পাঠকদের বলবো কেমন করে অতিথি সত্কার করতে হয় এই গ্রন্থের মাধ্যমে রাজপুত্রদেরও শিখিয়ে দিলেন বিষ্ণুশর্মা। ভারতবর্ষে অতিথিকে দেবতূল্য সম্মান করা হয় —তাই অতিথিকে কিভাবে সম্মান করতে হয় সে শিক্ষাটিও শিশুকালেই প্রয়োজন।
পাঠকদের বলবো কেমন করে অতিথি সত্কার করতে হয় এই গ্রন্থের মাধ্যমে রাজপুত্রদেরও শিখিয়ে দিলেন বিষ্ণুশর্মা। ভারতবর্ষে অতিথিকে দেবতূল্য সম্মান করা হয় —তাই অতিথিকে কিভাবে সম্মান করতে হয় সে শিক্ষাটিও শিশুকালেই প্রয়োজন।
বিদ্যাবত্তা আর রাজার ক্ষমতা—এই দুটোর মধ্যে কোনো তুলনাই চলতে পারে না। রাজা তাঁর নিজের দেশে নিজের প্রজাদের থেকে সম্মান পান মাত্র। কিন্তু বিদ্বান ব্যক্তিদের সম্মান সর্বত্র। যেখানে তাঁরা যান সেখানেই লোকেরা তাঁকে সম্মান করেন, কিন্তু রাজা নিজের দেশ ছাড়া অন্য কোথাও সম্মানিত হন না।
ইন্দ্রের যদিও এইরকম কীর্তিকাহিনি অনেক আছে। পুরাণের কাহিনি আছে যে বিমাতা দিতির সেবা করার ছলে ইন্দ্র নাকি দিতির বিশ্বাস অর্জন করে সুযোগ বুঝে তাঁর গর্ভ নষ্ট করে দিয়েছিল। কারণ সে শুনেছিল যে বিমাতা দিতির গর্ভে যে পুত্র জন্মাচ্ছে সে ইন্দ্রের বিরোধী হবে। ফলে সন্ধি-শপথ এসবের কোনও দাম নেই।
কেউ যদি ভাবে আমি গুণবান, কারও ক্ষতি করি না। নিজের কাজকর্ম নিয়েই থাকি অন্যের সাতে-পাঁচে থাকি না। তাই কেউ আমার ক্ষতি করবে না, তাহলে বলতে হয় এটা একটা ভ্রম মাত্র। যারা মূর্খ তাদের কাছে মুড়ি আর মুড়কি সমান। অর্থাৎ হীরের মতো পাথরের মূল্য যে জানে না, তার কাছে সেই হীরে আর পাঁচটা সামান্য পাথরের মতোই লাগে, আলাদা কিছু মনে হয় না।
কাক-লঘুপতনক আড়াল থেকে সবটাই দেখলো। কপোতরাজ-চিত্রগ্রীব আর মুষিক-হিরণ্যকের মধ্যে সব কথোপকথনই শুনলো সে খুব মন দিয়ে। হিরণ্যককে দেখে খুব ভালো লাগলো তার। সে ক্ষুদ্র হলেও তার তীক্ষ্ণ দাঁত দিয়ে শিকারীর জাল কেটে ফেলার ক্ষমতা খুব বিস্মিত করলো তাকে।
মিত্রসম্প্ৰাপ্তিভাগ্যই হল বলবান। না হলে, দূর আকাশের নির্জন প্রদেশে বিচরণ করে যে সব পাখিদের দল, তারাও কি করে এইরকম বিপদে ফেঁসে যায়! গভীর সমুদ্রের মাছেরাও আটকে পড়ে জেলেদের চাতুরীতে। এর থেকেই তো মনে হয় যে, এই সংসারে সুনীতি-দুর্নীতি বা পাপ-পুণ্য বলে আসলে কিছুই হয় না। সুরক্ষিত বা অসুরক্ষিত স্থানে বাস করাটাও নিরাপদ নয়। কালই একমাত্র সত্য। সে তার লম্বা বাহুদুটি বের করে প্রতিক্ষণ জগতের সকল প্রাণীদের গ্রাস করে “কালঃ সর্বজনান্ প্রসারিতকরো গৃহ্ণাতি দূরাদপি”। এইসব অনেক কথা বলে হিরণ্যক তার তীক্ষ্ণ ধারালো দাঁত দিয়ে...
মিত্রসম্প্ৰাপ্তি জগতের এইটাই নিয়ম। যখন কোনও দাবিতে গণ-অভ্যুত্থান বা রাষ্ট্র বিপ্লব শুরু হয় তখন বিক্ষুব্ধরা যতক্ষণ একসঙ্গে একাত্ম হয়ে বিদ্রোহ করেন ততক্ষণ বলবান শাসকওতাঁদেরকে ভয় পায়। কিন্তু যখনই তারা বিভিন্ন দাবি নিয়ে আলাদা হন, আলাদা আলাদা ভাবে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন, তখনই সেই গণ-অভ্যুত্থান লঘু হতে শুরু করে। বিক্ষুব্ধরা যতই নিজেদের মধ্যে ভিন্নভিন্ন দাবিতে ভিন্ন ভিন্ন মত পোষণ করতে শুরু করেন শাসকের সুবিধা ততই বৃদ্ধি পায়। কোনও গণ-আন্দোলনের ক্ষেত্রে একদফা দাবি হলে শাসকের বিরুদ্ধে যে চাপ তৈরি হতে পারে, দাবি একাধিক হয়ে...
