
ছবি: প্রতীকী। সংগৃহীত।
রামকে তাঁর প্রাপ্য রাজ্যাধিকার ফিরিয়ে দিতে ভরত এসেছেন চিত্রকূট পর্বতে। ভরতের উদ্দেশ্যে রামকে সঙ্গে নিয়ে অযোধ্যায় প্রত্যাবর্তন। তাঁর সঙ্গে রয়েছে বিপুল সৈন্যবল। অনেক অনুসন্ধানের পরে শ্বাপদসঙ্কুল নিবিড় অরণ্যে রামের আশ্রম হতে নির্গত ধূমশিখা দেখে, ভরত, রামের আশ্রয় সম্বন্ধে নিশ্চিত হলেন। রামের দর্শনলাভের জন্য উৎসুক ভরত, শত্রুঘ্নকে রামের বাসস্থানটি দেখালেন। ঋষি বশিষ্ঠকে অনুরোধ করলেন, মাতৃর্মে শীঘ্রমানয়। জননীদের শীঘ্র আনয়ন করুন। গুরুবৎসল ভরত, দ্রুত এগিয়ে চললেন। সুমন্ত্র ও শত্রুঘ্নের এবিষয়ে একান্ত আগ্রহ। তাই তাঁরাও ভরতের অনুগামী হলেন। যেতে যেতে ভরত তাপসদের আশ্রমসন্নিহিত ভাইয়ের পর্ণকুটিরটি দেখতে পেলেন। পর্ণশালার সম্মুখে বিক্ষিপ্ত ভগ্ন কাষ্ঠখণ্ড ও চয়নাবশিষ্ট পুষ্পরাশি। আশ্রমবৃক্ষগুলিতে কোথাও কোথাও রামলক্ষ্মণের স্মরণনিমিত্ত চিহ্নরূপে লম্বমান কুশচীর।
ভরত দেখলেন, শীতপ্রতিরোধের জন্যে সঞ্চিত রয়েছে, মৃগ ও মহিষের রাশি রাশি শুষ্ক পুরীষ। কিছু দূরে যেতে যেতে ধৈর্যশীল ভরত আনন্দিতমনে শত্রুঘ্ন এবং মন্ত্রীদের বললেন, মহর্ষি ভরদ্বাজের নির্দেশিত স্থানটি পাওয়া গিয়েছে। মনে হয়, অদূরেই রয়েছে,মন্দাকিনী নদীটি।অপরাহ্নে গমনে ইচ্ছুক লক্ষ্মণ, হয়তো ঊর্দ্ধে নিশানা ওই চীরবস্ত্রখণ্ডগুলি, পথের অভিজ্ঞান বা স্মরণচিহ্নরূপে আবদ্ধ করেছেন।পর্বতের পার্শ্বদেশে পরস্পর গর্জনকারী উন্নত দন্তবিশিষ্ট, বেগবান, হস্তীরা পরিক্রমণরত। অরণ্যে তপস্বীরা সতত অগ্ন্যাধান করতে ইচ্ছুক, সেই অগ্নির ধূমে সমাচ্ছন্ন দৃশ্যমান এই পথ।নিশ্চিন্ত ভরত বললেন, ওইখানেই নরশার্দূল, হৃষ্টচিত্তে গুরুদের প্রতি সেবাপরায়ণ, মহর্ষিতুল্য আর্য রামের দর্শন পাব। অত্রাহং পুরুষব্যাঘ্রং গুরুসৎকারকারিণম্।আর্য্যং দ্রক্ষ্যামি সংহৃষ্টং মহর্ষিমিব রাঘবম্।।
মুহূর্ত মধ্যে ভরত, সমীপে মন্দাকিনী নদীর দেখা পেলেন।উপস্থিত মানুষজনকে বললেন, পৃথিবীর পুরুষব্যাঘ্র, জননাথ রাম, বিজন বনে বীরাসনে উপবিষ্ট রয়েছেন,ভরত আত্মধিক্কারে মুখর হলেন। ধিক্কার আমার এই জন্ম, এই জীবন। ধিঙ্মে জন্ম সজীবিতম্। ভরতের জন্যেই লোকেশ, মহাজ্যোতির্ময় রামের এমন দুর্গতি যে সকল বাসনা পরিত্যাগ করে রাঘব রাম অরণ্যে বাস করছেন। মৎকৃতে ব্যসনং প্রাপ্তো লোকনাথো মহাদ্যুতিঃ। সর্ব্বান্ কামান্ পরিত্যাজ্য বনে বসতি রাঘবঃ।। তাই জনগণের ঘৃণার পাত্র ভরত আজ রামের প্রসন্নতাবিধানের জন্য রামের এবং সীতা ও লক্ষ্মণের চরণে পতিত হবেন। এমন বিলাপ কারী ভরত পবিত্র, রমণীয় একটি পর্ণশালার দর্শন পেলেন।
