শুক্রবার ৪ এপ্রিল, ২০২৫


‘খবরের কাগজ’ এই শব্দটির সঙ্গে সাধারণ মানুষের যেন এক আবেগ এবং অভ্যেস জড়িয়ে আছে। সকালবেলা চায়ের টেবিলে খবরের কাগজ নিয়ে পাঁচ-দশ মিনিট বসার পরই অনেকের দিন শুরু হয়। খবরের কাগজের ভূমিকা নিয়ে বিশেষ কিছু বলার অপেক্ষা রাখে না। নিরপেক্ষ সংবাদ পরিবেশন করে সংবাদপত্র সমাজের প্রতি যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে, তা আমরা জানি। আধুনিক সভ্যতায় ছাপাখানার হাত ধরে এল খবরের সংবাদপত্র। ১৮৪৬ সালে খ্রিস্টান অসমের শিবসাগরে মিশনারিদের দ্বারা প্রকাশিত হল অসমের প্রথম খবরের সংবাদপত্র ‘অরুণোদয়’। খবরের কাগজের প্রথম প্রচলন হয় চিনে। তার পর ইংলেণ্ডে। ১৭৮৮ সালে ভারতের প্রথম খবরের কাগজ ‘The India gazette’ আত্মপ্রকাশ করে।
ছাপাখানার ব্যবহারের আগে রাজার দূতরা এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় খবর পৌঁছে দিতেন। তখন পুরো ব্যাপারটাই ছিল মৌখিক অর্থাৎ শ্রুতি নির্ভর। তারপর মূলত খ্রিস্টান মিশনারিরা খ্রিস্টধর্ম প্রচারের লক্ষ্যে ১৮৩৬ সালে শদিয়াতে ছাপাখানা নিয়ে আসে। তবে ‘অরুণোদয়’কে সেই অর্থে খবরের কাগজ বলা যায় না। কারণ এই কাগজের মূল উদ্দেশ্য ছিল খ্রিস্টধর্ম প্রচার। প্রথমদিকে ‘অরুণোদয়’-এর সম্পাদক ছিলেন নাথান ব্রাউন। নিত্য দিনের বিভিন্ন ঘটনা সমূহ এখানে ছাপা হতো না। দেশ-বিদেশের গল্প, বিজ্ঞানের কিছু কথা ইত্যাদিই থাকত তাতে। তারপর ১৮৭১ সালে এল ‘আসাম বিলাসিনী’। এই কগজটি বেরোত মাজুলি থেকে। প্রকাশক ছিলেন শ্রীদত্ত গোস্বামী। এটি অসমীয়া ভাষার প্রথম সংবাদপত্র। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে এই পত্রিকা উল্লেখযোগ্য ভূমিকাগ্রহণ করেছিল। ১৮৮৩ সালে এই পত্রিকা ছাপা বন্ধ হয়ে যায়। তবে ১৯১৩ সাল থেকে কৃষ্ণকান্ত ভট্টাচার্য আবার প্রকাশিত করেন। কৃষ্ণকান্ত নিজে একজন ইংরেজ সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মচারী ছিলেন। কিন্তু তাঁর দেশভক্তির কোনও তুলনা ছিল না। তিনি ‘আসাম বিলাসিনী’তে দেশাত্মবোধক লেখা ছাপতে ভয় করেননি। ফলে ইংরেজরা তাঁকে সরকারি চাকরি থেকে বরখাস্ত করে। এগারো বছর বিভিন্ন প্রতিকূলতার সঙ্গে যুদ্ধ করেও পত্রিকাটি প্রকাশিত হতে থাকে। কিন্তু ১৯২৪ সালে ব্রিটিশ সরকার পত্রিকাটি ছাপানো বন্ধ করিয়ে দেয়।
আরও পড়ুন:

সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-৯৩: সাত-সহেলি

আলোকের ঝর্ণাধারায়, পর্ব-৯o: মা সারদার কথায় ‘ঈশ্বর হলেন বালকস্বভাব’