এ দিকে পায়রার দলটিকে জালে আটকে পড়তে দেখে সেই শিকারীটি তখন গাছের আড়াল থেকে বেরিয়ে এসে বড় একটা লাঠি নিয়ে এগিয়ে চললো তাদেরকে মারবার জন্যে। কপোতরাজ চিত্রগ্রীব তখন নিজেকে আর সেইসঙ্গে পরিবারের সকলকে জালে সেই শিকারীর জালে আটকে পড়তে দেখে সকলকে ডেকে বলল, “অহো ন ভেতব্যম্” —বন্ধুরা! আপনারা কেউ ভয় পাবেন না।
নীতিজ্ঞরা বারে বারে এইরকম রাজাকে পরিত্যাগ করার কথা বলেছেন। মনের মধ্যে আপনার বেদনা বা পশ্চাত্তাপ থাকলেও সেটা সকলের কাছে প্রকাশ করাটা উচিত নয়। তাতে আপনার দুর্বলচিত্তের পরিচয় বাইরে সকলে জেনে যাবে। শত্রুরা সাহস পেয়ে যাবে।
সেই চোর ব্রাহ্মণটি মনের আনন্দে সেই বণিক ব্রাহ্মণদের সেবা করতে লাগল। কিছুদের মধ্যে সেই চোরটি তাঁদের খুবই বিশ্বস্ত হয়ে উঠল। সেই বণিক ব্রাহ্মণেরা তাঁদের সমস্ত পণ্য বিক্রি করে স্বদেশে ফিরে যাওয়ার আগে সেই পত্তন থেকে অনেক বহুমূল্য রত্ন কিনল। তাঁরা সেগুলি সেই চোর ব্রাহ্মণের সামনেই তাঁদের জঙ্ঘার মধ্যে লুকিয়ে নিয়ে স্বদেশে ফেরার উদ্যোগ নিল।
শ্রেষ্ঠী রেগে গিয়ে বলল, ওরে মিথ্যাবাদী! বাজপাখি কখনও এত বড় বাচ্চাকে অপহরণ করে আকাশে উড়তে পারে? আমাকে কি বোকা পেয়েছিস? যা বলবি তাই বিশ্বাস করবো? এখনই আমার বাচ্চাটাকে ফিরিয়ে দে না হলে রাজদরবারে যাব আমি তোর বিরুদ্ধে নালিশ করতে।
বুদ্ধিমান লোকেদের উচিত কোনও উপায় বা পরিকল্পনা চিন্তা করবার সময়েই সেক্ষেত্রে কী কী বিপদ হতে পারে সে সব চিন্তা করে রাখা। এমনকি বিপদ হলে সেখান থেকে বেরিয়ে আসবার রাস্তা গুলোকেও ভেবে রাখা।না হলে সেই মূর্খ বকটির চোখের সামনেই তার বাচ্চাগুলোকে যেমন সেই বেজিটা খেয়ে নিয়েছিল ঠিক তেমন হবে।
সেই কথায় আছে না? চোরের মায়ের বড় গলা! পাপবুদ্ধির অবস্থাটা তাই। নিজে সবটাকা পয়সা সরিয়েছে; উল্টে ধর্মবুদ্ধিকে সে রাজার কাছে নালিশ জানানোর ভয় দেখাচ্ছে। ধর্মবুদ্ধি রেগে গিয়ে বলল, ওরে দুরাত্মা! ভুলে যাস না যে আমি ধর্মবুদ্ধি! কোনও রকম উঁচুনিচু কাজ আমি করি না। আমি ধর্ম মতে চলি, শাস্ত্রবচনকে উপেক্ষা করি না।
রাজা অমরশক্তির তিন পুত্রকে ছ’মাসের মধ্যে রাজনীতি-কূটনীতি বিষয়ে উপদেশ দিতেই বিষ্ণুশর্মা রচনা করেছিলেন ‘পঞ্চতন্ত্র’। কথামুখ অংশেই এ আলোচনা আমরা পূর্বেই করেছি। কিন্তু কোথায় কখন উপদেশ দিতে হয় এবং অপাত্রে উপদেশ দিলে কি অঘটন ঘটতে পারে সে কথাও তিনি পঞ্চতন্ত্রের বিভিন্ন কাহিনিতে বলে গিয়েছেন প্রচ্ছন্নভাবে।
সামান্য পাখির কথাটা বানরদের বেশ গায়ে লাগলো। একটা ষণ্ডামার্কা বানর খেঁকিয়ে উঠে বলল, ওরে বেটা মূর্খ। অন্যের ব্যাপারে তোর এতো নাক গলানোর কিসের দরকার? ভাগ এখনই এখান থেকে।