
দাদামণি নিজেই অবশ্য ছোট্ট কিশোরকে একটি হারমোনিয়াম কিনে দিয়েছিলেন। ছবি: সংগৃহীত।
একদিন আলাপ হল বলিউডের ‘মেরিলিন মনরো’, মধুবালার সঙ্গে। তখন বম্বে টকিজে চলছে ‘মহল’-এর শুটিং। জুটি সেই দাদামণি ও মধুবালা। এদিকে কিশোরের হাতে তেমন কোনও কাজ নেই তখন পর্যন্ত। তাই নেই কাজ তো ফন্দি ভাঁজ। তা হল কি, শুটিংয়ের ফাঁকে মধুবালা একসময় গ্রিনরুমের দিকে যাচ্ছিলেন। হটাৎ সবাই শুনতে পেল তার তীব্র আর্তনাদ। দাদামণি ও বাকিরা ভাবলেন বোধহয় কেউ খুনই হয়ে গেলেন।
তড়িঘড়ি সবাই গ্রিনরুমের কাছে আসতে দেখলেন, ভয়ার্ত মুখে দাঁড়িয়ে মধুবালা। আর ঠিক কয়েক হাত দূরে, অদ্ভুত ভয়ানক চেহারার একটা ছায়ামূর্তি। দেখে সবার চোখ তো একেবারে অশ্বডিম্ব। তবুও জল আর বেশি দূর গড়ায়নি সেদিন, বোঝা গেলো তিনি কে।
মুখের মুখোশ খুলে এক গাল হাসি হেসে শিষ দিতে দিতে, দুলতে দুলতে, আসছেন কিশোরবাবু। দাদামণিকে তখন যেন আর ধরে রাখা যাচ্ছে না, চরম অপমান আর রাগে ভর্ৎসনা করলেন ভাইকে। তাতে অবশ্য আখেরে লাভের লাভ কিছু হল না। এরপরেও চালিয়ে গেছেন মজা, মস্করা কাউকে তোয়াক্কা না করে, জীবনভোর।
মুখের মুখোশ খুলে এক গাল হাসি হেসে শিষ দিতে দিতে, দুলতে দুলতে, আসছেন কিশোরবাবু। দাদামণিকে তখন যেন আর ধরে রাখা যাচ্ছে না, চরম অপমান আর রাগে ভর্ৎসনা করলেন ভাইকে। তাতে অবশ্য আখেরে লাভের লাভ কিছু হল না। এরপরেও চালিয়ে গেছেন মজা, মস্করা কাউকে তোয়াক্কা না করে, জীবনভোর।
আরও পড়ুন:

অমর শিল্পী তুমি, পর্ব-৩: কাজের আশায়, তারকা অশোককুমারের গাড়িতে নয়, লোকাল ট্রেনে-বাসে ঘুরে বেড়াতেন কিশোর

পঞ্চমে মেলোডি, পর্ব-২৪: রিমঝিম ঘিরে শাওন…আবার লতা, কিশোর ও পঞ্চমের সেই জাদু
এদিকে দাদামণির আবার কখনওই কিশোরের গায়কীর ওপর তেমন আস্থা ছিল না। আসলে অনাস্থা নয়, তবে এমন ভরসা তিনি পেতেন না যে, কিশোর কখনও গান গেয়ে খ্যাতি অর্জন করতে পারবে। তিনি তাই বিভিন্নভাবে ভাইকে সময়-অসময়ে, পরোক্ষ ভাবে সে কথা বলার চেষ্টা করতেন। তবে বুঝে শুনে, না হলে আবার হিতে বিপরীত হতে কতক্ষণ।
আরও পড়ুন:

আলোকের ঝর্ণাধারায়, পর্ব-৭: গৃহিণী সারদার প্রথম দক্ষিণেশ্বর আগমন

তাঁর মৃত্যুতে কেঁদেছিলেন ভগৎ সিং, আর মরদেহ কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন সুভাষচন্দ্র
কিছু দাদামণির কথায়, আবার কিছুটা ঠাহর করতে, ওদিকে কিশোর গায়ক হওয়ার পথে এগোনোর সঙ্গে সঙ্গে ‘সতী বিজয়া’, ‘শেহেনাই’ ইত্যাদি ছবিতে পার্শ্বচরিত্রে কাজ করলেন একটু আধটু। ‘শিকারী’তে গানও গাইলেন। এবার আবার ঘটালেন এক কাণ্ড। মাত্র ১৯ বছর বয়সে, বম্বে টকিজ প্রযোজিত ১৯৪৮ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘জিদ্দি’ ছবিতে। ছবির শুটিং চলাকালীন একদিন বাগানের মালির চরিত্রে নির্ধারিত শিল্পীর অনুপস্থিতির দরুন ডাক পড়লো কিশোরের। অনেক সাধাসাধির পর কোনও রকমে রাজি করানো গেলো তাকে। আসলে তিনি মনে প্রাণে শুধু গায়ক হিসেবেই আত্মপ্রকাশ ও খ্যাতি অর্জন করতে চেয়েছিলেন।
আরও পড়ুন:

