
(বাঁদিকে) খাবার মুখে ঝোপ টিকরা। (ডান দিকে) সুন্দরী ঝোপ টিকরা। ছবি: সংগৃহীত।
আমাদের গ্রামের বাড়ির সামনে যে নিয়মিত জোয়ার-ভাটা খেলা একটা খাল ছিল তা আগে বহু লেখায় বলেছি। আর সেই খালের দু’পারে ছিল নানা ধরনের ম্যানগ্রোভ বা ম্যানগ্রোভ সহযোগী উদ্ভিদের ঝোপ। ওই খালের সাথে সংলগ্ন আমাদের দুটো নোনা জলের পুকুরও ছিল। সেই পুকুরের পাড়েও ছিল নানা গাছের ঝোপ। আবার আমাদের বাড়ির পুবদিকে প্রায় ২০০ ফুট দূরে ওই খালের সাথে সংলগ্ন ছিল একটা নালা। গ্রামের ভাষায় আমরা বলি পয়না। সেই পয়নার দু’পারেও ছিল নানা ঝোপ। শীতকালে ওইসব ঝোপ থেকে সুন্দর মিষ্টি একটা শব্দ প্রায়শই শুনতাম। কে যেন থেকে থেকে ডেকে চলেছে চি চুকু চিক চিক …চি চুকু চিক চিক। আবার কখনও কখনও ডাকছে চিক্কি চুচু চ্রুউউ চিক্কি…। আবার কখনও কখনও স্রেফ চিক চিক চিক…। বেশ তীক্ষ্ণ কিন্তু মিষ্টি সুরে এইরকম ডাক শুনলে স্বাভাবিকভাবেই চোখ পৌঁছে যেত সেই ঝোপের ভেতর। আর তখনই দেখতাম ঝোপের মধ্যে এ-ডাল ও-ডাল লাফিয়ে বেড়াচ্ছে বেশ স্লিম চেহারার একটা পাখি। একবার ডাইনে, একবার বামে, একবার ওপরে, একবার নিচে ঘাড় ঘুরিয়ে সারাক্ষণ আশেপাশে কেউ রয়েছে কিনা কিংবা বিপদ রয়েছে কিনা বোঝার চেষ্টা করে চলেছে। নাকি ওর স্বভাবই এমন কে জানে? আর দ্রুত এক ডাল থেকে আর এক ডালে লাফিয়ে বেড়ায়। সে সব গত শতকের সাতের দশকের কথা। তখন ক্যামেরা ছিল না যে ছবি তুলে রাখব। অবশ্য মনের ক্যামেরায় ধরা ছিল। এখন শহরবাসী হওয়ায় সেইসব ঝোপেঝাড়ে গিয়ে পাখি খোঁজার তেমন আর সুযোগ পাই না। কিন্তু তাও যেটুকু সুযোগ পাই তাতে গত দুই দশকে এই পাখিগুলো আর আমার নজরে আসেনি।
পাখিটা লম্বায় হবে সাড়ে চার থেকে সাড়ে পাঁচ ইঞ্চি। মাথার চাঁদি থেকে ঘাড় হয়ে পিঠের মাঝামাঝি পর্যন্ত রঙ সবজে-ধূসর। দুটো ডানা যেন দেহের তুলনায় কিছুটা ছোট। ডানার সীমানার পালকগুলো কালচে ধূসর। থুতনি গলা পেট আর পায়ুর কাছে রঙ ধবধবে সাদা না হলেও সামান্য ময়লা-সাদা। লেজটাও যেন বেশ ছোট। লেজের শুরুর দিকে সবজে-ধূসর হলেও আগার দিকে রঙ কালচে ধূসর। চঞ্চু গাঢ় ধূসর রঙের এবং খুব সূচালো। চঞ্চুর আগার দিকটা একটু গাঢ় রঙ। মাথাটা যেন গোল না হয়ে কিছুটা চ্যাপটা। তবে উল্লেখ করার মতো বৈশিষ্ট্য রয়েছে চোখে। চোখ দুটো দেখলেই আমার মনে হয় যেন দুষ্ট দুষ্টু কুতকুতে চোখ। চঞ্চুর পেছন থেকে শুরু করে চোখের ঠিক উপরে রয়েছে সাদা রঙের দাগ। দেখে মনে হবে সাদা ভ্রু। অবশ্য সেই সাদা দাগ পুরো চোখ ঘিরে রয়েছে। ঠিক যেন কালো চোখের বাইরে সাদা বর্ডার। আর সাদা ভ্রু কিন্তু কোনওভাবেই চোখকে অতিক্রম করে পেছনে যায়নি। লিকলিকে সরু দুটো পায়ের রঙ ধূসর কিন্তু আঙুলগুলো কালচে ধূসর। আমার দেখে মনে হত ওরা কেঁউ গাছের বীজ খেতে পছন্দ করে। নাকি ওখান থেকে কোনও পোকামাকড় ধরে খেত তা নিশ্চিত করে ধারণা ছিল না। যদিও বই ও আন্তর্জালে ঝোপ টিকরাকে নিয়ে বিভিন্ন লেখা পড়ে জেনেছি এই পাখিরা মূলত পতঙ্গভূক। তবে আমার ধারণা ওরা বীজও খায়। যাইহোক, সেই পাতাবিহীন কেঁউ ঝোপে সারাক্ষণ ওরা ‘চিক চিক’ করে ডেকে যেত।
আরও পড়ুন:

সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-৯৪: মৌটুসি

আলোকের ঝর্ণাধারায়, পর্ব-৯২: শ্রীমার সঙ্গে এক মেমসাহেবের কথোপকথন
শুধু যে কেঁউ গাছের ঝোপে দেখেছি এমন নয়, আমাদের পুকুর পাড়ে নলখাগড়ার ঝোপে, খালের পাড়ে হোগলা গাছের ঝোপে, এমনকি আরও অন্যান্য ঝোপে ওই পাখিগুলোকে লাফাতে দেখেছি। অবশ্য কখনও কখনও ২০-২৫ সেকেন্ডের জন্য এক জায়গায় চুপচাপ বসে থাকতেও দেখেছি। তখন এদিক ওদিক মাথা ঘোরালেও শরীরের পালক ফুলিয়ে রাখে। অভিমান হলে স্ত্রী বা প্রেমিকা যেমন ঠোঁট ফুলিয়ে রাখে অনেকটা তেমনই! ছোটবেলায় মনে হত অভিমানে ঝোপ টিকরা পালক ফুলিয়ে রাখে! রসিকতা সরিয়ে রেখে বলি, শীতে বেশি উত্তুরে হাওয়া বইলে মনে হয় শরীর গরম রাখার জন্য অন্যান্য পাখিদের মতো ওরাও পালক ফুলিয়ে দেয়। তখন কিন্তু ওদের বেশ গাঁট্টা-গোট্টা দেখায়! আবার কখনও কখনও শব্দ করার সময় মনে হত মাথার চাঁদির উপর পালক সামান্য খাড়া হয়ে উঠছে। আমার মনের ভুল কিনা কে জানে? সারা বছরই যে ওদের দেখতে পেতাম তা কিন্তু নয়। যতদূর মনে আছে পুজোর সময় থেকে শীতের শেষ পর্যন্ত ওদের দেখতে পেতাম। অর্থাৎ অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারি বা মার্চ। বাকি সময় ওরা যায় কোথায়? আর ওদের পরিচয়ইবা কী? এই উত্তর পেতে সময় লেগেছে আমার অনেকদিন।
আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১০৮: গার্হস্থ্যজীবনে জ্যেষ্ঠ রামচন্দ্রের ভাবমূর্তি, তাঁর দেববিগ্রহে উত্তরণের একটি অন্যতম কারণ?