মুহূর্ত মধ্যে ভরত, সমীপে মন্দাকিনী নদীর দেখা পেলেন।উপস্থিত মানুষজনকে বললেন, পৃথিবীর পুরুষব্যাঘ্র, জননাথ রাম, বিজন বনে বীরাসনে উপবিষ্ট রয়েছেন,ভরত আত্মধিক্কারে মুখর হলেন। ধিক্কার আমার এই জন্ম, এই জীবন। ধিঙ্মে জন্ম সজীবিতম্। ভরতের জন্যেই লোকেশ, মহাজ্যোতির্ময় রামের এমন দুর্গতি যে সকল বাসনা পরিত্যাগ করে রাঘব রাম অরণ্যে বাস করছেন। মৎকৃতে ব্যসনং প্রাপ্তো লোকনাথো মহাদ্যুতিঃ। সর্ব্বান্ কামান্ পরিত্যাজ্য বনে বসতি রাঘবঃ।। তাই জনগণের ঘৃণার পাত্র ভরত আজ রামের প্রসন্নতাবিধানের জন্য রামের এবং সীতা ও লক্ষ্মণের চরণে পতিত হবেন। এমন বিলাপ কারী ভরত পবিত্র, রমণীয় একটি পর্ণশালার দর্শন পেলেন।
আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১০৭: সুভদ্রাপুত্র অভিমন্যু ও দ্রৌপদীর পঞ্চ পুত্র, কে বা কারা রইলেন পাদপ্রদীপের আলোয়?

আলোকের ঝর্ণাধারায়, পর্ব-৯o: মা সারদার কথায় ‘ঈশ্বর হলেন বালকস্বভাব’
পর্ণকুটিরটি শাল, তাল, অশ্বকর্ণ প্রভৃতি তরুর পত্রপুঞ্জে আচ্ছাদিত। কুশে সমাকীর্ণ বিশাল যজ্ঞবেদীতুল্য সেই পর্ণকুটিরটি, ইন্দ্রায়ুধসম বহু কার্মুকে সজ্জিত। কার্মুকগুলি শত্রুনিবারক, মহাভারসাধক, সুবর্ণমণ্ডিত। রবিকিরণের মতো শরগুলি তূণমধ্যে যেন প্রদীপ্তবদন সর্প। নাগ যেমন ভোগবতী অর্থাৎ নাগরাজ্যের শোভা বর্ধন করে তেমনভাবেই শোভিত সেই পর্ণকুটির। সেখানে রয়েছে, স্বর্ণাভ দুইটি অসি, স্বর্ণবিন্দু বিচিত্র শোভা সৃষ্টি করেছে এমন চর্মে অসি দুটি আবৃত। বিচিত্র স্বর্ণভূষিত গোধা (বর্ম) ও অঙ্গুলিত্রাণ দ্বারা সজ্জিত, শত্রুদের দুরাভিগম্য পর্ণকুটিরটি সিংহের গুহাসদৃশ অন্য পশুদের কাছে দুর্ভেদ্য। রামের সেই পবিত্র আশ্রমে, ভরত দেখলেন, আনত উত্তরপূর্ব কোণে, প্রজ্জ্বলিত অগ্নিসমন্বিত, বিশাল যজ্ঞবেদী।এক মুহূর্তে তিনি সেই পর্ণকুটিরে উপবিষ্ট জটাবল্কলধারী জ্যেষ্ঠ রামকে দেখলেন। দেখলেন, রামের পরিধানে কৃষ্ণসারমৃগচর্ম ও চীরবল্কল, রাম যেন দীপ্ত অগ্নিসম দীপ্যমান।
আরও পড়ুন:

উপন্যাস: আকাশ এখনও মেঘলা, পর্ব-৯: আকাশ এখনও মেঘলা

গল্পবৃক্ষ, পর্ব-২৩: তিত্তিরজাতক: পাপ ও আত্মজিজ্ঞাসা
