অরণ্যের যাত্রাপথে, ভরদ্বাজমুনির উপদেশানুসারে সীতা ও লক্ষ্মণ পৌঁছে গেলেন চিত্রকূট পর্বতে। মনোরম প্রাকৃতিক দৃশ্য ও বসবাসের আদর্শ জায়গাটি ভারি পছন্দ হল রামের। সেখানে বসবাসের উদ্দেশ্যে কুটির নির্মিত হল।
অরণ্যের যাত্রাপথে, ভরদ্বাজমুনির উপদেশানুসারে সীতা ও লক্ষ্মণ পৌঁছে গেলেন চিত্রকূট পর্বতে। মনোরম প্রাকৃতিক দৃশ্য ও বসবাসের আদর্শ জায়গাটি ভারি পছন্দ হল রামের। সেখানে বসবাসের উদ্দেশ্যে কুটির নির্মিত হল।
গন্ধর্বরাজ অঙ্গারপর্ণ, তৃতীয় পাণ্ডব অর্জুনের কাছে, মহর্ষি বশিষ্ঠের সঙ্গে রাজা বিশ্বামিত্রের দ্বৈরথ বর্ণনা করলেন। দুই মহর্ষির বিরোধের অবসান হল না। তপঃশক্তিতে ব্রহ্মর্ষি বশিষ্ঠের সমকক্ষ হওয়ার লক্ষ্যে, রাজা বিশ্বামিত্র রাজ্যসুখ ত্যাগ করে কঠোর তপশ্চর্যার মাধ্যমে ব্রাহ্মণত্ব অর্জন করেছিলেন। ব্রহ্মর্ষি বশিষ্ঠের সঙ্গে তাঁর সংঘাত শেষ হল না।
রাম, অরণ্যপথে গঙ্গানদী অতিক্রম করে দক্ষিণে গহন অরণ্যে প্রবেশ করলেন। তাঁরা প্রথম নিশি যাপন করলেন একটি বটগাছের তলায়। এর পরে নির্মল সকালে গঙ্গাযমুনার সঙ্গমস্থলের উদ্দেশ্যে রওনা দিলেন। আসন্ন সন্ধ্যায় প্রয়াগতীর্থের নিকটবর্তী হয়েছেন অনুমান করলেন রাম। কারণ চারিদিকে যেন অগ্নিদেবতার পতাকার মতো ধোঁয়া উঠছে। নিশ্চিতভাবেই মুনিদের উপস্থিতি অনুমান করলেন রাম।
ব্রহ্মর্ষি বশিষ্ঠ ছিলেন ব্রহ্মার মানসপুত্র। তিনি ব্রহ্মর্ষি।তাঁর স্ত্রী অরুন্ধতী।সমসাময়িক রাজর্ষি বিশ্বামিত্রের সঙ্গে তাঁর শত্রুতার প্রাচীন কাহিনি সকলেই অবগত আছেন। মহাভারতে, অর্জুনের অনুরোধে,গন্ধর্বরাজ অঙ্গারপর্ণ কথিত এই জয়পরাজয়ের আখ্যানটিতে বশিষ্ঠের ঔদার্য এক নতুন মাত্রা যোগ করল।
বনবাসের পথে, সারথি সুমন্ত্রকে আশ্বস্ত করে রামের এবার বন্ধুবর নিষাদরাজ গুহর কাছে বিদায় নেবার পালা। গুহকে জানালেন, স্বজনের সান্নিধ্যে বনবাস যথাযথ নয়। বিধিমতে আশ্রমবাস এখন তাঁর কর্তব্য। তাই পিতা, সীতা ও লক্ষ্মণের কল্যাণে নিয়মানুসারে তপস্বিজনের ভূষণ জটাধারী হয়ে অরণ্যে গমন করবেন। তাই বটগাছের ক্ষীর নিয়ে এস।
প্রাচীনকালে গঙ্গা হিমালয় হতে বহির্গত হয়ে সাতটি ধারায় সাগরে মিশেছে। সাতটি প্রবাহের নাম —গঙ্গা, যমুনা, প্লক্ষজাতা, সরস্বতী, সরযূ, গোমতী ও গণ্ডকী। এই সাতটি নদীর জল পান করলে পাপমুক্তি হয়। এই পবিত্র গঙ্গা আকাশকে তটরূপে গ্রহণ করায় আকাশগামিনী হয়।
রাম চলেছেন নির্ধারিত বনবাস যাপনে। পথে গঙ্গাতীরে রাত্রি ভোর হল। সূর্যোদয় সমাগত। কোকিলের কলকাকলিপূর্ণ ভোরে, বনভূমি কেকাধ্বনিমুখর, রামচন্দ্র লক্ষ্মণকে বললেন, তরাম জাহ্নবীং সৌম্য শীঘ্রগাং সাগরঙ্গমাম্। হে সৌম্য, চল সাগরের দিকে দ্রুত ধাবমানা জাহ্নবী পার হই। জ্যেষ্ঠ রামের কথানুসারে সুমিত্রানন্দন লক্ষ্মণ গুহ ও সারথিকে ডেকে আনলেন। স্থপিতি গুহর নির্দেশে একটি শক্তপোক্ত, সুন্দর, শুভ, অনায়াসে পারাপারের উপযুক্ত, সঙ্গে একজন দক্ষ কর্ণধার, এমন নৌকা নিয়ে উপস্থিত হলেন অমাত্যরা। গুহর অনুরোধে, রাম, খড়্গ ও তূণীর যথাযথভাবে বেঁধে নিলেন।...