এপ্রিল ফুল
এই পাখিগুলি মূলত পরিযায়ী পাখি। যখন এদের প্রজনন ঋতু নয় তখনই সুন্দরবন অঞ্চলে এদের ঝোপে ঝাড়ে দেখা যায়। অবশ্য শুধু সুন্দরবন নয়, পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশসহ মায়ানমার ও থাইল্যান্ডের উপকূল, শ্রীলঙ্কা, আর ভারতের ওড়িশা, অন্ধ্রপ্রদেশ, তামিলনাড়ু, কেরালা, কর্ণাটক ও মহারাষ্ট্রের উপকুল অঞ্চলে অ-প্রজনন ঋতুতে এদের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। কিন্তু প্রজনন ঋতুতে এরা চলে যায় উত্তরের শীতপ্রধান দেশগুলোতে। উত্তরের দেশের মধ্যে রয়েছে রাশিয়া ও ইউরোপের বিস্তীর্ণ এলাকা। ভেবে বিস্মিত হয়েছি, এই ছোট্ট পাখিগুলো প্রজননের জন্য এত দূর পথ অতিক্রম করে! ছোট্ট ছোট্ট ডানায় এদের এত জোর! এইটুকু ছোট্ট চেহারায় ওদের এত প্রাণশক্তি! হ্যাঁ, নানা জনের মাধ্যমে পরে এর নাম জেনেছি— ঝোপ টিকরা। পক্ষীবিদ অজয় হোম-এর ‘বাংলার পাখি’ বইতে টিকরা পাখির কথা উল্লেখ থাকলেও ঝোপ টিকরা পাখি বৈশিষ্ট্যগতভাবে ভিন্ন। ইংরেজিতে এই পাখির নাম হল ‘Blyth’s Reed Warbler’, আর বিজ্ঞানসম্মত নাম ‘Acrocephalus dumetorum’।
আরও পড়ুন:

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১০৯: যে-আঁধার আলোর অধিক

ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৫৪: রবীন্দ্রনাথের ‘মুকুট’ ত্রিপুরার ইতিহাসাশ্রিত গল্প
ইংরেজিতে এই যে পাখিটার নামের শুরুতে যে ‘ব্লিথ’ শব্দটি রয়েছে তা হল ব্রিটিশ প্রাণীবিজ্ঞানী এডওয়ার্ড ব্লিথের নাম। তিনি ভারতে পাওয়া এই পাখিটির প্রথম বিবরণ দেন ১৮৪৯ সালে। ঝোপ টিকরা যে ছোটখাটো পাখি তা আগেই বলেছি। এর ওজনও তাই খুব কম, মাত্র ৮ থেকে ১৬ গ্রাম। আগেই বলেছি ঝোপ টিকরাদের অ-প্রজনন ঋতুতে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় দেখা যায়। প্রজনন ঋতুতে ওরা চলে যায় পূর্ব ইউরোপে। সাইবেরিয়ার বৈকাল হ্রদ পর্যন্ত সম্পূর্ণ তৈগা অঞ্চল ওদের প্রজননস্থল। এই সময় ওরা চওড়া পাতাওয়ালা গাছ রয়েছে এমন স্যাঁতসেঁতে বনভূমির সীমানায় থাকতে পছন্দ করে। অবশ্য গ্রাম ও শহরের বাগানবাড়ি, পার্ক, জলনিকাশী নালাসংলগ্ন ঝোপঝাড়েও এদের দেখা যায়। প্রজননের পর্ব শেষ করে ওরা প্রায় সম্পূর্ণ পপুলেশন পাড়ি জমায় দক্ষিণে। তারপর পৌঁছে যায় প্রধাণতঃ ভারত, বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কায়। এখানে শীত শেষ হলে এরা সদলে পাড়ি দেয় উত্তর-পশ্চিম ভারতের দিকে। এখানে ঠান্ডা যেমন বেশি তেমনই বর্ষার শেষে কীটপতঙ্গের পরিমাণও বৃদ্ধি পায়। ফলে ওদের খাদ্যাভাব হয় না। তারপর ওরা আরও উত্তরে পাড়ি জমিয়ে পৌঁছে যায় ইউরোপে।
আরও পড়ুন:

রহস্য রোমাঞ্চের আলাস্কা, পর্ব-৫৩: আলাস্কার দক্ষিণে রয়েছে সেই মনোরম গ্লেন হাইওয়ে