সিংহস্কন্ধ মহাভুজ, পদ্মনেত্র, আসমুদ্র পৃথিবীর অধীশ্বর, ধর্মাচরণকারী, চিরন্তন ব্রহ্মাসম রাম, দর্ভঘাসে আবৃত ভূমিতে সীতা ও লক্ষ্মণের সঙ্গে উপবিষ্ট রয়েছেন। কৈকেয়ীপুত্র ধর্মাত্মা ভরত তাঁকে দেখে, শোক ও মোহে আপ্লুত হয়ে ছুটে গেলেন। তিনি বাষ্পসিক্ত বচনে বিলাপ করতে লাগলেন। ধৈর্য অবলম্বন করতে অক্ষম হলেন ভরত।তিনি বলতে লাগলেন, যিনি সভামধ্যে মন্ত্রীবর্গের দ্বারা সম্মানিত হতেন, সেই জ্যেষ্ঠ রাম আজ বন্য প্রাণীদের উপাস্য হয়ে আছেন। যিনি অতীতে বহু সহস্র বসনে অভ্যস্ত ছিলেন, সেই রাম এখানে ধর্মাচরণের কারণে মৃগচর্ম পরিধান করেছেন। যিনি সর্বদা বিচিত্র কুসুম ধারণ করতেন,সেই তিনি কিভাবে এই দুর্বহ জটাভার সহ্য করছেন? বিধিসম্মত যজ্ঞ সম্পন্ন করে যাঁর ধর্মার্জন সম্ভব, তিনি কি না কষ্টকর কায়িক ধর্মাচরণে প্রবৃত্ত হয়েছেন? শ্বেতচন্দন যাঁর অঙ্গরাগের অনুষঙ্গ ছিল, সেই অঙ্গ আজ ধূলিমলিন। দুঃখে ভেঙ্গে পড়ে বিলাপকারী ভরত বললেন, যে সুখী জীবন রামের প্রাপ্য ছিল, আমার জন্যই তার কষ্টকর হয়ে উঠেছে। আমি নিষ্ঠুর, লোকনিন্দিত আমার জীবনকে ধিক্কার। মন্নিমিত্তমিদং দুঃখং প্রাপ্তো রামঃ সুখোচিতঃ। ধিগ্ জীবিতং নৃশংশস্য মম লোকবিগর্হিতম্।।
আরও পড়ুন:

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১০৭: লুকাবো বলি, লুকাবো কোথায়?

সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-৯৩: সাত-সহেলি
বিলাপ করতে করতে, দুঃখী ভরতের মুখপদ্ম স্বেদসিক্ত হল। ক্রন্দনরত ভরত, রামের চরণ স্পর্শ না করেই পড়ে গেলেন। দুঃখভারাক্রান্ত, মহাবীর, রাজপুত্র ভরত,দীনকণ্ঠে শুধুমাত্র ‘আর্য’ উচ্চারণ করে আর কোনও কথাই বলতে পারলেন না। যশস্বী রামচন্দ্রকে দেখে ভরতের কণ্ঠ বাষ্পরুদ্ধ হল।উচ্চস্বরে “আর্য” এই সম্বোধন করে, চিৎকার করে উঠলেন, আর কোনও কথাই বলতে পারলেন না। আর্য্যেত্যেবাভিসংক্রুশ্য ব্যাহর্তুং নাশকৎ ততঃ। শত্রুঘ্নও কাঁদতে কাঁদতে রামের পদযুগল বন্দনা করলেন। রামচন্দ্র উভয়কে আলিঙ্গন করে অশ্রু বর্ষণ করতে লাগলেন। অরণ্যে সুমন্ত্র ও গুহ, রাজপুত্রদ্বয়ের (রাম ও লক্ষ্মণের) সঙ্গে মিলিত হলেন, যেন দিবাকর সূর্য ও নিশাকর চন্দ্র, গগনমণ্ডলে শুক্র ও বৃহস্পতির সঙ্গে মিলিত হলেন। অরণ্যে সমাগত, গজারোহী রাজাদের দেখে বনবাসী সকলে আনন্দ প্রকাশ করলেন না, অশ্রুবর্ষণ করতে লাগলেন।
আরও পড়ুন:

রহস্য রোমাঞ্চের আলাস্কা, পর্ব-৫১: রোজই দেখি আলাস্কা পর্বতশৃঙ্গের বাঁ দিকের চূড়া থেকে সূর্য উঠতে

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৭০: বিচারক
