রামায়ণ ও মহাভারত–এই দুটি প্রাচীন মহাকাব্যের নৃত্যনাট্যরূপে উপস্থাপন ভারত ও ইন্দোনেশিয়ার শিল্পকলাকে এক সূত্রে গ্রথিত করেছে।
রামায়ণ ও মহাভারত–এই দুটি প্রাচীন মহাকাব্যের নৃত্যনাট্যরূপে উপস্থাপন ভারত ও ইন্দোনেশিয়ার শিল্পকলাকে এক সূত্রে গ্রথিত করেছে।
মনে পড়ে আমার বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক স্তরে প্রবেশ পর্বের কথা। বিভাগে অনেক অধ্যাপক-অধ্যাপিকা, সকলেই খুব ভালো। সুন্দর পরিবেশ, সঙ্গে শেখার আনন্দ। এগিয়ে চলল দিন। তারপর এল দ্বিতীয় ষাণ্মাসিকের প্রথম ক্লাসের সেই দিনটি—২ জানুয়ারি। শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করলেন এক অধ্যাপিকা, আগে তাঁর ক্লাস পাইনি, আমার কাছে একদম নতুন। ব্যক্তিত্বপূর্ণ, গম্ভীর অথচ সাবলীল ভঙ্গিতে সুন্দর পড়ানোর সঙ্গে মিশে থাকা মিষ্টি হাসি। সেইদিনই সম্ভবত আমার কাঁচা মনে একটি দাগ কাটলেন তিনি। যত দিন যায় সেই দাগ একটু একটু করে গাঢ় হতে থাকে। আস্তে আস্তে আমারও সেই কম কথা...
বাঙালির প্রাণের উৎসব বাংলা নববর্ষ। পৃথিবীর যেখানে যত বাঙালি আছেন, তারা সবাই উৎসবমুখর হয়ে বাংলা নববর্ষ পালন করেন। এই দিনটি যেমন আনন্দ উল্লাসের তেমনি পরস্পর কুশল বিনিময় ও কল্যাণ কামনার দিন। সারা বছরের সমস্ত গ্লানি মুছে দিয়ে পাওয়া না পাওয়ার হিসাব চুকিয়ে প্রতি বছর আসে পয়লা বৈশাখ। নববর্ষ উপলক্ষে বৈশাখ মাসের প্রথম দিনেই গ্রামে-গঞ্জে শহরে বিভিন্ন স্থানে মেলা বসে। মেলা চলে বৈশাখ জুড়ে। এই মেলা বাঙালি সংস্কৃতির ঐতিহ্য। পয়লা বৈশাখ ব্যবসায়ী মহলে হালখাতার দিন। 'হাল' শব্দটি সংস্কৃত এবং ফরাসি দু' ভাষাতেই পাওয়া যায়।...
এই তো মেরেকেটে বছর চল্লিশের ওপারেই এমন হাঁসফাঁসানো সময়কালে কমলাখামে লালচে 'পহেলা বৈশাখ' লেখা নেমন্তন্ন পত্তরগুলো যেন নতুন করে আশা জাগানিয়া হয়ে দেখা দিত। তাবৎ বাঙালিমন—'হে নূতন দ্যাখা দিক আরবার'— রকমে সানাইয়ের পোঁ ধরত নিজ নিজ সাধ্যমতো। সে নেমন্তন্ন পত্তরের বকলমে আসলেই হাতেগরম যা পাওয়া যেত তা হল হালখাতার নামে সান্ধ্য বিনোদনের ছুতো। পয়লা বোশেখের সকালবেলা লুচি ছোলার ডালের পরে পরেই 'পড়তে বোস'—জাতীয় তালকাটানো দুঃখটা হজম করা তো একমাত্র সন্ধেবেলা ওই দোকানে দোকানে ঘুরতে পাব ভেবেই। নতুন ছিটের ফ্রকের কড়কড়ানি অগ্রাহ্য করে...
