জীবনে বহুকৌণিক ও আপাতবিরুদ্ধ বিবিধ ধর্মের নির্ণয় ও পালনেই আসে সার্থকতা। মহাদর্দর সেই কর্তব্যের পালনে চ্যুত হননি বলেই তাঁর সেই ক্ষুদ্র তুচ্ছ জীবন একদা মিশবে মহাসাগরে, মহাজীবনের ছন্দোময় মন্দমধুর মহাধ্বনির অমলিন ঝঙ্কারে সার্থক হবে একদিন।
জীবনে বহুকৌণিক ও আপাতবিরুদ্ধ বিবিধ ধর্মের নির্ণয় ও পালনেই আসে সার্থকতা। মহাদর্দর সেই কর্তব্যের পালনে চ্যুত হননি বলেই তাঁর সেই ক্ষুদ্র তুচ্ছ জীবন একদা মিশবে মহাসাগরে, মহাজীবনের ছন্দোময় মন্দমধুর মহাধ্বনির অমলিন ঝঙ্কারে সার্থক হবে একদিন।
সেবার বোধিসত্ত্ব স্বর্গের অন্যতম দেবপুত্রভাবে অবস্থান করছেন। ব্রহ্মদত্ত তখন বারাণসীর রাজা, সেসময় বারাণসীতে এক বিশাল উত্সব আয়োজিত হল। বারাণসী বলে কথা! সেই মহোত্সবে নাগ, পক্ষী, দেবগণ নানালোক থেকে বারাণসীতে আসতে থাকলেন। নানাবিধ স্বর্গলোক থেকে দেবতারা আসছেন, তাঁদের মধ্যে চারজন দেবপুত্র ছিলেন। বোধিসত্ত্ব এঁদের অন্যতম।
আজ যে ক্ষুদ্র, কাল সে বৃহৎ। আজ যে দীন, কাল সে-ই দীনবন্ধু। যাকে যতটা ভালো ভাবো সে হয়তো ততো ভালো নয়। যাকে যতটা খারাপ ভেবেছো, সেও ততটা খারাপ নয়। দোষে-গুণে যে পূর্ণ হয়ে যে জীবদেহ আর প্রাণের খেলা তার গুণের ভাণ্ডারে ত্রিবিধ গুণের টানাপোড়েন চলছে অবিরত।
সেবার বোধিসত্ত্ব এক গোধারূপে জন্ম নিয়েছেন। সেই গোসাপটি প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে অরণ্যে বসবাস শুরু করল। কাছেই এক জটাজুটধারী অজিনবাস এক ব্রহ্মচারী তাপসের পর্ণকুটীর। সেই তাপস অত্যন্ত দুঃশীল। গোসাপটি নিত্যই তাপসের আশ্রমে চরতে যায়, তাঁকে প্রণাম করে আসে। এভাবেই দিন কাটছিল।
সেবার বোধিসত্ত্ব রাজার ঘরে জন্মেছেন। ক্রমে ক্রমে তিনি কালের নিয়মেই সিংহাসনে আসীন হলেন। রাজ্যাধিকার পেয়ে ধর্মমতে প্রজাপালন করতে লাগলেন। এক ব্রাহ্মণ রাজার রাজপুরোহিত ছিলেন, তাঁর নাম রুহক। এই কাহিনি এই রুহকের। জাতকমালার অন্তর্গত রুহক জাতক।
কর্মের এই দুরূহ স্বরূপ কীরকম ঠিক? কোনটি কর্ম, কোনটি অকর্ম, কোনটি বিকর্ম তা না জানলে নিষ্কাম কর্মের সাধন যথার্থ হতে পারে না। কর্তব্যের অনুষ্ঠান হল কর্ম, নিষিদ্ধের অর্থাৎ অকর্তব্যের অনুষ্ঠান বিকর্ম। কর্মোত্তীর্ণ সন্ন্যাস হল কর্মের অকরণ বা অকর্ম। বেদবিহিত কর্তব্যের যথার্থ অনুগমন কর্তব্য বলে নন্দিত।
সাহিত্যিক হিসেবেও বুদ্ধিতে ক্যাথেরিন তার চেয়ে অনেক উঁচুতে। এটা প্রতি নিয়ত বুঝতেন মারে। তাই পুরোপুরি আত্মমগ্ন থাকতেন নিজের পড়াশুনার জগতে। স্বার্থপরের মতো থাকতেন, যদিও স্বামী-স্ত্রী তারা। সংসারের সমস্ত কাজই ছিল ক্যাথেরিনের। কোথাও বেড়াতে গেলে প্লান করতেন মারে আর সব আয়োজন এবং কাজ ছিল ক্যাথেরিনের।