বহু পথ পার হয়ে ভরত চিত্রকূটপর্বতে এসে পৌঁছলেন। রামকে তাঁর প্রাপ্য রাজ্যাধিকার ফিরিয়ে দেবেন। তাঁকে রাজধানী অযোধ্যার সিংহাসনে অভিষিক্ত করবেন ভরত। লক্ষ্য স্থির তাঁর। সদুদ্দেশ্য,সদিচ্ছার জয় হয়তো অনেকক্ষেত্রেই সফল হয়।প্রথমিকভাবে ভরতের আংশিক উদ্দেশ্য সফল হল। রামের পর্ণকুটিরের সন্ধান পেলেন তিনি। কৈকেয়ীপুত্র ভরত, রামের অভাবে জননীদের বেদনাবোধ আন্তরিকভাবে অনুভব করেছেন। তাই প্রথমেই মায়েদের আনতে নির্দেশ দিলেন। সুমন্ত্র ও শত্রুঘ্ন তাঁর সঙ্গী।
রামের পর্ণকুটিরের চারিদিকে গার্হস্থ্যের চিহ্নগুলি ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। গার্হস্থ্যজীবনেও আশ্রমিক সর্বত্যাগী বাসনাহীন সন্ন্যাসের ছায়া। চীরবস্ত্রখণ্ড, চয়নাবশিষ্ট কুসুমরাশি, যজ্ঞবেদীর পবিত্রতাবিশিষ্ট পর্ণকুটিরটিতে রামের পরিত্যক্ত ক্ষত্রিয়জীবনের স্মৃতিভার, অস্ত্রগুলি, শোভা বিস্তার করে আছে। তাঁর যাপনে সন্ন্যাসীর নিষ্ঠা, গৃহাভ্যন্তরে অতীত ও ভাবি জীবনের যাপনানুষঙ্গ। অরণ্যজীবনের প্রতিকূলতা প্রতিরোধেও অস্ত্রগুলি প্রয়োজন। পরিধানে কৃষ্ণসারমৃগচর্ম ও চীরবল্কল, সবমিলিয়ে রামের অগ্নিতুল্য দীপ্তময় উপস্থিতি, তাঁর মনটিতে কিন্তু সন্ন্যাসীর শান্ত সমাহিত স্থৈর্য। কুটিরাভ্যন্তরে প্রজ্বলিত অগ্নিসমন্বিত যজ্ঞবেদীটি, নিত্য আহুতির প্রতীক্ষায়,রামের অরণ্যবাসে, সেটি যেন সর্বত্যাগের প্রতীক। রাজসিংহাসন নয়, বাস্তবের কঠিন মৃত্তিকা এখন সপরিবারে রামের আসন।
উত্তরাধিকারসূত্রে রাজকীয় দৈহিক সৌষ্ঠবের অধিকারী ধার্মিক রাম। অন্তরে তাঁর সর্বত্যাগের অন্তঃসলিলা ফল্গু। তাই রাজকীয় জীবনের সম্পূর্ণ বৈপরীত্যপূর্ণ, নিরাভরণ অরণ্যজীবনের কাঠিন্যের পরিবর্তে মাধুর্য, তিনি অক্লেশে বরণ করেছেন।তাই রাম রাজপুত্র হলেও তাঁর মাটির কাছাকাছি ভাবমূর্তিটিকে সাদরে গ্রহণ করেছে ভারতবাসী। ধূলিমলিন, জটাভারবহনে অক্লান্ত, রাম, অরণ্যপরিমণ্ডলে শ্বাপদসান্নিধ্যে অভ্যস্ত হয়েছেন যখন, তখন ভরত তাঁর সন্ধান পেয়েছেন। রাজকীয় জীবনের সঙ্গে রামের অরণ্যবাসের তুলনা করে, অনুশোচনায় ভেঙ্গে পড়েছেন ভরত, ক্রমান্বয়ে আত্মধিক্কারে সোচ্চার হয়েছেন।রামের সম্মুখে আবেগাপ্লুত ভরত অস্ফুট স্বরে শুধু ‘আর্য’ সম্বোধন করতে সমর্থ হয়েছেন। ভাষাহীন হয়েছেন ভরত।