'নিশি অবসানপ্রায়, ওই পুরাতন বর্ষ হয় গত। আমি আজি ধূলিতলে এ জীর্ণ জীবন করিলাম নত।' সৌর বর্ষপঞ্জি অনুযায়ী বছরের প্রথম মাস হিসেবে গণ্য করা হয় বৈশাখকে। চক্রাকারে আমাদের ঋতুসমূহের পরিবর্তন হয়। বছরের শেষদিন চড়ক নামই সেই বর্ষশেষ ও বর্ষবরণের ইঙ্গিত দেয়। বৈশাখ আসে নতুনের ডাক নিয়ে। নতুনকে বরণ করার জন্য আমরা সকলেই উদগ্রীব হয়ে থাকি। অনেকেই মনে করেন বাঙালিদের কাছে নববর্ষ মানে শুধুই নতুন আর্থিক বছরের সূচনা, ব্যবসায়িক লেনদেন ও খাওয়াদাওয়া। কিন্তু শুধু কি তাই? রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায় বলতে গেলে বলতে হয় 'সত্য আলোক ও...
রাজার সিন্দুকে টুনটুনির সম্পদ হারিয়ে যাওয়ার কাহিনি তো সভ্যতার এক প্রাচীন ইতিহাস, কিন্তু সে কাহিনি তেমন করে আর কেই-বা বলতে পারে? পেরেছিলেন একজন। তাকে তোমরা সবাই চেনো। প্রাণীকুলকে মানবজীবনের রূপকে প্রাণদান করতে তাঁর থেকে ভালো আর কেই-বা পারত? তিনি আর কেউই নন, তিনি হলেন উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরি। সুকুমার রায়ের পিতা, সত্যজিৎ রায়ের পিতামহ উপেন্দ্রকিশোর, যাঁর গুরুত্ব বাংলাসাহিত্য ঠিকমতো অনুধাবন করার আগেই যেন একটা যুগ ভোজবাজির মতো হুশ করে শেষ হয়ে গেল। টুনটুনির জীবনের সত্যিকারের যন্ত্রণাটুকু আর সেভাবে কখনওই বুঝে ওঠা হল না...
বসন্ত সমাগত। ঋতুরাজ বসন্তের আগমনবার্তা আকাশে বাতাসে। ষড়ঋতুর মধ্যে শ্রেষ্ঠ বসন্তই পারে মনের জীর্ণ পুরাতন আবর্জনা সরিয়ে এক নতুন প্রাণসঞ্চার ঘটাতে। তাই এই সময়ে প্রায় সমস্ত দেশের মানুষ মেতে ওঠেন বসন্ত বা রঙের উৎসবে। দোল বা হোলি উৎসব হিন্দুদের পবিত্র উৎসব হলেও এর সঙ্গে জড়িয়ে আছেন অন্য জাতি উপজাতিরাও। শুধু ভারতেই নয় তার বাইরেও রঙের উৎসব পালিত হয়। যোগেশচন্দ্র রায় বিদ্যানিধি মহাশয় তার 'পূজাপার্বণ' গ্রন্থে বলেছেন, 'কেহ কেহ দোলযাত্রাকে বসন্তোৎসব মনে করিয়াছেন কিন্তু বসন্তোৎসব নামে কোন উৎসব পাঁজিতে নাই, স্মৃতিতে...
বাতাসে বারুদের গন্ধ। দীর্ঘসূত্রী অ-সুখ আর অসূয়া-কালনাগিনীর বিষশ্বাসে বিশ্ব টলোমলো। এর মধ্যেই তিথির পরে তিথির নাটে এসে উপস্থিত বসন্তপূর্ণিমার চাঁদের তরণীখানি, মন বলে চলো যাই শান্তিনিকেতন— তবে আজকের যে শান্তিনিকেতনের বসন্ত উৎসব তার স্রষ্টা কিন্তু রবীন্দ্রনাথ নন। কবির কনিষ্ঠ পুত্র ছোট্ট শমীন্দ্রনাথই সেই বসন্ত উৎসবের স্রষ্টা। বসন্তের শ্রীপঞ্চমীর দিন শমী সৃষ্টি করলেন প্রকৃতিবন্দনার এই অভাবনীয় উৎসব। কবি তখন বাইরে। শমী তাঁর কয়েকজন বন্ধু মিলে পালন করলেন এই উৎসব, শান্তিনিকেতনে। শমী ওই দিন গেয়েছিলেন, 'এ কি লাবণ্যে পূর্ণ...