১৮৮২ সালে গুয়াহাটি থেকে প্রকাশিত ‘আসাম নিউজ’ নামে সপ্তাহিক পত্রিকা পাঠকের হাতে আসে। ইংরেজি এবং অসমীয়া দুই ভাষাতেই ছাপা হতো এই পত্রিকাটি। এটি সে সময় খুবই জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। অনেকেই এই কাগজটি পড়তেন। খুব ভালো ভালো প্রবন্ধ ছেপে বেরিয়েছে এই সপ্তাহিক পত্রিকাটিতে। কিন্তু বিভিন্ন কারণে এই পত্রিকাটি খুব বেশি দিন চলেনি। তারপর ১৮৯৪ সালে ইংরেজি এবং অসমীয়া ভাষায় দ্বিভাষিক সাপ্তাহিক পত্রিকা ‘আসাম’ প্রকাশিত হল। কিন্তু এই পত্রিকাটি মাত্র তিন বছরই প্রকাশিত হয়। ১৮৯৫ সালে এল ‘টাইমস অফ আসাম’। প্রকাশিত হতো ডিব্রুগড় থেকে। রাধানাথ চাংকাকতি ছিলেন এই পত্রিকার প্রথম সম্পাদক। দীর্ঘদিন প্রকাশিত হবার পর ১৯৪৮ সালে এই খবরের কাগজটিও বন্ধ হয়ে যায়।
আরও পড়ুন:

উপন্যাস: আকাশ এখনও মেঘলা, পর্ব-৯: আকাশ এখনও মেঘলা

অসমের আলো অন্ধকার, পর্ব-৪৫: স্বাধীনোত্তর শহর শিলচর

উল্লেখ্য, স্বাধনতা আন্দোলনের সময় ‘টাইমস অফ আসাম’ সংবাদপত্রটি যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করেছিল। ১৯০০ সালে তেজপুরের ‘আসাম বন্তি’ এবং বরাক উপত্যকার শচীন্দ্র সিংহের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় ‘উইকলি ক্রনিক্যাল’। দীর্ঘ ৪৪ বছর প্রকাশিত হবার পর ১৯৪৪ সালে ‘আসাম বন্তি’ পত্রিকাটি বন্ধ হয়ে যায়। ১৯১৮ সালে ডিব্রুগড় থেকে চন্দ্রকুমার আগরওয়ালা ‘অসমীয়া’ নামে একটি সাপ্তাহিক খবরের কাগজ প্রকাশ করেন। স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় এই কাগজ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করে। অসহযোগ আন্দোলনের ক্ষেত্রে এই পত্রিকা নির্ভীক ভাবে ইংরেজ বিরোধী মতামত পোষণ করেছিল। পরবর্তী সময়ে এই কাগজ দৈনিক খবরের কাগজ হিসেবে প্রকাশিত হয়। ‘দৈনিক বাতরি’ ১৯৩৫ সালে প্রকাশিত হয়। প্রকাশক উদ্যোগপতি রায় বাহাদুর শিব প্রসাদ বড়ুয়া। এটি আসামের প্রথম দৈনিক খবরের কাগজ। জোরহাট থেকে প্রকাশিত এই কাগজের প্রথম সম্পাদক ছিলেন বাগমীবার নীলমণি ফুকন। এই কাগজটি অসমীয়া ভাষার প্রথম দৈনিক কাগজ হিসেবে তো বিশেষ স্থান অধিকার করেই আছে, সেই সঙ্গে এ কথাও মেনে নিতে হয় যে, একটি শহরতলি থেকে প্রকাশিত দৈনিক খবরের কাগজ তখন ভূ-ভারতে আর ছিল না। তার পর ধীরে ধীরে এক এক করে অনেক দৈনিক পত্রিকা প্রকাশিত হতে লাগলো। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে এই সংখ্যা বাড়তে থাকে।
আরও পড়ুন:

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১০৭: লুকাবো বলি, লুকাবো কোথায়?

গল্পবৃক্ষ, পর্ব-২২: নন্দিবিলাস-জাতক: রূঢ়ভাষে কষ্ট কারও করিও না মন

আসমীয়া ভাষায় প্রকাশিত প্রথম মহিলাদের জন্য পত্রিকা ‘ঘর জেইউতি’ ১৯২৮ থেকে ১৯৩২ সাল পর্যন্ত প্রকাশিত হয়। কমলা কাকতি এবং কনকলতা চালিহা এই দুই মহিলা ছিলেন এই কাগজের সম্পাদক। মহিলাদের জন্য কাছে এই পত্রিকা ছিল একটি খোলা জানালার মতো। বাইরের জগতের সঙ্গে ঘরের মহিলাদের পরিচয় করিয়ে দিতে এগিয়ে এসে ছিল এই পত্রিকা।