রামের পর্ণকুটিরের চারিদিকে গার্হস্থ্যের চিহ্নগুলি ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। গার্হস্থ্যজীবনেও আশ্রমিক সর্বত্যাগী বাসনাহীন সন্ন্যাসের ছায়া। চীরবস্ত্রখণ্ড, চয়নাবশিষ্ট কুসুমরাশি, যজ্ঞবেদীর পবিত্রতাবিশিষ্ট পর্ণকুটিরটিতে রামের পরিত্যক্ত ক্ষত্রিয়জীবনের স্মৃতিভার, অস্ত্রগুলি, শোভা বিস্তার করে আছে। তাঁর যাপনে সন্ন্যাসীর নিষ্ঠা, গৃহাভ্যন্তরে অতীত ও ভাবি জীবনের যাপনানুষঙ্গ। অরণ্যজীবনের প্রতিকূলতা প্রতিরোধেও অস্ত্রগুলি প্রয়োজন। পরিধানে কৃষ্ণসারমৃগচর্ম ও চীরবল্কল, সবমিলিয়ে রামের অগ্নিতুল্য দীপ্তময় উপস্থিতি, তাঁর মনটিতে কিন্তু সন্ন্যাসীর শান্ত সমাহিত স্থৈর্য। কুটিরাভ্যন্তরে প্রজ্বলিত অগ্নিসমন্বিত যজ্ঞবেদীটি, নিত্য আহুতির প্রতীক্ষায়,রামের অরণ্যবাসে, সেটি যেন সর্বত্যাগের প্রতীক। রাজসিংহাসন নয়, বাস্তবের কঠিন মৃত্তিকা এখন সপরিবারে রামের আসন।
উত্তরাধিকারসূত্রে রাজকীয় দৈহিক সৌষ্ঠবের অধিকারী ধার্মিক রাম। অন্তরে তাঁর সর্বত্যাগের অন্তঃসলিলা ফল্গু। তাই রাজকীয় জীবনের সম্পূর্ণ বৈপরীত্যপূর্ণ, নিরাভরণ অরণ্যজীবনের কাঠিন্যের পরিবর্তে মাধুর্য, তিনি অক্লেশে বরণ করেছেন।তাই রাম রাজপুত্র হলেও তাঁর মাটির কাছাকাছি ভাবমূর্তিটিকে সাদরে গ্রহণ করেছে ভারতবাসী। ধূলিমলিন, জটাভারবহনে অক্লান্ত, রাম, অরণ্যপরিমণ্ডলে শ্বাপদসান্নিধ্যে অভ্যস্ত হয়েছেন যখন, তখন ভরত তাঁর সন্ধান পেয়েছেন। রাজকীয় জীবনের সঙ্গে রামের অরণ্যবাসের তুলনা করে, অনুশোচনায় ভেঙ্গে পড়েছেন ভরত, ক্রমান্বয়ে আত্মধিক্কারে সোচ্চার হয়েছেন।রামের সম্মুখে আবেগাপ্লুত ভরত অস্ফুট স্বরে শুধু ‘আর্য’ সম্বোধন করতে সমর্থ হয়েছেন। ভাষাহীন হয়েছেন ভরত।

ছবি: প্রতীকী। সংগৃহীত।
রামায়ণের সর্বত্র সৌভ্রাতৃত্ববোধের মায়াবন্ধন যেন জড়িয়ে রয়েছে।যৌথ পারিবারিক জীবনে,জ্যেষ্ঠ রামের ভূমিকা, ঠিক গৃহস্থের সুখী গৃহকোণের পেলব আস্তরণে নিকানো আঙিনাটি যেন। যেখানে স্নেহ,প্রীতি,ভালবাসার রোদ খেলে বেড়ায়। রামচন্দ্রের অনাসক্ত ভাবমূর্তিটি মাটিমাখা পার্থিব সম্পর্কের ছোঁয়ায় মানবিক রূপ লাভ করেছে। তিনি যে ভারতীয় যৌথপারিবারিক জীবনের স্নেহশীল বড় ভাইটি।সমস্ত কামনা ত্যাগ করেছেন বনবাসী রাম, কিন্তু সম্পর্কের মায়াময় বন্ধন অস্বীকার করতে পারেননি। দেখামাত্র অশ্রুধারাবর্ষণে সিক্ত হয়ে উঠেছে চোখ দুটি। মুছে গেছে মানসিক ও বিচ্ছিন্নতার দূরত্বের সীমারেখা। আর আত্মধিক্কারে সোচ্চার ভরত?