আমাদের মফস্বলি ছেলেবেলায় একুশে ফেব্রুয়ারির মাতামাতি ছিল না কোথাও। হ্যাঁ, সচেতনেই উচ্চারণে আনলাম শব্দটা— 'মাতামাতি'! এখন তো জামায়-শাড়িতে, বিশেষ বিজ্ঞাপনী দেখনদারিতে ভাষাদিবস চাকচিক্যে ঠাসা।সে চকমকির কোথায় যে আগুন, তা জানে হাতেগোনা কয়জনা, জানা নেই, তবে এও একরকমে বেশ ! অন্তত বছরে একবার করে মায়ের ভাষার মর্যাদার কথাটা মনে পড়ে তো আমাদের অধিকাংশ উত্তর প্রজন্মের। যা বলছিলাম,—ভাষার জন্য, বিশেষত নিজের মাতৃভাষাকে সম্মান 'দেখানোর' জন্য কখনও গোটা একটা দিন সরিয়ে রাখা যায়, সে দিনটাতে অশ্রুরুদ্ধ পুষ্পস্তবক হয়ে ওঠা যায় বুকের...
সারাবছর যে আমরা আপন ভাষা, মাতৃভাষা কিংবা অন্য ভাষা নিয়েও খুব ভাবি তা নয়। একটা একুশে ফেব্রুয়ারি এসে পড়লেই আমরা আলোচনায় আসি, তর্কে জড়াই আর পার্বণী উদযাপনে মাতি। একটা রক্তস্নাত আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে মুখের ভাষাকে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠা দেবার যে উদ্দীপনা, তাকে আমরা শুধু আজ বুঝি শুধু কিছু অনুষ্ঠান উদযাপনের পরিসরেই সীমাবদ্ধ রাখি। গৌরবের অনুভবে তাকে নিত্যদিনের জীবনচর্যায় লালন পালন আর করা হয়ে ওঠে কই! পৃথিবীতে প্রায় ২০ কোটির ওপর মানুষ বাংলা ভাষায় কথা বলেন। ভাষা ব্যবহারের নিরিখে বিশ্বে বাংলার স্থান সপ্তম। আর ভারতে বাংলায় কথা...
তখনও কলকাতা শহরে ফ্ল্যাটের এত রমরমা ছিল না৷ উত্তর কলকাতার পাশাপাশি দক্ষিণ কলকাতাতেও বাড়ি ছিল অনেক৷ ছিল নতুন বাড়ি, পুরনো বাড়ি, টানা বারান্দা, চোকলা খসে পড়া দেওয়ালে বাসি হয়ে আসা নীলছোপ আর তার সঙ্গে, রবিবার দুপুরে মাংসভাত সহযোগে ঘড়ঘড় করে একটানা বাজতে থাকা পুরনো রেডিওতে হৃদয়পুরের গান। তখন এফএম চ্যানেল বাড়ছে ধীরে ধীরে৷ রাতের অনুষ্ঠানে আমার এফএম-এ বাজত স্বর্ণযুগের গান আর সম্বল বলতে ছিল কিছু ক্যাসেট। শচীন দেব বর্মন, আশা ভোঁসলে, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, মান্না দে, লালন সাঁই-এর গান ভরা থাকত সেই সমস্ত ক্যাসেটে৷ আর...