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৭০: বিচারক
মে থেকে জুলাই মাস হল ঝোপ টিকরাদের প্রজনন ঋতু। এই সময় একটি পুরুষ ও একটি স্ত্রী ঝোপ টিকরা জোড় বাঁধে। স্ত্রী-পুরুষ অবশ্য বাইরে থেকে দেখে চেনা মুশকিল। প্রজনন ঋতু ছাড়া এরা জোড় বাঁধে না। স্ত্রী ও পুরুষ উভয়ে মিলেই বাসা বাঁধে। মাটির ২০ থেকে ৬০ সেন্টিমিটার ওপরে ঝোপঝাড়ের মধ্যে পেয়ালা আকৃতির ছোট্ট বাসা বানায়। বাসার প্রধান উপকরণ হল শুকনো সরু শাখা ও শিকড়। আর মাকড়সার জাল দিয়ে সেই বাসাকে শক্তপোক্ত করে। বাসা বানানোর শেষে স্ত্রী ঝোপ টিকরা তিন থেকে ছ’টি ডিম পাড়ে। তারপর প্রায় ১২-১৩ দিন ধরে স্ত্রী ও পুরুষ উভয়ে পালা করে তা দেয়। অবশ্য স্ত্রী ঝোপ টিকরাকে বেশি সময় তা দিতে দেখা যায়। পুরুষ পাখি অনেকটা রিলিভারের কাজ করে। ডিম ফুটে বাচ্চারা বেরোলে বাবা ও মা উভয়ে মিলেই তাদের খাওয়ানোর দায়িত্ব নেয়। বাচ্চারা ১১ থেকে ১৩ দিন পর ডানায় ওড়ার পালক তৈরি হলে বাসা ছেড়ে মায়ের সাথে উড়তে শুরু করে। প্রথম প্রথম বেশি ওড়ে না, কাছাকাছি ঝোপঝাড়ের মধ্যেই মাকে অনুসরণ করে। কেবল মা-কে অনুসরণ করার কারণ হল বাবা ঝোপ টিকরা এই সময় নতুন এক সঙ্গিনীর খোঁজে প্রাক্তন সঙ্গিনী ও সন্তানদের ত্যাগ করে। এভাবে দশ থেকে বাইশ দিন কেটে গেলে বাচ্চারা সাবলম্বী হয় এবং মায়ের সঙ্গও ত্যাগ করে।

(বাঁদিকে) ঝোপ টিকরা ডাকছে। (ডান দিকে) তা দিচ্ছে ঝোপ টিকরা। ছবি: সংগৃহীত।
ঝোপ টিকরা সুন্দরবনের জনবসতি অঞ্চলে এখন তেমন দেখা যায় না। এমন হতে পারে যে ওরা আমাদের এলাকায় হয়তো আর সেভাবে আসছে না, কিন্তু অন্যত্র আসছে। ‘IUCN’ কিন্তু এদের সম্পর্কে বিপন্নতার আভাস এখনও দেয়নি। আমার বিশ্বাস, শীতের আবির্ভাব থেকে বিদায়বেলা পর্যন্ত ঝোপঝাড়ে যদি এখনও কেউ ‘চিক-চিক চিক-চিক’ বা ‘চি চুকু চিক চিক’ শব্দ শুনতে পায় তবে ভালো করে খুঁজে দেখলে ঝোপ-বিহারী ঝোপ টিকরাকে দেখা যাবেই। নাইবা থাকল তার তেমন রূপের বাহার, দূর দেশের অতিথি হিসেবে ‘সেবা’ না হোক ওরা আমাদের কাছে একটু ‘সহানুভূতি’ নিশ্চয়ই প্রত্যাশা করতে পারে। —চলবে।
* সৌম্যকান্তি জানা। সুন্দরবনের ভূমিপুত্র। নিবাস কাকদ্বীপ, দক্ষিণ ২৪ পরগনা। পেশা শিক্ষকতা। নেশা লেখালেখি ও সংস্কৃতি চর্চা। জনবিজ্ঞান আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত। বিজ্ঞান জনপ্রিয়করণের জন্য ‘দ্য সায়েন্স অ্যাসোসিয়েশন অফ বেঙ্গল ২০১৬ সালে ‘আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু মেমোরিয়াল অ্যাওয়ার্ড’ এবং শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞান লেখক হিসেবে বঙ্গীয় বিজ্ঞান পরিষদ ২০১৭ সালে ‘অমলেশচন্দ্র তালুকদার স্মৃতি সম্মান’ প্রদান করে সম্মানিত করেছে।