রামের বনবাস জীবনের ক্লেদ গায়ে মেখে, অনবরত নিজেকে দোষারোপ করে চলেছেন। এই সম্পর্কের টানাপোড়েনের চোরাগলিতে চরিত্রগুলি যেন আরও প্রাণময় সজীব হয়ে উঠেছে। রামায়ণের আছে, মানুষের আবেগ, সংরাগ, দ্বন্দ্ব,বেদনা, সপ্রেম পারস্পরিক আকর্ষণ, মধ্যে রয়েছে নৈতিকতার মানদণ্ড ‘ধর্ম’। নৈতিকতার সুতোয় বাঁধা সম্পর্কের জোড়গুলিতে তাই দৈব প্রতিভূ রাম নন, মহান হয়ে উঠেছেন ধার্মিক নীতিপরায়ণ রাম।
দেবতাদের নৈতিকতার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হয় না, হতে হয় মানুষকে। কারণ মানুষেরই আছে মান ও হূঁশ।তাই আদর্শ মানুষ রাম, আজও ভারতবাসীর মনোজগতে রাজত্ব করেন, মন্দিরে রয়েছে আনুষ্ঠানিকতাসর্বস্ব শুধুমাত্র মূর্তিখানি। যেমন একজন জননায়ক বা প্রখ্যাত জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব কালপ্রবাহে যুগান্তরে, জনতার শ্রদ্ধা, ভালোবাসা অর্ঘ্যে পূজিত হতে হতে, ক্রমে ভক্তদের নিয়মিত ভজনায় পরিণত হন একজন আইকন বা বিগ্রহে। শেষে হৃদয়মন্দিরে শুধু নয়, দেবমন্দিরে প্রতিষ্ঠিত হয়ে,তাঁর মধ্যে প্রবাদপ্রতিম দৈব রূপারোপ ঘটে।ভারতীয় জনজীবনে, রাম আছেন পারিবারিক গার্হস্থ্যজীবনের হৃদমাঝারে, মন্দির তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক অধিষ্ঠানমাত্র, কথাটি বোধ হয় অতিরঞ্জিত নয়। —চলবে।
দেবতাদের নৈতিকতার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হয় না, হতে হয় মানুষকে। কারণ মানুষেরই আছে মান ও হূঁশ।তাই আদর্শ মানুষ রাম, আজও ভারতবাসীর মনোজগতে রাজত্ব করেন, মন্দিরে রয়েছে আনুষ্ঠানিকতাসর্বস্ব শুধুমাত্র মূর্তিখানি। যেমন একজন জননায়ক বা প্রখ্যাত জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব কালপ্রবাহে যুগান্তরে, জনতার শ্রদ্ধা, ভালোবাসা অর্ঘ্যে পূজিত হতে হতে, ক্রমে ভক্তদের নিয়মিত ভজনায় পরিণত হন একজন আইকন বা বিগ্রহে। শেষে হৃদয়মন্দিরে শুধু নয়, দেবমন্দিরে প্রতিষ্ঠিত হয়ে,তাঁর মধ্যে প্রবাদপ্রতিম দৈব রূপারোপ ঘটে।ভারতীয় জনজীবনে, রাম আছেন পারিবারিক গার্হস্থ্যজীবনের হৃদমাঝারে, মন্দির তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক অধিষ্ঠানমাত্র, কথাটি বোধ হয় অতিরঞ্জিত নয়। —চলবে।
* মহাকাব্যের কথকতা (Epics monologues of a layman): পাঞ্চালী মুখোপাধ্যায় (Panchali Mukhopadhyay) অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপিকা, সংস্কৃত বিভাগ, যোগমায়া দেবী কলেজে।