তাঁর সুর শুনে আমাদের বড় হয়ে ওঠা৷ কালের নিয়মে হয়তো সবাইকেই এ পৃথিবীর জায়গা ছেড়ে দিতে হয়, কিন্তু তিনি তো তাঁদের একজন গুণিগণগণনারম্ভে যাঁদের নাম সসম্ভ্রমে উচ্চারিত হয়৷ তিনি চলে গিয়েও রয়ে গেছেন আমাদের মধ্যে৷ জীবন্ত কিংবদন্তি সুরের মোহমায়ায় মুগ্ধ করে রেখেছেন কয়েক দশকব্যাপী মানুষজনকে৷ তাঁর গাওয়া কথায় বলতে হয়, মাঝে মাঝে আড়ালে না হারালে ওই মন কি অমন মনে রাখত! তিনি চলে গেছেন চিরতরে, কিন্তু আবালবৃদ্ধবনিতা তাঁকে মনে করছে, তাঁর সুর শুনছে, তাঁর গাওয়া গানের কথার অনুরণন চলছে চারধারে, ‘কিছুক্ষণ আরও নাহয় রহিতে কাছে’৷ ব্যথা অনুভব...
জীবনের বর্ণাঢ্য বরণীয়তা পাশে সরিয়ে রেখে আমরা যখন সাহিত্যেও বুঁদ হয়ে ছিলাম সংস্কারগত বর্ণাশ্রমে, সেই চরম শৌখিনতার পাশে চুপি চুপি একা এক অনন্যবোধে এসে দাঁড়িয়েছিলেন তিনি, কবি জীবনানন্দ দাশ, সোনালি ডানার প্রগাঢ়পথিক এক— "এ পৃথিবী একবার পায় তারে, পায় না কো আর"! তাঁর সে প্রায় অনুচ্চারিত অথচ অনস্বীকার্য আগমনে গোলাপ-জাতী-যূথির বাঁধন কেটে কোকিলা-ময়ূরী-ময়না -বুলবুলির মিঠেতান দূরে সরিয়ে জানা হল, কবিতার জন্য এমনকি ইঁদুর-ব্যাঙও অপাংক্তেয় নয়। ফুল-চাঁদের সিদ্ধমহিমা সপাটে উজাড় করে মন দুলল— "বুড়ি চাঁদ গেছে বুঝি...
আমাদের বাড়িতে যখন প্রথম টেপ রেকর্ডার এল, আমি তখন ক্লাস সিক্স। আজও আমার স্পষ্ট মনে আছে টেপ রেকর্ডারের সঙ্গে বাবা দুটো ক্যাসেট কিনে এনেছিলেন - 'অবিস্মরণীয় শচীন দেব বর্মন' আর 'গীতশ্রী সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়'। দুটি ক্যাসেটই আমাকে দুটি নতুন অভিজ্ঞতার সঙ্গে পরিচয় করিয়েছিল। সেই প্রথম আমি শচীনকত্তার গান শুনলাম এবং বলাই বাহুল্য, ওই কণ্ঠের জাদুতে আচ্ছন্ন হলাম, যে মুগ্ধতা আজও অবিচল। দ্বিতীয় অভিজ্ঞতা ছিল সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের ছবি দেখা। সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের গান ততদিনে আমার শোনা হয়ে গেছে কিন্তু মানুষটিকে দেখা তখনও হয়নি। আর তখন...
এইমাত্র এই দুঃসংবাদ পেলাম। যখন অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে গিয়েছিলেন তখন থেকে একটা মানসিক প্রস্তুতি তৈরি হয়ে গিয়েছিল। তার মাঝে আরেক কিংবদন্তি শিল্পী লতা মঙ্গেশকরের প্রয়াণ। মনের মধ্যে একটা আশঙ্কা ছিলই তবে সেটা একটু একটু করে কমে যাচ্ছিল। সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় সুস্থ হয়েছেন---তাঁর পায়ে অস্ত্রোপচার সফল হয়েছে--- এই খবরগুলো ক্রমশ আশ্বস্ত করছিল। আজ সব আশা শেষ হয়ে গেল। যে গানটির মাধ্যমে আমি এই শিল্পীকে চিনেছি সেটি আমার জন্মের অনেক আগে ১৯৫৪ সালের মুক্তিপ্রাপ্ত উত্তমকুমার-সুচিত্রা সেনের রোমান্টিক হিট অগ্নিপরীক্ষা ছবিতে ছিল।...