শকুন্তলার প্রথম অঙ্কে হরিণটা ঊর্ধ্বশ্বাসে দৌড়চ্ছে। পিছনে দুষ্যন্ত। রাজা এসে পৌঁছলেন কণ্বের আশ্রমে। তারপর শকুন্তলাকে দেখলেন। দেখেই প্রেম জাগল। প্রণয় থেকে পরিণয় হলো। তারপর প্রত্যাখ্যান। তারপর পুনর্মিলন। তারপর জল অনেক গড়িয়েছে, মনে পড়ে রুবি রায়?
শকুন্তলার প্রথম অঙ্কে হরিণটা ঊর্ধ্বশ্বাসে দৌড়চ্ছে। পিছনে দুষ্যন্ত। রাজা এসে পৌঁছলেন কণ্বের আশ্রমে। তারপর শকুন্তলাকে দেখলেন। দেখেই প্রেম জাগল। প্রণয় থেকে পরিণয় হলো। তারপর প্রত্যাখ্যান। তারপর পুনর্মিলন। তারপর জল অনেক গড়িয়েছে, মনে পড়ে রুবি রায়?
মুরি’র দেখা ঝগড়ার এক ঝলক, লরেন্স ফ্রিডাকে বললেন, এই শেষ। আর তোমার সঙ্গে থাকা যাবে না। অসম্ভব। তুমি জানো আমার কি টাকা-পয়সা আছে। তোমার ভাগেরটা দিয়ে দিচ্ছি। বেরিয়ে যাও। বলে ওপর তলার থেকে এসে টেবিলের ওপর গুনে গুনে ষোল sovereign (মুদ্রা) রাখলেন। ফ্রিডা দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে। হাতে টুপি ও কোট। কোথায় যাবেন জানেন না।
জাতকমালার যে কাহিনি আজকের প্রতিপাদ্য সেখানে বোধিসত্ত্বের প্রত্যক্ষ ভূমিকা দেখা যাবে না। কাল বারাণসীরাজ ব্রহ্মদত্তের শাসনকাল, স্থান হিমালয়ের গহন বন। বোধিসত্ত্ব সেবার নাকি ওই বনের কোনও এক বনস্পতিতে বৃক্ষদেবতা হয়ে জন্মান্তর লাভ করেছেন। তিনি এই কথার নীরব সাক্ষী, মুখ্য চরিত্রগুলির মধ্যে তাঁর অন্তর্ভাব নেই।
বাজশ্রবা সেদিন খুব ব্যস্ত। রাশভারী লোক। সকলে তাঁর কথায় তটস্থ। শুধু ঠ্যাঁটা ছেলেটার কোনও ভয়ডর নেই। জ্বালিয়ে খেল আর কী। শিশু মনস্তত্ত্ব তিনিও খানিক বোঝেন। একেই আজ বিশ্বজিৎ যাগের শেষে দানানুষ্ঠান সম্পন্ন করার তাড়া, তার ওপর হতচ্ছাড়া ছেলেটা বলে কি, “আমায় কাকে দিচ্ছ?”
অসংযম জাগতিক দ্বন্দ্বের মূলগত। পারস্পরিক বিদ্বেষ কিংবা জুগুপ্সা, ঈর্ষা কিংবা পরশ্রীকাতরতা, অহংবোধের দুর্দমনীয় আকর্ষণ কিংবা পরপীড়ায় সুখানুভূতি মানুষকে সদাসর্বদা ঘিরে রেখেছে। নাগরিক জীবনে, রাষ্ট্রজীবনে, ব্যক্তিজীবনে অথবা সংসারে পরপ্রবঞ্চনা ও আত্মপ্রবঞ্চনার দুর্বিপাক মানুষের অহংবোধকে নিয়ত তৃপ্ত ও আগ্রাসী করে তুলছে।
ফ্রিডার একাধিক প্রেমিক ছিলেন। যৌন জীবনে স্বাধীনতা থাকাই তিনি নিজের স্বাধীনতা মনে করতেন। লরেন্সকেও তেমনি এক প্রেমিক ভেবেছিলেন। কিন্তু লরেন্স লুকোছাপার পক্ষে নন। একবার দুজনে দেখা করতে গিয়ে জার্মানির পুলিশের হাতে পরেন লরেন্স। তাকে ইংরেজ এর গুপ্তচর ভেবে ধরে নিয়ে যায়। ফ্রিডা তার বাবার আধিপত্যের জোরে লরেন্সকে মুক্ত করেন।
তথ্যও কখনও কখনও জ্ঞান। “উইসডম” বলতে যা বোঝায় তার থেকেও অধিক প্রয়োজন সার্বিক নিয়ন্ত্রণের শিক্ষা, ম্যানেজমেন্ট। এর সঙ্গেই পৃথিবীতে পণ্য-ই একমাত্র সত্যে পরিণত। সকল জ্ঞানবুদ্ধি পণ্যকে কেন্দ্র করে পাক খাচ্ছে, বিশ্বের হাটে দেবী সরস্বতীর দপ্তর, লক্ষ্মীদেবীর দপ্তর অদৃশ্য সুতোয় বাঁধা পড়েছে বহুদিন।