অসমের বাংলা সাপ্তাহিক কিংবা দৈনিক পত্রিকাও পাঠকের দরবারে যথেষ্ট স্থান করে নিয়েছে প্রথম থেকেই। ‘আসাম মিহির’ বাংলা সাপ্তাহিক পত্রিকাটি বেরোত গুয়াহাটি থেকে। প্রথম দিকে বাংলায় ছাপা হলেও কিছু দিন পর থেকে ইংরেজিতেও প্রকাশিত হতে লাগল। ১৮৭৩ সালে পত্রিকাটি ছাপা বন্ধ হয়ে যায়। ‘গোয়ালপারা হিতাসাধিনী’ নামের একটি বাংলা সাপ্তাহিক কাগজ ১৮৭৬ সালে গোয়ালপারা থেকে প্রকাশিত হতো। কিন্তু বিভিন্ন প্রতিকূল পরিস্থিতির জন্য কিছুদিন পর পত্রিকাটি বন্ধ হয়ে যায়। অরুণকুমার চন্দের স্ত্রী জ্যোৎস্না চন্দ সম্পাদিত পত্রিকাটির ‘বিজয়নী’ নাম রেখেছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। সেটা ছিল সেই অঞ্চলের প্রথম মহিলাদের জন্য পত্রিকা। ১৯৪০ সালে প্রকাশিত হয় এই পত্রিকার প্রথম সংখ্যাটি। এতে গান্ধীজির শিলচর আসা এবং মহিলাদের উপর তার প্রভাব কীভাবে পড়েছিল তা লেখা হয়েছিল। এই পত্রিকাটি বেশিদিন প্রকাশিত করা সম্ভব হয়নি। পত্রিকাটি বরাক উপত্যকার নারীদের জন্য এক নতুন পথ দেখিয়েছিল এ কথা মেনে নিতেই হয়।
আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১০৭: সুভদ্রাপুত্র অভিমন্যু ও দ্রৌপদীর পঞ্চ পুত্র, কে বা কারা রইলেন পাদপ্রদীপের আলোয়?

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৭০: বিচারক

১৯৫০ সালে পাঠকের সামনে এল শিলচর থেকে প্রকাশিত ‘যুগশঙ্খ’। এই দৈনিক পত্রিকাটি অসমের পত্রিকা গোষ্ঠীর মধ্যে এক অন্যতম স্থান অধিকার করে আছে আজও। বার্ত ভগীরথ বৈদ্যনাথ এই কাগজের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন। ১৯৫৭ সালে এল ‘প্রান্ত্যজোতি’ পত্রিকা। প্রথম দিকে এই কাগজটি পাক্ষিক আকারে যাত্রা শুরু করলেও কিছু দিন পর থেকেই সাপ্তাহিক এবং পরবর্তী সময়ে দৈনিক পত্রিকা হিসেবে ছাপা শুরু হয়। ১৯৬১ সালের ভাষা আন্দোলনের সময় এই পত্রিকা নিরপেক্ষ ভাবে খবর ছেপে ছিল, সম্পাদক ছিলেন জ্যোতিরিন্দ্র চন্দ্র দত্ত। পাঠকের মনে এই পত্রিকাটি বিশেষ স্থান অধিকার করেছিল কিন্তু আগুন লেগে যাওয়ায় কাগজ টি বন্ধ হয়ে যায়। তারপর ২০০৯ সালে পত্রিকাটি আবার ছাপা শুরু হয়। ১৯৭০ সালে শুরু হয়েছিল দৈনিক পত্রিকা ‘সোনার কাছাড়’। এই পত্রিকাটিও যথেষ্ট উল্লেখ যোগ্য ভূমিকা গ্রহণ করেছিল। কিন্তু এক সময় পত্রিকাটি ছাপা বন্ধ হয়ে যায়।

আজ অসমে অসমীয়া, বাংলা, ইংরেজি নানা ভাষায় অনেক পত্র-পত্রিকা ছেপে বেরোচ্ছে। কিন্তু এক সময় পত্রিকা প্রকাশ করা ছিল আজকের এই সময় থেকে অনেক বেশি কঠিন। তখন ছিল না আজেকের সময়ের মতো উন্নত প্রযুক্তি সমূহ। যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিল না এতো উন্নত। ইন্টারনেটের এই সময়ে দাঁড়িয়ে আমরা যেমন অনেক খবরই নিমিষে হাতের মুঠোয় পেয়ে যাই তখন তেমন টা ছিল না। কিন্তু সমাজের প্রতি কর্তব্যপরায়ণতা এবং দ্বায়িত্ববোধ ছিল তীব্র। তাই তো বিভিন্ন প্রতিকূলতার সম্মুখীন হয়েও প্রকাশিত হয়েছে একাধিক পত্র-পত্রিকা। পত্র-পত্রিকার এই যাত্রা পথের গল্প করতে গিয়ে অনেক কাগজেরই নাম নেওয়া সম্ভব হয়নি। কিন্তু তাদের প্রত্যেকের ভূমিকাই যে আজের সংবাদমাধ্যম জগতকে এগিয়ে যেতে বলে এ কথা মেনে নিতেই হয়। —চলবে।
* ড. শ্রাবণী দেবরায় গঙ্গোপাধ্যায় লেখক ও গবেষক, অসম।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content