ধর্মশাস্ত্রে অনেক বিধিনিষেধ আর পরামর্শ রাজার জন্য বরাদ্দ হয়েছে বটে, এমনকী রাজা বিপত্গামী হলে তাঁর অমাত্যগণ তাঁকে নানা উপায়ে পথে আনার চেষ্টা করবেন এমন পরামর্শ আছে অর্থশাস্ত্রে। কিন্তু পাত্র-মিত্র-অমাত্যরাও যদি তথৈবচ হয়! তাঁরাও উত্পীড়ক, তাঁরাও প্রবঞ্চক, শঠ, ধূর্ত অমানুষ।
কালিদাস সেই কবি, যিনি প্রমাণ করেছেন হাজার বিধিবিধান মেনে নিয়েও প্রতিভা তার সত্য স্বর শোনাতে পারে।—বুদ্ধদেব বসু।
বোধিসত্ত্ব সেবার এক গৃহস্থের ঘরে জন্ম নিয়েছেন। যথাকালে প্রাপ্তবয়স্ক হলে তাঁর বিবাহ হল সুজাতার সঙ্গে। না, এই সুজাতা তাঁকে পায়সভক্ষণ করাননি। কিন্তু তিনি সুজাতা, সুকুলোদ্ভবা। রূপ-লাবণ্যে ও চরিত্রবলে তিনি শ্বশুরালয়ে সকলের মন জয় করেছিলেন। বোধিসত্ত্ব তাঁর স্ত্রীকে নিয়ে আনন্দে কালযাপন করছিলেন।
নিউজিল্যান্ডের এক পুঁজিপতির মেয়ে ক্যাথরিন। বাবা শুধু সম্পত্তি বাড়ানোর পিছনে ছুটেছেন সারাজীবন। ক্যাথেরিনের মতে তার বাবা “the richest man in New zealand and the meanest”. বাবার ভালোবাসার অভাব ছোট থেকে তাকে নিঃস্ব করেছে। শুধু ভালোবাসা নয়, আর্থিক কোনও সহায়তা এবং জোটেনি অতি দুর্দিনে।
বাল্যবয়সে পিতার মৃত্যুর পর কুমারদাস তাঁর মাতুলালয়ে প্রতিপালিত হতে লাগলেন। দুই মাতুলই একাধারে বীর অন্যদিকে পণ্ডিত, সাহিত্যচর্চার আটঘাট জানতেন। তাঁদের উৎসাহে কুমারদাসের বিদ্যাচর্চার পাশাপাশি শুরু হল সাহিত্য রচনার নিরন্তর অভ্যাস। ফল মিলল। কুমার রচনা করলেন আদিকাব্য রামায়ণ অনুসারী পঁচিশটি সর্গবিশিষ্ট বিখ্যাত মহাকাব্য ‘জানকীহরণ’।
রাজার ঘোড়াশালে এক মঙ্গলাশ্ব ছিল, নাম তার পাণ্ডব। তার সহিস ছিল খঞ্জ। তার নাম গিরিদন্ত। স্বভাবতঃই তার চলত্শক্তি অবাধ ছিল না। কিন্তু অশ্বটির রজ্জু ধরে সহিস যখন চলাফেরা করত, তখন অশ্বটি ভাবতো তাকে বুঝি এ ভাবেই চলতে শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে।
কথায় বড় না হয়ে কাজে বড় হতে বলে কেন? কথা আগে নাকি কাজ? কথা সকলের কাছে বশ মানে না, এ সত্য বটে। কথা, সার্থক বাকের প্রয়োগ নিয়ে শাস্ত্রে বহু উপদেশ, অনুশাসন। বাক্ আর বাণ একবার প্রযুক্ত হলে তাকে ফিরিয়ে নেওয়া অসম্ভব, তবু বিশ্বজুড়ে বাকের অপ্রতিহত গতি।
এ বার একটা বানরের গল্প জাতকমালা থেকে। সেবার বোধিসত্ত্ব রাজার অমাত্য হয়ে জন্মেছেন এবং প্রভুকে ধর্ম ও অর্থবিষয়ে পরামর্শ দিয়ে তাঁর সর্বার্থসিদ্ধি করেন। একবার প্রান্তদেশীয় জনগণ বিদ্রোহী হল, সেই সংবাদ রাজার কাছে পৌঁছল।