আজকের সরস্বতীর বাস ঠিক কোথায় তা নিশ্চিত নয়। তিনি কণ্ঠে, কলমে, বুদ্ধিতে, বোধে, চেতনায় নাকি চোয়ালে তা নির্ধারণ করে কে? কলম থেকে কি-প্যাডে তিনি এসেছেন, বাক্ থেকে বাচালতায় তিনি উঠেছেন, বাণী থেকে খিল্লি হয়ে তিনি বহুব্যাপিনী হয়েছেন। বীণাপাণির বীণার স্পেলিং আজ অবাধে “বিনা” হয়ে বীণাকে মুক্তি দিয়েছে।
যে বীরহৃদয় কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়েছিল, মোহভার ও বৈকল্যের চোরা স্রোতে হতোদ্যম হয়েছিল, সেই বীরহৃদয়েই অনুরণিত হচ্ছে এক সঙ্গীত। সে সঙ্গীতের মূর্চ্ছনা যেন তার শোণিতধারায় বহমান হয়ে তাকে উজ্জীবিত করছে, অন্তর্লোকে সঞ্চিত অজ্ঞানতমিস্রা দূর হয়ে যাচ্ছে শ্লোকে শ্লোকে। শোকোত্তীর্ণ, মোহোত্তীর্ণ জীবনের বাঁকে বাঁকে ঘনায়মান অন্ধকারে স্নিগ্ধ সন্ধ্যাদীপের আলো জ্বলে উঠছে অজস্র, অগণ্য।
লরেন্স নিজে ক্যাথেরিন ম্যান্সফিল্ডকে ১৯১৮ সালে লিখেছেন, স্বামী অবশ্যই স্ত্রীর আগে চলবে। পিছন ফিরে তাকিয়ে কোনও জিজ্ঞাসার বা অনুমতির প্রয়োজন নেই। স্ত্রী-স্বামীকে বিনা বিতর্কে অনুসরণ করবেন। আমার এটাই দৃঢ় বিশ্বাস। ফ্রিডা অবশ্য তা করে না।
বোধিসত্ত্ব সেবার বারাণসীর কাশীগ্রামে জন্মগ্রহণ করলেন ব্রাহ্মণকুলে। বয়ঃপ্রাপ্তির পর সংসারে তাঁর মন টিকল না। বিষয়বাসনা ত্যাগ করে তিনি প্রব্রজ্যা গ্রহণ করলেন, ক্রমে লাভ করলেন ধ্যানবল, হিমালয়ের এক বিজন বনভূমিতে ধ্যানস্থ হলেন অবশেষে।
নৈমিষারণ্যে সেদিন চাঁদের হাট বসেছে। অগ্রগণ্য সকল ঋষিগণ উপস্থিত। ঋষি মেধা, অত্রি, ধৌম্য, গৃত্সমদ, যাজ্ঞবল্ক্য, বিশ্বামিত্র, অষ্টাবক্র, মহাতপাসহ অনেকেই সভা উজ্জ্বল করে বসে আছেন। এছাড়াও আচার্য পাণিনি মাতুল ব্যাড়ির সঙ্গে এসেছেন এই মহতী সভায়। আচার্য কৌটিল্য এসেছেন, রাজনীতিজ্ঞ কৌণপদন্ত, বাতব্যাধি বসে উৎকৃষ্ট তক্র পান করছেন। মধ্যমণি আচার্য বৈশম্পায়ন। পরস্পর বিশ্রম্ভালাপ, দেশ-দশের খবরাখবর আদানপ্রদান চলছে।
একদা লক্ষ্যভেদী আজ এই রণভূমিতে নিতান্ত অসঙ্গ, একা। তখন এক যুগন্ধর বাগ্মী পুরুষ বলতে থাকলেন ধর্মের বাণী, কর্তব্যের উপদেশের সঙ্গেই আত্মজাগরণের বরাভয় শোনালেন, স্মরণ করালেন শরণাগতকে। জীবনমৃত্যুর দোলাচল তাঁর ভাষ্যে যেন হয়ে উঠল নটরাজের চরণযুগলের নৃত্যমধুর নুপূরনিক্বণ অথবা মহাকালের দুই হাতে শোভমান কালের মন্দিরার নিত্যধ্বনি।
সুভাষচন্দ্র বসুর জন্মশতবর্ষ পেরিয়ে গিয়েছে বহুদিন। গত সহস্রাব্দের শেষলগ্নেই। তারপর নতুন সহস্রাব্দ এল, দুনিয়া আর দিনকাল বদলে গেল কত– সকলেই ‘পুরনো দিন’ বলতে যা বোঝে তা ঝড়ের বেগে পিছনে ছুটছে, আজ যেটা মনে হয় এই তো গতকালের কথা বুঝি, আগামিকাল-ই তা যুগের ওপারে চলে গিয়েছে এমন বোধ হবে। এই চলমান সময়ে, গতিময় মূল্যবোধের পৃথিবীতে তেইশে জানুয়ারি আসে বাংলার বুকে।
বোধিসত্ত্ব সে জন্মে রাজা ব্রহ্মদত্তের এক প্রধান অমাত্য হয়ে রাজসন্নিধানে রাজসেবা করছেন। বারাণসীরাজ ব্রহ্মদত্ত অত্যন্ত বাচাল ছিলেন। রাজপদে আসীন থেকে এমন বাচালতা কাম্য নয়, উল্টে তা বিপদ ডেকে আনতে পারে। অমাত্য সুযোগের অপেক্ষা করতে লাগলেন, অপেক্ষা করতে লাগলেন একটা যথাযথ দৃষ্টান্তের, যার সাহায্যে তিনি রাজাকে সচেতন করতে পারবেন।