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-৭১: ইংরেজের চোখে রবীন্দ্রনাথ ছিলেন ‘দাগী আসামী’

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-৯: সুন্দরবনের লুপ্ত নদী আদিগঙ্গা
তবে সেদিন ক্যামেরার কিছু সমস্যার কারণে টেক দিতে কিছু অসুবিধা হল, ওখানেই যত বিপত্তি। রিটেকের নাম শুনে সেই যে তিনি পালালেন, ঘণ্টাখানেক তাকে আর খুঁজে পাওয়া যায় না। শেষে কোনওরকমে আবার তরী পার হল অনেক পীড়াপিড়ির পর, তার খোঁজ পেলে। সেই চরিত্রে লোকজনের মন জয় করলেন কিশোর। এ তো মহা ঝামেলা, তিনি যে গান গাইতে চান।
তবে এখানেও শাপ এ বর হল সেই আগের মতো। একই ছবিতে দেব আনন্দের জন্য ‘মারনে কি দুয়ায়ে কিঁউ মাঙু’ গানটি গেয়ে সাড়া ফেলে দিলেন তিনি। ধিকি ধিকি চাপা আগুন, গনগনে আঁচের অপেক্ষায়। এরপর কিছুটা ইচ্ছা করেই দায়সারা ভাবে অভিনয়ের কাজ করেছেন কয়েকটা ছবিতে। আর ঠিক সময়ের অপেক্ষা করে গিয়েছেন এক মিস্টার এক্স ইন বম্বে হয়ে।
তবে এখানেও শাপ এ বর হল সেই আগের মতো। একই ছবিতে দেব আনন্দের জন্য ‘মারনে কি দুয়ায়ে কিঁউ মাঙু’ গানটি গেয়ে সাড়া ফেলে দিলেন তিনি। ধিকি ধিকি চাপা আগুন, গনগনে আঁচের অপেক্ষায়। এরপর কিছুটা ইচ্ছা করেই দায়সারা ভাবে অভিনয়ের কাজ করেছেন কয়েকটা ছবিতে। আর ঠিক সময়ের অপেক্ষা করে গিয়েছেন এক মিস্টার এক্স ইন বম্বে হয়ে।

অনেক রাত পর্যন্ত চলতো ফিল্মি গানের জলসা। ছবি: সংগৃহীত।
এর পর কিশোর একের পর ছবিতে অভিনয় আর গান গেয়ে গিয়েছেন। তবে শুরুর প্রায় দু’ দশক হয় নিজের জন্য না হয় দেব আনন্দের জন্যেই শুধু গেয়েছেন। ‘নৌকরি ’, ‘নিউদিল্লি’, ‘আশা’, ‘চালতি কা নাম গাড়ি’, ‘হাফ টিকিট’, ‘পড়োশন’, ‘ঝুমরু’ যার মধ্যে অন্যতম। মনে আছে ‘চালতি কে নাম গাড়ি’-এর বিখ্যাত ‘৫ রুপাইয়া ১২ আনা’ গানটির কথা? আসলে ওতেও যে আছে এক মিষ্টি ইতিহাস। হয়তো আরও একটু বেশি হলেও হতো না ক্ষতি। তবে ইন্দোরে কলেজে পড়ার সময় থেকে ক্যান্টিনে ঠিক অতোটাই ধার ছিল তার। —চলবে।
* ঋত্বিক চক্রবর্তী, পেশাগত ভাবে একটি বহুজাতিক সংস্থার সঙ্গে যুক্ত। কর্মসূত্রেই স্পেনে থাকা। কাজের কাজ ও অকাজ করে সময় পেলেই বইপড়া, গান শোনার চেষ্টা আর পাঁচটা বাঙালির মতোই মজ্জাগত। রুজি রোজগারের বাইরে নিজের মনের জন্য কিছু পুষ্টি সঞ্চয়ে উন্মুখ। তাই পেশা আর নেশার টানাপোড়েনে পড়ে থাকা আর এক বাঙালি।