন সৃষ্টি হয়েছে এই নাচের। আবহমানকাল ধরে চলে আসা বাংলার নানা লোকনৃত্যও তখন কোণঠাসা। একমাত্র অন্ত্যজদের জীবন যাপনের অঙ্গ হয়ে টিকে রয়েছে তা। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে দেশের নানা ধ্রুপদী নৃত্যও চলে গেছে অন্তরালে। অর্থাৎ ঐতিহ্য থাকলেও কৌলিন্য ছিল না। ব্যাপক অর্থে সামাজিক স্বীকৃতিও ছিল না। ভদ্র সমাজে নৃত্যের চর্চাও ছিল না। ঘরের মেয়ে নাচবে? না, না, এটা হয় না, হতে পারে না। এই রকম অবস্থায় বাংলার সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে বলা যায় এক বিপ্লব ঘটলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তাঁর হাত ধরেই নৃত্য এসে গেল সামনে,হয়ে উঠল সংস্কৃতি চর্চার অন্যতম উপাদান। কিন্তু এর সূচনা পর্বে নিশ্চিত কবির অভিজ্ঞতা তেমন সুখকর ছিল না।
আরও পড়ুন:

রহস্য রোমাঞ্চের আলাস্কা, পর্ব-৫২: আলাস্কায় গ্রীষ্মকালে সাজো সাজো রব, সক্কলে ব্যস্ত

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৭০: বিচারক
রবীন্দ্রনাথ কেন এবং কি ভাবে নৃত্য সম্পর্কে উৎসাহিত হয়ে উঠলেন সে নিয়ে অনেক আলোচনা হয়েছে। কেউ কেউ এর পেছনে কবির দেশ বিদেশে ভ্রমণ ও বিভিন্ন অঞ্চলের নাচ দেখার অভিজ্ঞতার কথাও উল্লেখ করেছেন। কেউ বলেছেন কবি শিক্ষাকে পরিপূর্ণ আনন্দময় করার উদ্দেশ্যেই শান্তিনিকেতনে নৃত্য শিক্ষার প্রবর্তন করেছিলেন। শান্তিনিকেতনে নৃত্য চর্চা ও তার আদর্শ সম্পর্কে শান্তিদেব ঘোষ বলেছেন—”শান্তিনিকেতনে নাচের শিক্ষা দ্বারা কেবল নাচিয়ে তৈরি করা গুরুদেবের উদ্দেশ্য ছিল না, তাঁর উদ্দেশ্য ছিল প্রকৃত শিক্ষার দ্বারা জ্ঞান ও অন্যান্য কলাবিদ্যা সমাজ জীবনকে যেমন উন্নত ও শান্তিময় করে তোলে, নৃত্যকলাও যেন তাই করে।” —চলবে।
* জিৎ সত্রাগ্নি (Jeet Satragni) বাংলা শিল্প-সংস্কৃতি জগতে এক পরিচিত নাম। দূরদর্শন সংবাদপাঠক, ভাষ্যকার, কাহিনিকার, টেলিভিশন ধারাবাহিক, টেলিছবি ও ফিচার ফিল্মের চিত্রনাট্যকার, নাট্যকার। জিৎ রেডিয়ো নাটক এবং মঞ্চনাটক লিখেছেন। ‘বুমেরাং’ চলচ্চিত্রের কাহিনিকার। উপন্যাস লেখার আগে জিৎ রেডিয়ো নাটক এবং মঞ্চনাটক লিখেছেন। প্রকাশিত হয়েছে ‘জিৎ সত্রাগ্নি’র নাট্য সংকলন’, উপন্যাস ‘পূর্বা আসছে’ ও ‘বসুন্ধরা এবং…(১ম খণ্ড)’। এখন লিখছেন বসুন্ধরা এবং…এর ৩য় খণ্ড।