পঞ্চপাণ্ডব, মা কুন্তীর সঙ্গে একচক্রানগরীতে যে ব্রাহ্মণের বাড়িতে অবস্থান করছিলেন, সেই আশ্রয়দাতা ব্রাহ্মণকে বকরাক্ষসের করালগ্রাস হতে দ্বিতীয় পাণ্ডব ভীমসেন একাই, উদ্ধার করলেন।
অরণ্যবাসে চলেছেন রাম। রজনী অবসানান্তে, বহুদূরে এগিয়ে গেলেন। যেতে যেতে অবশেষে ভোর হল। বড় সুন্দর মঙ্গলময় সে সকাল। রাম তাঁর প্রাতঃকালীন মাঙ্গলিক সন্ধ্যা ইত্যাদি সমাপন করলেন। রাজ্যের শেষ সীমায় উপস্থিত হলেন তিনি। কুসুমিত অরণ্যভূমি দেখতে দেখতে শ্রেষ্ঠ ঘোড়ায় টানা রথে দ্রুত অতিক্রম করে গেলেন অনেকটা পথ।
নহুষনন্দন যযাতি রাক্ষসগুরু শুক্রাচার্যের অভিশাপে জরাগ্রস্ত হলেন। তাঁর ত্রুটি হল—তিনি আচার্য শুক্রাচার্যের আদেশ অমান্য করে শুক্রাচার্যকন্যা দেবযানীর দাসী, রাক্ষসরাজ বৃষপর্ব্বার কন্যা শর্মিষ্ঠার গর্ভে তিনটি পুত্রের জন্ম দিয়েছিলেন।
তমসাতীরে রামচন্দ্রের বনবাসজীবনের সূচনা। ঘনায়মান রাতের অন্ধকার। রমণীয় তমসা নদী তীরেই হবে রাত্রিযাপন। রামচন্দ্র লক্ষ্মণকে আশ্বস্ত করেলেন, হে সৌমিত্রি লক্ষ্মণ, উৎকণ্ঠার কোনও কারণ নেই। তোমার কল্যাণ হোক। আজই আমাদের বনবাসের প্রথম নিশিযাপন।
শর্মিষ্ঠার মনোবাসনা হল যযাতির ঔরসে পুত্রলাভ। অশোক বনের কাছে, নিরালায়, রাজার দর্শনের অপেক্ষায় অবস্থানরতা শর্মিষ্ঠাকে দেখতে পেলেন রাজা যযাতি। শর্মিষ্ঠা, রাজার কাছে সন্তান প্রার্থনা করলেন। শর্মিষ্ঠার বংশপরিচয়, চরিত্র ও রূপ,রাজার অজানা নয়।
দেবী কৌশল্যার ক্ষোভ, দুঃখ, দোলাচলচিত্ততা দূর করতে এগিয়ে এলেন লক্ষ্মণজননী দেবী সুমিত্রা। প্রকৃত অর্থে ধার্মিক রাম, সৎ ও পুরুষশ্রষ্ঠ। পিতাকে সত্যবাদীরূপে প্রমাণ করেছে সে। এই কারণে সে রাজ্য ত্যাগ করে বনবাসী হয়েছে। ধার্মিক সৎ ছেলের জন্যে শোক কেন?
প্রবল আত্মবিশ্বাসী দেবী কুন্তী। তাঁর মহাবলশালী পুত্র ভীম কখনও ব্যর্থ হবে না। বকরাক্ষসের কাছে ভোজ্য পৌঁছে দেবে সে এবং নিজেও বিপদমুক্ত হবে। দ্বিতীয় পাণ্ডব রাক্ষসের মোকাবিলায় প্রস্তুত।
রাম পিছুটান উপেক্ষা করে চলেছেন বনবাসে।রামের নির্দেশে সারথি সুমন্ত্র রথ ছোটালেন চরম অশ্বগতিতে। তাঁর রথের পিছনে ধাবমান জনস্রোত, স্বজন, স্নেহশীল বৃদ্ধ পিতা। অন্তঃপুরিকাদের আর্ত চিৎকার, অনাথ, দুর্বল, সহায়হীন মানুষের আশ্রয় যিনি, তিনি আজ কোথায় চলেছেন?